শীতে ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে যে ৮টি কাজ করবেন
শীতের সময় ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ঠোঁট ফাটা, হাত-পায়ে খসখসে ভাব কিংবা শরীরে চুলকানি দেখা দেওয়া বেশ পরিচিত সমস্যা। তাপমাত্রা কমার সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা কমে গেলে ত্বক স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না। এর সঙ্গে অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল, কড়া সাবান এবং ঘরের শুষ্ক পরিবেশ যুক্ত হয়ে ত্বকের সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ সময় ত্বকের যত্নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে আর্দ্রতা ধরে রাখার ওপর। গোসলের পরপরই ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার, গরম পানির পরিবর্তে কুসুম গরম পানি দিয়ে অল্প সময় গোসল এবং সুগন্ধিবিহীন কোমল ক্লিনজার ব্যবহার করলে শুষ্কতা কমাতে সাহায্য পাওয়া যায়। তবে ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে ফেটে গেলে, রক্ত বের হলে কিংবা চুলকানি দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
শীতে ত্বক বেশি শুষ্ক হয় কেন?
ত্বকের বাইরের স্তর শরীরের ভেতরের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং বাইরের ক্ষতিকর উপাদান থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। শীতকালে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় ত্বক থেকে পানি হারানোর প্রবণতা বাড়তে পারে। ফলে ত্বক হয়ে ওঠে রুক্ষ ও শুষ্ক।
শীতের সময় কয়েকটি অভ্যাসও এ সমস্যা বাড়ায়—
অতিরিক্ত গরম পানিতে দীর্ঘ সময় গোসল করা।
কড়া সাবান ও সুগন্ধিযুক্ত বডি ওয়াশ ব্যবহার করা।
বারবার মুখ বা শরীর ধোয়া।
গোসলের পর ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার না করা।
ঘরে হিটার বা অতিরিক্ত শুষ্ক বাতাসের মধ্যে দীর্ঘ সময় থাকা।
শুষ্ক ত্বকে নিয়মিত স্ক্রাব বা এক্সফোলিয়েটিং পণ্য ব্যবহার করা।
এ কারণে শীতের শুরু থেকেই ত্বকের পরিচর্যার রুটিনে কিছু পরিবর্তন আনা ভালো।
শীতে ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে যা করবেন
ত্বকের শুষ্কতা কমাতে দামি প্রসাধনী ব্যবহারের চেয়ে সঠিক পরিচর্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের কয়েকটি অভ্যাস পরিবর্তন করলেই অনেক ক্ষেত্রে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখা সহজ হয়।
১. গোসলের পরপরই ময়েশ্চারাইজার লাগান
শীতকালে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাসগুলোর একটি হলো গোসলের পরপরই ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা। গোসল শেষে তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে পানি মুছে ত্বক সামান্য ভেজা থাকতেই ময়েশ্চারাইজার লাগান। এতে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
শুষ্ক ত্বকের জন্য পাতলা লোশনের পরিবর্তে ঘন ক্রিম বা অয়েন্টমেন্ট বেশি কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে গ্লিসারিন, সিরামাইড, পেট্রোলাটাম বা হায়ালুরোনিক অ্যাসিডযুক্ত ময়েশ্চারাইজার বিবেচনা করা যায়।
ত্বক বেশি শুষ্ক হলে দিনে একাধিকবার ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। হাত ধোয়ার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগেও হাত-পায়ে ক্রিম লাগাতে পারেন।
২. অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করবেন না
শীতের সকালে গরম পানিতে গোসল করতে স্বস্তি লাগলেও অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল কমিয়ে দিতে পারে। এতে শুষ্কতা ও চুলকানি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই গোসলের সময় কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন। গোসলের সময় পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। দীর্ঘ সময় পানির সংস্পর্শে থাকলে ত্বকের শুষ্কতা বাড়তে পারে।
গোসল শেষে শরীর জোরে ঘষে মুছবেন না। নরম তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে পানি শুষে নিয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগান।
৩. সাবান ও ফেসওয়াশ বাছাইয়ে সতর্ক থাকুন
সব ধরনের সাবান শুষ্ক ত্বকের জন্য উপযোগী নয়। কিছু সাবান, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ক্লিনজার ও সুগন্ধিযুক্ত বডি ওয়াশ ত্বকের প্রাকৃতিক তেল কমিয়ে দিতে পারে।
শীতকালে মাইল্ড বা কোমল ক্লিনজার ব্যবহার করা ভালো। পণ্যের গায়ে Fragrance-free লেখা আছে কি না দেখে নিতে পারেন। মুখ পরিষ্কারের ক্ষেত্রেও ত্বকের ধরন অনুযায়ী কোমল ফেসওয়াশ বেছে নেওয়া উচিত।
শরীরের সব অংশে বারবার সাবান ব্যবহার না করে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে ব্যবহার করুন।
৪. ঠোঁট ও হাত-পায়ের বিশেষ যত্ন নিন
শীতকালে মুখের পাশাপাশি ঠোঁট, হাত, পায়ের গোড়ালি ও আঙুলের ফাঁকে শুষ্কতা দেখা দিতে পারে। এসব অংশে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারে অবহেলা করা উচিত নয়।
ঠোঁট শুষ্ক বা ফেটে গেলে পেট্রোলাটামযুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করতে পারেন। ঠোঁট বারবার জিহ্বা দিয়ে ভেজানো থেকে বিরত থাকুন। এতে ঠোঁট আরও শুষ্ক হতে পারে।
হাত ধোয়ার পর ময়েশ্চারাইজার লাগান। পায়ের গোড়ালি বেশি শুষ্ক হলে রাতে ঘুমানোর আগে ঘন ক্রিম বা পেট্রোলাটাম লাগিয়ে সুতির মোজা পরতে পারেন।
৫. শুষ্ক ত্বকে স্ক্রাব ব্যবহার কমিয়ে দিন
অনেকে মুখের মৃত কোষ দূর করতে শীতেও নিয়মিত স্ক্রাব ব্যবহার করেন। কিন্তু ত্বক যখন শুষ্ক, খসখসে বা ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থায় থাকে, তখন স্ক্রাব করলে অস্বস্তি ও জ্বালাপোড়া বাড়তে পারে।
এ সময় শক্ত দানাযুক্ত স্ক্রাব, অতিরিক্ত ঘষাঘষি এবং ত্বক শুষ্ক করতে পারে এমন এক্সফোলিয়েটিং পণ্যের ব্যবহার কমানো ভালো। ত্বকের শুষ্ক স্তর তুলে ফেলার চেষ্টা না করে বরং ময়েশ্চারাইজার দিয়ে আর্দ্রতা ধরে রাখার দিকে মনোযোগ দিন।
৬. ঘরের বাতাসের আর্দ্রতা বজায় রাখুন
শীতকালে ঘরের বাতাসও শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে হিটার বা অন্য কোনো তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র ব্যবহার করলে বাতাসের আর্দ্রতা কমতে পারে। এতে ত্বকের শুষ্কতা আরও বাড়তে পারে।
এ সমস্যা কমাতে ঘরে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। যন্ত্রটি নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে এর ভেতরে জীবাণু বা ছত্রাক জমে না থাকে। ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন এবং অতিরিক্ত গরম পরিবেশ এড়িয়ে চলুন।
৭. শীতেও সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন
অনেকে মনে করেন, শীতকালে রোদ কম থাকায় সানস্ক্রিনের প্রয়োজন নেই। ধারণাটি ঠিক নয়। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সারা বছরই ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।
তাই দিনের বেলায় বাইরে বের হলে মুখ, গলা ও হাতের মতো খোলা অংশে ব্রড-স্পেকট্রাম SPF ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে পণ্যের নির্দেশনা অনুযায়ী আবার লাগাতে হবে।
৮. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন। শীতকালে তৃষ্ণা তুলনামূলক কম অনুভূত হলেও নিয়মিত পানি পান করার অভ্যাস বজায় রাখুন।
তবে শুধু বেশি পানি পান করলেই ত্বকের শুষ্কতা দূর হবে—এমন নয়। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে ময়েশ্চারাইজার, কোমল ক্লিনজার এবং সঠিক গোসলের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
শীতে কোন ধরনের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করবেন?
ত্বকের ধরন ও শুষ্কতার মাত্রা অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার বেছে নেওয়া উচিত। সব ধরনের ত্বকের জন্য একই পণ্য সমান কার্যকর নাও হতে পারে।
শুষ্ক ত্বক: ঘন ক্রিম বা অয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করতে পারেন। সিরামাইড, গ্লিসারিন ও পেট্রোলাটামযুক্ত পণ্য উপকারী হতে পারে।
তৈলাক্ত ত্বক: হালকা জেল বা নন-কমেডোজেনিক ময়েশ্চারাইজার বেছে নিতে পারেন।
সংবেদনশীল ত্বক: সুগন্ধিবিহীন ও কোমল উপাদানযুক্ত পণ্য ব্যবহার করা ভালো।
অতিরিক্ত শুষ্ক ত্বক: সাধারণ লোশনের পরিবর্তে ঘন ক্রিম বা অয়েন্টমেন্ট বেশি উপযোগী হতে পারে।
নতুন কোনো পণ্য ব্যবহারের আগে ত্বকের ছোট একটি অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব বা অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিলে পণ্যটি ব্যবহার বন্ধ করুন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
সাধারণ শুষ্ক ত্বকের সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে ঘরোয়া পরিচর্যায় নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে সব ধরনের শুষ্কতা শুধু আবহাওয়ার কারণে হয় না। একজিমা, অন্য কোনো ত্বকের সমস্যা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা শারীরিক অসুস্থতার কারণেও ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হতে পারে।
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন—
ত্বকে গভীর ফাটল তৈরি হওয়া বা রক্ত বের হওয়া।
অতিরিক্ত চুলকানিতে ঘুমের সমস্যা হওয়া।
ত্বকে লালচে র্যাশ, ফোলা বা জ্বালাপোড়া দেখা দেওয়া।
ঘরোয়া পরিচর্যার পরও শুষ্কতা না কমা বা আরও বেড়ে যাওয়া।
ত্বকে ক্ষত, ঘা বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেওয়া।
প্রয়োজনে চিকিৎসক শুষ্কতার কারণ নির্ণয় করে উপযুক্ত ক্রিম বা চিকিৎসা দিতে পারেন। নিজের ইচ্ছায় স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম বা ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।
শীতে ত্বক ভালো রাখতে প্রতিদিনের যত্নই গুরুত্বপূর্ণ
শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে নিয়মিত পরিচর্যার বিকল্প নেই। কুসুম গরম পানিতে অল্প সময় গোসল, গোসলের পর ময়েশ্চারাইজার, কোমল ক্লিনজার এবং ঠোঁট ও হাত-পায়ের বাড়তি যত্ন—এই অভ্যাসগুলো ত্বককে শুষ্কতা থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
ত্বকের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা স্বাভাবিক পরিচর্যায় না কমলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. শীতে ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে প্রথমে কী করবেন?
গোসলের পর ত্বক সামান্য ভেজা থাকতেই ঘন ময়েশ্চারাইজার লাগান। পাশাপাশি অতিরিক্ত গরম পানি ও কড়া সাবান ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
২. শীতে মুখে কোন ধরনের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো?
ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার বেছে নিতে হবে। শুষ্ক ত্বকের জন্য ঘন ক্রিম এবং তৈলাক্ত ত্বকের জন্য হালকা, নন-কমেডোজেনিক জেল বা লোশন উপযোগী হতে পারে।
৩. শীতে প্রতিদিন গরম পানিতে গোসল করলে কি ত্বক শুষ্ক হয়?
অতিরিক্ত গরম পানিতে দীর্ঘ সময় গোসল করলে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল কমে গিয়ে শুষ্কতা বাড়তে পারে। তাই কুসুম গরম পানিতে পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে গোসল করা ভালো।
৪. শীতকালে ঠোঁট ফাটা কমাতে কী ব্যবহার করবেন?
ঠোঁট শুষ্ক বা ফেটে গেলে পেট্রোলাটামযুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করতে পারেন। ঠোঁট বারবার জিহ্বা দিয়ে ভেজানো এড়িয়ে চলুন।
৫. শীতের শুষ্ক ত্বকের জন্য কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
ত্বক গভীরভাবে ফেটে গেলে, রক্ত বের হলে, অতিরিক্ত চুলকানি বা র্যাশ দেখা দিলে কিংবা নিয়মিত পরিচর্যার পরও সমস্যা না কমলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আল-মামুন/