ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

তাহসিফের শেষ ছয় ঘণ্টায় কী ঘটেছিল, দীপকে জিজ্ঞাসাবাদে যা জানল পিবিআই

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ৩০ ১৪:৫৭:০২
তাহসিফের শেষ ছয় ঘণ্টায় কী ঘটেছিল, দীপকে জিজ্ঞাসাবাদে যা জানল পিবিআই

পরিবারের কেনাকাটা শেষে সন্ধ্যায় এক জুনিয়র বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক সামরিক পাইলট ও কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি। এরপর আর বাড়ি ফেরা হয়নি তার। একপর্যায়ে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ। মৃত্যুর আগে প্রায় ছয় ঘণ্টা তাহসিফের সঙ্গে থাকা সেই বন্ধু শাহরিয়ার দীপকে এবার হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তার দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পিবিআই সদর দপ্তর থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সংস্থাটি জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে শাহরিয়ার দীপকে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে দুজন একসঙ্গে ছিলেন। সে কারণে তাদের মধ্যে কী ঘটেছিল এবং পরবর্তী সময়ে কী হয়েছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

জিজ্ঞাসাবাদে দীপের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো সরেজমিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।

সিসিটিভিতে ধরা পড়ে তাহসিফ ও দীপের সাক্ষাৎ

তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার একটি সিসিটিভি ফুটেজ। ওই ভিডিওতে উত্তরার একটি গ্যারেজের সামনে তাহসিফকে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে ও হাত মেলাতে দেখা যায়। সবুজ পাঞ্জাবি পরা তাহসিফের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিকে পরে তার পরিবারের সদস্যরা জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন।

ভিডিওর দৃশ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাদের দেখা হয়। সেখানে সাক্ষাতের পর দুজন দুটি পৃথক মোটরসাইকেলে করে চলে যান।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীপের ডাকে সাড়া দিয়েই সেদিন বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তাহসিফ। পরে দীপ তাদের জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা হওয়ায় দুজন একটি ওয়ার্কশপে যান। মেরামতের কাজ শেষ হলে তারা বাসায় ফিরে খাবার খান। এরপর সেখান থেকে চলে যান বলে দাবি করেন দীপ।

তবে তার এই বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনার অন্যান্য তথ্যের মিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করছে পিবিআই। তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া কিংবা তার মৃত্যুর ঘটনায় দীপের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।

রাতের শেষ বার্তা, এরপর আর খোঁজ মেলেনি

তাহসিফের পরিবারের কাছে তার নিখোঁজ হওয়ার রাতের একটি বার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে ছেলের কাছ থেকে ‘আম্মু আমি আসছি’ লেখা একটি মেসেজ পেয়েছিলেন তারা। এরপর তাহসিফের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গণমাধ্যমকে তাহসিফের বাবা জানান, নিখোঁজ হওয়ার দিনটি পরিবারের সঙ্গে কাটিয়েছিলেন তার ছেলে। ২৭ অক্টোবর সারাদিন মাকে সঙ্গে নিয়ে বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেন তিনি। সন্ধ্যার পর দীপের ডাকে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি।

পরিবারের সদস্যরা রাতভর তার কোনো সন্ধান না পেয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। পরে ভোর সোয়া ৫টার দিকে পুলিশের কাছ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তারা।

তাহসিফের বাবা আরও জানান, রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় এর আগে কখনো যাননি তার ছেলে। এ কারণে সেখানে কীভাবে তিনি পৌঁছালেন, তা নিয়ে তাদের প্রশ্ন রয়েছে। তার আশঙ্কা, ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।

তুরাগ নদে যেভাবে পাওয়া যায় মরদেহ

তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পায় পুলিশ। খবরের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন।

পরবর্তী সময়ে মরদেহের সঙ্গে থাকা হাতঘড়ি এবং পকেটে পাওয়া আইফোনের সূত্র ধরে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। সেটি ছিল তাহসিফ সাউরির মরদেহ।

উদ্ধারের পরদিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। একই দিন বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

বিমানবাহিনী থেকে বরখাস্তের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি

তাহসিফের কর্মজীবন সম্পর্কে তার বাবা জানিয়েছেন, শৃঙ্খলাজনিত কারণে তাকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়। ওই সময় তার সঙ্গে আরও কয়েকজনকেও বরখাস্ত করা হয়েছিল।

বিমানবাহিনী ছাড়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তাহসিফ।

এদিকে তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পুলিশ এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। নিখোঁজ হওয়ার আগে দীপের সঙ্গে কাটানো সময়, তাদের সাক্ষাতের সিসিটিভি ফুটেজ, দীপের দেওয়া বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল, তা উদঘাটনে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

FAQ

১. তাহসিফ সাউরি নিখোঁজ হওয়ার আগে কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন?

তার জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার দীপের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তাহসিফ।

২. তাহসিফ ও দীপের দেখা হয়েছিল কখন?

২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাদের দেখা হয়।

৩. শাহরিয়ার দীপকে কেন জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পিবিআই?

তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে প্রায় ছয় ঘণ্টা তার সঙ্গে ছিলেন দীপ। ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তথ্য জানতে এবং তার বক্তব্য যাচাই করতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

৪. তাহসিফের মরদেহ কোথায় পাওয়া যায়?

২৮ অক্টোবর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

৫. তাহসিফের মৃত্যুর কারণ কী জানা গেছে?

এখনো মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি পুলিশ। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: