ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটা উচিত? জেনে নিন সঠিক নিয়ম

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৪ ১৫:৩৬:০১
প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটা উচিত? জেনে নিন সঠিক নিয়ম

সুস্থ থাকতে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই—নিয়মিত দ্রুতগতিতে হাঁটার অভ্যাসই হতে পারে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার সহজ উপায়। তবে প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটতে হবে, তা বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের পরামর্শ দেওয়া হয়। হাঁটার ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে সপ্তাহে পাঁচ দিন, প্রতিদিন ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে, মেজাজ ও ঘুমের উন্নতি ঘটাতে এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। তবে ৩০ মিনিট হাঁটতেই হবে—এমন নয়। যাঁরা এখনো নিয়মিত হাঁটেন না, তাঁরা অল্প সময় দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন। কারণ, একেবারেই নিষ্ক্রিয় থাকার চেয়ে কিছুটা শারীরিক কার্যক্রমও উপকারী।

প্রতিদিন কত মিনিট হাঁটা সবচেয়ে ভালো?

১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সী অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের লক্ষ্য রাখা যায়। দ্রুত হাঁটা এর একটি সহজ উদাহরণ।

এই লক্ষ্য পূরণের কয়েকটি উপায় হলো:

প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁচ দিন হাঁটা।

প্রতিদিন ২২ মিনিটের মতো হাঁটা, যাতে সপ্তাহে মোট প্রায় ১৫০ মিনিট হয়।

সময় কম থাকলে সকালে ১৫ মিনিট ও বিকেলে ১৫ মিনিট হাঁটা।

একবারে দীর্ঘ সময় হাঁটা সম্ভব না হলে ছোট ছোট পর্বে হাঁটলেও উপকার পাওয়া যায়। যেমন, সকালে ১০ মিনিট, দুপুরে ১০ মিনিট এবং সন্ধ্যায় ১০ মিনিট হাঁটা। নিজের দৈনন্দিন রুটিনের সঙ্গে মিলিয়ে যে অভ্যাস নিয়মিত বজায় রাখা যায়, সেটিই সবচেয়ে কার্যকর।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সময়ের লক্ষ্যটি মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের জন্য। খুব ধীরে হাঁটা বা অল্প দূরত্বে স্বাভাবিক গতিতে চলাফেরা একই মাত্রার ব্যায়ামের সমতুল্য নাও হতে পারে।

হাঁটার গতি কেমন হওয়া উচিত?

হাঁটার উপকার পেতে সব সময় দৌড়ানোর মতো দ্রুত চলতে হবে না। মাঝারি গতিতে হাঁটার একটি সহজ পরীক্ষা হলো—হাঁটার সময় কথা বলা যাবে, কিন্তু শ্বাস কিছুটা দ্রুত হওয়ায় একটানা গান গাওয়া কঠিন হবে।

এ ধরনের গতিতে হাঁটলে হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা বাড়ে। তবে গতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বয়সের পাশাপাশি ফিটনেস, শরীরের ওজন, অসুস্থতা ও ওষুধের প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে।

শুরুতে ধীরগতিতে হাঁটা এবং পরে আরাম অনুযায়ী গতি বাড়ানো ভালো। হাঁটার সময় বুকব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা দেখা দিলে থেমে যান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিন।

বয়স অনুযায়ী কতক্ষণ হাঁটা উচিত?

হাঁটার সময় নির্ধারণে বয়স গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। একই বয়সের দুজন মানুষের শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন আলাদা হতে পারে।

১৮ থেকে ৬৪ বছর

এই বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের লক্ষ্য রাখা উচিত। চাইলে ধীরে ধীরে সপ্তাহে ৩০০ মিনিট পর্যন্ত বাড়ানো যায়, যদি তা শারীরিকভাবে সহনীয় হয়।

এর পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন প্রধান পেশিগুলোকে শক্তিশালী করার ব্যায়াম করার পরামর্শও দেওয়া হয়। শুধু হাঁটা সব ধরনের শারীরিক ব্যায়ামের প্রয়োজন পূরণ করে না।

৬৫ বছর বা তার বেশি

বয়স্কদের ক্ষেত্রেও সাধারণভাবে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের লক্ষ্য প্রযোজ্য, যদি শারীরিক অবস্থা তা অনুমোদন করে। হাঁটার পাশাপাশি ভারসাম্য ও পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

যাঁদের চলাফেরায় সমস্যা, জয়েন্টে ব্যথা বা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, তাঁরা প্রয়োজনে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিয়ে নিরাপদ সময় ও পদ্ধতি নির্ধারণ করবেন।

শিশু ও কিশোর-কিশোরী

৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো, সপ্তাহজুড়ে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করা। এর মধ্যে হাঁটা ছাড়াও দৌড়ানো, খেলাধুলা, সাইকেল চালানো ও অন্যান্য সক্রিয় কাজ থাকতে পারে।

তাই শিশুদের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের মতো শুধু ৩০ মিনিট হাঁটার লক্ষ্য নির্ধারণ না করে খেলাধুলা ও দৈনন্দিন চলাফেরার সুযোগ বাড়ানো বেশি উপযোগী।

যাঁরা অসুস্থতা বা শারীরিক সীমাবদ্ধতায় ভুগছেন

হৃদ্‌রোগ, ফুসফুসের রোগ, গুরুতর বাতের সমস্যা, ভারসাম্যের অসুবিধা কিংবা দীর্ঘদিনের অসুস্থতা থাকলে হাঁটার সময় ও গতি ব্যক্তিভেদে ঠিক করতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অল্প সময় দিয়ে শুরু করা এবং ধীরে ধীরে বাড়ানো নিরাপদ হতে পারে।

প্রতিদিন হাঁটলে শরীরে কী কী উপকার হয়?

নিয়মিত হাঁটা শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়; এটি সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখারও একটি কার্যকর উপায়।

হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে: নিয়মিত মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও এর ভূমিকা রয়েছে।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে: নিয়মিত হাঁটা শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের দক্ষতা উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও উপযুক্ত শারীরিক কার্যক্রম উপকারী, তবে ওষুধ ও খাবারের সময় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে: হাঁটার সময় শরীর শক্তি ব্যয় করে। খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রমের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়মিত হাঁটা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু হাঁটলেই নির্দিষ্ট পরিমাণ ওজন কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

মেজাজ ও ঘুমের উন্নতিতে সহায়ক: শারীরিক কার্যক্রম মানসিক সুস্থতা ও ঘুমের মান উন্নত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত হাঁটা অনেকের ক্ষেত্রে চাপ কমাতেও সাহায্য করে।

দৈনন্দিন চলাফেরার সক্ষমতা বজায় রাখে: নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস সহনশীলতা ও চলাফেরার সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক। বয়স্কদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত শক্তি ও ভারসাম্য অনুশীলনের সঙ্গে মিলিয়ে এটি স্বাধীনভাবে চলাফেরা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

ওজন কমাতে প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটবেন?

ওজন কমানোর জন্য সবার ক্ষেত্রে একই সময় নির্ধারণ করা যায় না। হাঁটার গতি, শরীরের ওজন, খাবারের পরিমাণ, ঘুম এবং অন্যান্য দৈনন্দিন কাজের ওপর শক্তি ব্যয়ের পরিমাণ নির্ভর করে।

প্রথমে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার কার্যক্রমের লক্ষ্য রাখা যেতে পারে। ওজন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হলে এবং শরীর সহ্য করলে ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো উপকারী হতে পারে। তবে ওজন কমানোর জন্য অনেকের আরও বেশি শারীরিক কার্যক্রম ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন প্রয়োজন হয়।

খুব দ্রুত ওজন কমানোর আশায় হঠাৎ দীর্ঘ সময় হাঁটা শুরু করা ঠিক নয়। ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়ালে অভ্যাস ধরে রাখা সহজ হয় এবং অতিরিক্ত চাপের ঝুঁকিও কমে।

সকালে হাঁটা ভালো, নাকি বিকেলে?

হাঁটার জন্য সবার ক্ষেত্রে একই সময় সবচেয়ে ভালো—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। সকালে হাঁটলে কারও দৈনন্দিন রুটিনে নিয়মিত ব্যায়াম রাখা সহজ হয়, আবার কেউ বিকেলে বা সন্ধ্যায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

সবচেয়ে ভালো সময় হলো যেটিতে নিয়মিত হাঁটা সম্ভব এবং পরিবেশ নিরাপদ। গরম আবহাওয়ায় তীব্র রোদ এড়িয়ে চলুন, পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করুন। বায়ুদূষণ বেশি থাকলে বাইরে হাঁটার সময় ও স্থান বিবেচনা করুন।

হাঁটা শুরু করার আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন

দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকলে প্রথম দিন থেকেই ৩০–৬০ মিনিট হাঁটার চেষ্টা করবেন না।

প্রথমে ৫–১০ মিনিট আরামদায়ক গতিতে হাঁটুন; শরীর মানিয়ে নিলে সময় বাড়ান।

হাঁটার আগে ও পরে প্রয়োজনে কয়েক মিনিট ধীরে হাঁটুন, যাতে গতি ধীরে বাড়ে ও কমে।

আরামদায়ক জুতা পরুন এবং অসমান বা পিচ্ছিল রাস্তা এড়িয়ে চলুন।

গরমে অতিরিক্ত ঘাম হলে বিশ্রাম নিন এবং পানির ঘাটতি এড়ান।

দীর্ঘস্থায়ী রোগ বা হাঁটার সময় অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শেষ কথা: অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সপ্তাহে পাঁচ দিন ৩০ মিনিট করে দ্রুত হাঁটা একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। তবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পূরণ করতে না পারলেও হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। অল্প সময় দিয়ে শুরু করে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী সময় ও গতি ঠিক করলে হাঁটা দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার কার্যকর অভ্যাস হয়ে উঠতে পারে।

স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য: এই প্রতিবেদন সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার জন্য; ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. সুস্থ থাকতে প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটা উচিত?

অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের লক্ষ্য রাখা উচিত। দ্রুত হাঁটার ক্ষেত্রে সপ্তাহে পাঁচ দিন ৩০ মিনিট করে হাঁটা একটি বাস্তবসম্মত উপায়।

২. প্রতিদিন ১০ মিনিট হাঁটলেও কি উপকার পাওয়া যায়?

হ্যাঁ। কিছু শারীরিক কার্যক্রমও নিষ্ক্রিয় থাকার চেয়ে ভালো। অল্প সময় দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে হাঁটার সময় ও গতি বাড়ানো যেতে পারে।

৩. ওজন কমাতে প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটতে হবে?

সবার জন্য নির্দিষ্ট সময় এক নয়। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার কার্যক্রম দিয়ে শুরু করা যায়। ওজন কমানোর জন্য খাদ্যাভ্যাস ও ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে আরও বেশি কার্যক্রম প্রয়োজন হতে পারে।

৪. সকালে হাঁটা ভালো, নাকি বিকেলে?

যে সময়ে নিয়মিত ও নিরাপদে হাঁটতে পারবেন, সেই সময়ই বেছে নেওয়া ভালো। সকাল বা বিকেল—একটি সময় সবার জন্য শ্রেষ্ঠ, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো প্রমাণ নেই।

৫. বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটা উচিত?

৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্যও সাধারণভাবে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের লক্ষ্য প্রযোজ্য। তবে শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটার সময় ঠিক করতে হবে। ভারসাম্য ও পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: