ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

জমির দলিল হারালে নকল তুলতে কত খরচ, কীভাবে আবেদন করবেন?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ৩০ ১২:১৪:২৪
জমির দলিল হারালে নকল তুলতে কত খরচ, কীভাবে আবেদন করবেন?

জমির মূল দলিল হারিয়ে গেলে বা কোনো প্রয়োজনে দলিলের প্রমাণিত কপি দরকার হলে নতুন করে দলিল তৈরি করার প্রয়োজন নেই। যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধন করা হয়েছিল, সেখান থেকে সার্টিফায়েড কপি বা দলিলের নকল সংগ্রহ করা যায়। তবে এই কপি তুলতে কত টাকা লাগবে, তা নির্ভর করে দলিলের ভাষা, শব্দ ও পৃষ্ঠাসংখ্যা এবং জরুরি ভিত্তিতে কপি নেওয়া হচ্ছে কি না, তার ওপর।

একটি সরকারি সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের প্রকাশিত ফি তালিকা অনুযায়ী, বাংলায় লেখা প্রতি ৩০০ শব্দের এক পৃষ্ঠা বা তার অংশের জন্য নকল প্রস্তুত ফি ২৪ টাকা এবং নকলনবিশের পারিশ্রমিক ৩৬ টাকা। এর সঙ্গে আবেদনপত্রের ২০ টাকা কোর্ট ফি যোগ হয়। সেই হিসাবে ১০ পৃষ্ঠার বাংলা দলিলের সাধারণ নকল তুলতে মোট ৬২০ টাকা লাগে। তবে এটি সংশ্লিষ্ট অফিসের প্রকাশিত ফি তালিকার হিসাব; সব এলাকার জন্য একই অঙ্ক প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না।

দলিলের নকল কপি তুলতে কত টাকা লাগে?

দলিলের নকল বা সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত ফি দলিলের শব্দসংখ্যা ও ভাষার ভিত্তিতে হিসাব করা হয়। সোনাতলা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের ২৭ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে হালনাগাদ করা ফি তালিকায় বাংলায় লেখা প্রতি ৩০০ শব্দের এক পৃষ্ঠা বা তার অংশের জন্য নিচের খরচ উল্লেখ রয়েছে—

নকল প্রস্তুতকরণ ফি: প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ টাকা

নকলনবিশের পারিশ্রমিক: প্রতি পৃষ্ঠা ৩৬ টাকা

আবেদনপত্রের কোর্ট ফি: ২০ টাকা

অর্থাৎ, প্রতি পৃষ্ঠায় মূল নকল প্রস্তুত ও পারিশ্রমিক বাবদ ৬০ টাকা এবং এর সঙ্গে একবার ২০ টাকা কোর্ট ফি যোগ হবে।

১০ পৃষ্ঠার দলিলের নকল তুলতে কত টাকা?

১০ পৃষ্ঠার একটি বাংলা দলিলের সাধারণ নকলের হিসাব হবে—

নকল প্রস্তুতকরণ: ২৪০ টাকা

নকলনবিশের পারিশ্রমিক: ৩৬০ টাকা

কোর্ট ফি: ২০ টাকা

মোট খরচ: ৬২০ টাকা।

এটি ৩০০ শব্দে এক পৃষ্ঠা ধরে করা হিসাব। প্রকৃত দলিলের শব্দসংখ্যা ও পৃষ্ঠার হিসাবে মোট খরচ কমবেশি হতে পারে।

জরুরি ভিত্তিতে দলিলের নকল তুলতে কত টাকা লাগে?

জমি বিক্রি, ব্যাংকঋণ, আদালতের মামলা বা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত দলিলের নকল প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিক বা জরুরি নকলের জন্য অতিরিক্ত ফি প্রযোজ্য হতে পারে।

সোনাতলা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রকাশিত তালিকায় অগ্রাধিকারভিত্তিক নকলের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা অথবা চার পৃষ্ঠার বেশি হলে প্রতি পৃষ্ঠায় ১৫ টাকা হারে অতিরিক্ত ফির উল্লেখ রয়েছে।

তবে জরুরি নকলের মোট খরচ দলিলের পৃষ্ঠাসংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট অফিসে প্রযোজ্য ফি হিসাবের ওপর নির্ভর করবে। তাই আবেদন করার আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে মোট খরচ লিখিতভাবে বা নির্ধারিত ফি তালিকা দেখে নিশ্চিত হওয়া ভালো।

দলিলের নকল কোথা থেকে তুলতে হবে?

যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির মূল দলিলটি নিবন্ধন করা হয়েছিল, সাধারণত সেই অফিস থেকেই সার্টিফায়েড কপির আবেদন করতে হয়। নিবন্ধিত দলিলের একটি অনুলিপি সংশ্লিষ্ট অফিসের রেকর্ড রুমে সংরক্ষিত থাকে। সেখানকার বালাম বই বা সূচির তথ্যের ভিত্তিতে নকল প্রস্তুত করা হয়।

তাই দলিলটি কোন উপজেলার বা এলাকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত হয়েছিল, সেটি আগে নিশ্চিত করুন। শুধু জমির বর্তমান অবস্থান দেখে অফিস নির্ধারণ না করে দলিলের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য অনুসরণ করতে হবে।

দলিলের নকল তুলতে কী কী তথ্য ও কাগজপত্র লাগে?

দলিলের নকলের আবেদন করার সময় দলিলটি শনাক্ত করার মতো তথ্য দিতে হয়। সাধারণত নিচের তথ্যগুলো প্রস্তুত রাখা সুবিধাজনক—

দলিল নম্বর ও নিবন্ধনের সাল

যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধন হয়েছিল, তার নাম

দলিলের ক্রেতা ও বিক্রেতার নাম

জমির মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর

দলিলের ধরন, যেমন বিক্রয় দলিল, দানপত্র বা হেবা

আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য

দলিল নম্বর বা নিবন্ধনের সাল জানা থাকলে নকল সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ হয়। এসব তথ্য জানা না থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিসের সূচি বই তল্লাশির মাধ্যমে দলিল শনাক্ত করার বিষয়ে জানতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তল্লাশি ফি প্রযোজ্য হতে পারে।

আবেদনকারীর পরিচয়পত্র বা অন্য কোনো নথি লাগবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।

দলিলের নকল কপি তোলার নিয়ম

দলিলের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের জন্য সাধারণত কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়।

প্রথম ধাপ: দলিলের নিবন্ধন অফিস শনাক্ত করুন।

প্রথমে নিশ্চিত করুন, জমির দলিলটি কোন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত হয়েছিল। দলিলের নম্বর, সাল ও পক্ষগুলোর নাম জানা থাকলে অফিসে তথ্য খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।

দ্বিতীয় ধাপ: নকলের আবেদন করুন।

সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলের নকল বা সার্টিফায়েড কপির জন্য নির্ধারিত আবেদনপত্র সংগ্রহ করুন। সেখানে দলিল শনাক্ত করার তথ্য এবং আবেদনকারীর প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য পূরণ করতে হবে।

তৃতীয় ধাপ: প্রয়োজনীয় ফি জমা দিন।

দলিলের পৃষ্ঠা ও ভাষা অনুযায়ী নকল প্রস্তুতকরণ ফি, নকলনবিশের পারিশ্রমিক এবং আবেদনপত্রের কোর্ট ফি দিতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে চাইলে অগ্রাধিকারভিত্তিক ফির বিষয়ে অফিসে জানতে হবে।

চতুর্থ ধাপ: আবেদন জমার রসিদ সংরক্ষণ করুন।

ফি জমা দেওয়ার পর রসিদ বা আবেদন গ্রহণের প্রমাণ নিজের কাছে রাখুন। এতে পরবর্তী সময়ে নকল সংগ্রহ বা আবেদনের অগ্রগতি জানতে সুবিধা হবে।

পঞ্চম ধাপ: সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করুন।

অফিস থেকে জানানো তারিখে প্রয়োজনীয় রসিদ বা পরিচয়সংক্রান্ত নথি নিয়ে উপস্থিত হয়ে দলিলের নকল সংগ্রহ করুন। কপিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন, স্বাক্ষর ও সিল রয়েছে কি না, তা দেখে নিন।

দলিলের নকল পেতে কত দিন সময় লাগে?

দলিলের নকল সরবরাহের সময়সীমা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কাজের চাপ, দলিল শনাক্ত করার অবস্থা এবং সাধারণ বা জরুরি সেবা নেওয়ার ওপর নির্ভর করে।

কিছু সরকারি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাগরিক সনদে সাধারণ নকল সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ৭ দিন এবং জরুরি নকলের জন্য ১ থেকে ৩ দিনের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এটি সব অফিসের জন্য অভিন্ন সময়সীমা নয়।

https://sr.haluaghat.mymensingh.gov.bd/pages/static-pages/69708b94a31054345f159c70

দলিলটি পুরোনো হলে, রেকর্ড খুঁজে পেতে সমস্যা হলে কিংবা অফিসে কাজের চাপ বেশি থাকলে আরও সময় লাগতে পারে। আবেদন জমা দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে সম্ভাব্য সরবরাহের তারিখ জেনে নিন।

মূল দলিল হারিয়ে গেলে কি নকল কপি পাওয়া যাবে?

হ্যাঁ। মূল দলিল হারিয়ে গেলেও সেটি আগে নিবন্ধিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংরক্ষিত রেকর্ড থেকে সার্টিফায়েড কপির আবেদন করা যায়। দলিলের নম্বর ও সাল জানা থাকলে প্রক্রিয়া সহজ হয়। এসব তথ্য না থাকলে সূচি বই তল্লাশির মাধ্যমে দলিল শনাক্ত করার চেষ্টা করা যায়।

তবে মূল দলিল হারানোর ঘটনা ঘটলে প্রয়োজন অনুযায়ী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা অন্য আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। নকল সংগ্রহের প্রক্রিয়া ও আইনগত পদক্ষেপ দুটি আলাদা বিষয়।

দলিলের নকল কপি কি মূল দলিলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ?

সার্টিফায়েড কপি হলো নিবন্ধন অফিসের সংরক্ষিত রেকর্ড থেকে প্রস্তুত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রত্যয়িত অনুলিপি। জমির মালিকানা-সংক্রান্ত প্রমাণ, আদালতের কার্যক্রম বা বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন:

অন্যের জমিতে নিজের নামে দলিল হলে কী করবেন?

আপনার জমি অন্য কেউ দখল করলে ফেরত পাবেন যেভাবে

জমি রেজিস্ট্রি করতে কত টাকা লাগে? জেনে নিন হিসাব

তবে কোনো জমির মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু একটি নকল দলিলের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। দলিলের পাশাপাশি পূর্ববর্তী মালিকানার ধারাবাহিকতা, খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং জমির দখলসংক্রান্ত তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।

দলিলের নকল তুলতে যাওয়ার আগে যা মনে রাখবেন

দলিলের নকল তুলতে প্রথমে নিবন্ধনের অফিস, দলিল নম্বর ও সাল নিশ্চিত করুন। এরপর সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বশেষ ফি তালিকা দেখে আবেদন করুন। কারণ সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফি তালিকায় অফিসভেদে ও হালনাগাদের সময় অনুযায়ী পার্থক্য দেখা যায়।

নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৭৮ ধারায় দলিলের নকল, রেজিস্টার তল্লাশি ও অনুলিপি প্রদানের ফি সরকার নির্ধারণের বিধান রয়েছে। ৭৯ ধারায় ফি তালিকা সরকারি গেজেটে প্রকাশ এবং প্রতিটি নিবন্ধন অফিসে জনসাধারণের দেখার জন্য রাখার কথা বলা হয়েছে।

https://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-90/act-part-print-293.html

তাই কোনো ব্যক্তি বা মধ্যস্থতাকারীর কথায় অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার আগে অফিসের প্রকাশিত ফি তালিকা যাচাই করুন এবং প্রতিটি অর্থ পরিশোধের রসিদ সংগ্রহ করুন।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. জমির দলিলের নকল কপি কোথা থেকে তুলতে হয়?

যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মূল দলিলটি নিবন্ধন করা হয়েছিল, সাধারণত সেই অফিস থেকেই সার্টিফায়েড কপির আবেদন করতে হয়।

২. ১০ পৃষ্ঠার বাংলা দলিলের নকল তুলতে কত টাকা লাগে?

সোনাতলা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রকাশিত ফি অনুযায়ী, ১০ পৃষ্ঠার দলিলের সাধারণ নকল তুলতে ৬২০ টাকা লাগে। অন্য অফিসে সর্বশেষ ফি তালিকা যাচাই করতে হবে।

৩. মূল দলিল হারিয়ে গেলে কি নকল পাওয়া যাবে?

হ্যাঁ। নিবন্ধিত দলিলের তথ্য সংশ্লিষ্ট অফিসের রেকর্ডে থাকলে সেখান থেকে সার্টিফায়েড কপির আবেদন করা যায়।

৪. জরুরি ভিত্তিতে দলিলের নকল কত দিনে পাওয়া যায়?

কিছু সরকারি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জরুরি নকল ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে সময়সীমা অফিসভেদে আলাদা হতে পারে।

৫. দলিলের নকল কপি তুলতে দলিল নম্বর জানা বাধ্যতামূলক?

দলিল নম্বর ও সাল জানা থাকলে কপি সংগ্রহ সহজ হয়। না জানা থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিসে সূচি বই তল্লাশির মাধ্যমে দলিল শনাক্ত করার বিষয়ে জানতে পারেন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: