ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

জমির নামজারি করতে কী কী লাগে, খরচ কত ও কত দিন লাগে?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ৩০ ১২:২৪:৩৩
জমির নামজারি করতে কী কী লাগে, খরচ কত ও কত দিন লাগে?

জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার পর শুধু দলিল হাতে থাকলেই মালিকানাসংক্রান্ত সব কাজ শেষ হয় না। সরকারি ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হয়, যে প্রক্রিয়াকে বলা হয় নামজারি বা মিউটেশন। বাংলাদেশে এখন ঘরে বসেই অনলাইনে নামজারির আবেদন করা যায়। সরকারি নির্ধারিত ফি অনুযায়ী, একটি নামজারি আবেদনে মোট খরচ ১ হাজার ১৭০ টাকা। আর ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী, সাধারণত ২৮ দিনের মধ্যে নামজারি প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি করা হয়।

তবে আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা জরুরি। কারণ জমি কেনা, উত্তরাধিকার, দান বা অন্য কোনো সূত্রে পাওয়া—মালিকানা অর্জনের ধরন অনুযায়ী আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথি আলাদা হতে পারে।

জমির নামজারি করতে কী কী কাগজপত্র লাগে?

নামজারির আবেদন করার সময় জমির মালিকানা ও পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র দিতে হয়। সাধারণভাবে নিচের নথিগুলো প্রস্তুত রাখা ভালো—

১. জমির দলিল: যে দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা পেয়েছেন, তার ফটোকপি বা সার্টিফায়েড কপি।

২. সর্বশেষ খতিয়ান: জমির সর্বশেষ জরিপের খতিয়ান বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আগের নামজারি খতিয়ানের কপি।

৩. বায়া বা পিট দলিল: জমির আগের মালিকানা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ববর্তী দলিল।

৪. জাতীয় পরিচয়পত্র: আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য।

৫. ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা: জমির হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রসিদ।

৬. ওয়ারিশ সনদ: উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া ওয়ারিশ সনদ।

৭. মৃত্যু সনদ: উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিকানা পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মৃত মালিকের মৃত্যু সনদ প্রয়োজন হতে পারে।

৮. আদালতের রায় বা ডিক্রি: আদালতের আদেশ বা রায়ের মাধ্যমে জমির মালিকানা পেলে সংশ্লিষ্ট রায়, আদেশ বা ডিক্রির কপি।

৯. অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি: জমির বিবরণ, দাগ ও খতিয়ান নম্বর, ঠিকানা বা মালিকানা যাচাইয়ের জন্য কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কোনো কাগজ চাইলে তা জমা দিতে হবে।

সব আবেদনকারীর জন্য সব কাগজ বাধ্যতামূলক নয়। যেমন, জমি কেনার ক্ষেত্রে দলিল ও মালিকানার ধারাবাহিকতা প্রমাণের নথি গুরুত্বপূর্ণ; আর উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেলে ওয়ারিশ সনদ ও সংশ্লিষ্ট মালিকের মৃত্যু সনদ প্রয়োজন হতে পারে।

জমির নামজারি করতে কত টাকা লাগে?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমিসেবার নির্ধারিত ফি অনুযায়ী, নামজারির জন্য মোট সরকারি খরচ ১ হাজার ১৭০ টাকা। এই অর্থ একবারে দিতে হয় না; সাধারণত দুই ধাপে পরিশোধ করতে হয়।

আবেদনের কোর্ট ফি: ২০ টাকা

নোটিশ জারি ফি: ৫০ টাকা

রেকর্ড সংশোধন বা হালনাগাদ ফি: ১ হাজার টাকা

নামজারি খতিয়ান সরবরাহ ফি: ১০০ টাকা

মোট সরকারি ফি: ১ হাজার ১৭০ টাকা।

আবেদন জমা দেওয়ার সময় প্রথম দুই খাতের জন্য ৭০ টাকা দিতে হয়। নামজারি অনুমোদিত হলে রেকর্ড সংশোধন ও খতিয়ান সরবরাহ বাবদ বাকি ১ হাজার ১০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। এই অর্থ ডিসিআর ফি হিসেবে অনলাইনে জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

ফি-সংক্রান্ত সরকারি তথ্য পাওয়া যাবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে:

https://land.gov.bd/vumisheba-fee

জমির নামজারি হতে কত দিন সময় লাগে?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, সাধারণত একটি নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি হতে ২৮ দিন সময় লাগে। তবে এই সময়কে সব আবেদনের ক্ষেত্রে নিশ্চিত ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

আবেদনের কাগজপত্র যাচাই, ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রতিবেদন, শুনানির প্রয়োজন এবং মালিকানাসংক্রান্ত কোনো জটিলতা আছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর সময় নির্ভর করতে পারে।

আবেদনে কোনো নথির ঘাটতি থাকলে কর্তৃপক্ষ তা জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিতে পারে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সময়মতো জমা না দিলে আবেদন নিষ্পত্তিতে দেরি হতে পারে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি নির্দেশিকা:

https://mutation.land.gov.bd/nirdeshika

অনলাইনে নামজারির আবেদন করার নিয়ম

জমির নামজারির জন্য এখন অনলাইনে আবেদন করা যায়। এজন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টাল ব্যবহার করতে হবে। আবেদন করার ধাপগুলো হলো—

প্রথম ধাপ: সরকারি পোর্টালে প্রবেশ করুন

প্রথমে https://mutation.land.gov.bd/ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের মূল পোর্টাল https://land.gov.bd/ থেকেও ই-নামজারি সেবা নির্বাচন করা যায়।

দ্বিতীয় ধাপ: আবেদনসংক্রান্ত তথ্য দিন

ই-নামজারি সেবায় প্রবেশ করে নতুন আবেদন করার নির্দেশনা অনুসরণ করুন। আবেদনকারীর পরিচয়, জমির অবস্থান, মৌজা, খতিয়ান, দাগ নম্বর এবং জমির পরিমাণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে।

তৃতীয় ধাপ: মালিকানা অর্জনের তথ্য উল্লেখ করুন

জমিটি কীভাবে পেয়েছেন, তা সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে। জমি কেনা, উত্তরাধিকার, দান বা আদালতের আদেশ—যে সূত্রেই মালিকানা অর্জিত হোক, তার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য দিতে হবে।

চতুর্থ ধাপ: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করুন

দলিল, খতিয়ান, জাতীয় পরিচয়পত্র, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় নথি স্ক্যান করে আপলোড করুন। নথিগুলো যেন স্পষ্ট ও পড়ার উপযোগী হয়, তা নিশ্চিত করুন।

পঞ্চম ধাপ: আবেদন ফি পরিশোধ করুন

আবেদন জমা দেওয়ার সময় কোর্ট ফি ২০ টাকা এবং নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা—মোট ৭০ টাকা অনলাইনে পরিশোধ করতে হবে। এরপর আবেদন সাবমিট করলে তা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে চলে যায়। পেমেন্টের রসিদ ও আবেদন নম্বর সংরক্ষণ করুন।

ষষ্ঠ ধাপ: আবেদন যাচাই ও শুনানির জন্য অপেক্ষা করুন

আবেদন জমা হওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রতিবেদন চাইতে পারেন। কোনো তথ্য বা কাগজপত্রের প্রয়োজন হলে আবেদনকারীকে জানানো হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী শুনানিতেও অংশ নিতে হতে পারে।

সপ্তম ধাপ: অনুমোদনের পর বাকি ফি দিন

নামজারি অনুমোদিত হলে মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে ডিসিআর ফি জমা দেওয়ার নির্দেশনা পাঠানো হয়। তখন বাকি ১ হাজার ১০০ টাকা অনলাইনে পরিশোধ করতে হবে। এরপর নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর সংগ্রহ করা যায়।

নামজারির আবেদন করার পর কীভাবে অবস্থা জানবেন?

আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদন নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করুন। ই-নামজারি পোর্টালে আবেদনসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে আবেদনের অগ্রগতি জানা যায়। মোবাইলে আসা এসএমএসও নিয়মিত খেয়াল রাখতে হবে।

আবেদনে কোনো ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিন। শুধু আবেদন জমা দিয়ে অপেক্ষা না করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে কি না, তা খেয়াল রাখা জরুরি।

নামজারি আবেদন বাতিল হলে কী করবেন?

কাগজপত্রের ঘাটতি, মালিকানার তথ্যের অসংগতি বা জমি নিয়ে জটিলতা থাকলে আবেদন নামঞ্জুর হতে পারে। তবে কোনো কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে।

আবেদন নামঞ্জুর হলে সিদ্ধান্তের কারণ জানতে হবে। প্রয়োজনীয় দলিল বা তথ্য সংগ্রহ করে বিধি অনুযায়ী পুনরায় আবেদন বা রিভিউয়ের সুযোগ আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে জেনে নিতে পারেন।

নামজারি করলেই কি জমির মালিকানা নিশ্চিত হয়?

নামজারি মূলত ভূমি রাজস্ব রেকর্ডে মালিকের নাম হালনাগাদ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এটি জমির মালিকানা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড হলেও শুধু নামজারি খতিয়ান থাকলেই কোনো জমির চূড়ান্ত মালিকানা নিয়ে সব বিরোধের অবসান হয় না।

জমি কেনার আগে দলিল, পূর্ববর্তী মালিকানার ধারাবাহিকতা, খতিয়ান, দখল এবং জমির অন্যান্য নথি যাচাই করা প্রয়োজন। মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে আইনগত পরামর্শ নেওয়া উচিত।

নামজারির আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন

জমির নামজারি করতে সরকারি ফি মোট ১ হাজার ১৭০ টাকা। সাধারণত ২৮ দিনের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির কথা থাকলেও কাগজপত্রের ঘাটতি বা জটিলতায় বেশি সময় লাগতে পারে। তাই আবেদন করার আগে দলিল, খতিয়ান, দাখিলা ও মালিকানার প্রমাণপত্র প্রস্তুত রাখুন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হলে তার কারণ ও সরকারি ভিত্তি জানতে চান। সব ধরনের ফি নির্ধারিত সরকারি পদ্ধতিতে পরিশোধ করুন এবং প্রতিটি লেনদেনের রসিদ সংরক্ষণ করুন।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. জমির নামজারি করতে মোট কত টাকা লাগে?

সরকারি নির্ধারিত ফি অনুযায়ী মোট ১ হাজার ১৭০ টাকা লাগে। আবেদনের সময় ৭০ টাকা এবং অনুমোদনের পর ১ হাজার ১০০ টাকা দিতে হয়।

২. জমির নামজারি হতে কত দিন সময় লাগে?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী, সাধারণত ২৮ দিনে নামজারি প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি করা হয়। তবে কাগজপত্রের ঘাটতি বা জটিলতায় সময় বাড়তে পারে।

৩. উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি করতে কী লাগে?

সাধারণত দলিল বা সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের কপি, ওয়ারিশ সনদ, প্রয়োজনে মৃত্যু সনদ, আবেদনকারীর পরিচয়পত্র এবং ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা প্রয়োজন হতে পারে।

৪. ঘরে বসে কি জমির নামজারি করা যায়?

হ্যাঁ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টালে অনলাইনে আবেদন ও নির্ধারিত ফি পরিশোধ করা যায়। তবে প্রয়োজনে শুনানি বা অতিরিক্ত কাগজপত্র জমা দিতে হতে পারে।

৫. নামজারি অনুমোদনের পর কী করতে হবে?

অনুমোদনের পর ডিসিআর ফি বাবদ ১ হাজার ১০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। এরপর নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর সংগ্রহ করতে পারবেন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: