শীতকালে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করার ৭টি কার্যকর উপায়
শীতের শুষ্ক আবহাওয়া, ঠান্ডা বাতাস ও আর্দ্রতার ঘাটতির কারণে ঠোঁট সহজেই শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে পারে। অনেকেই ঠোঁটের শুষ্কতা কমাতে বারবার জিহ্বা দিয়ে ভেজান। কিন্তু এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও লালা শুকিয়ে যাওয়ার পর ঠোঁট আরও বেশি শুষ্ক হয়ে পড়ে। তাই শীতকালে ঠোঁট ফাটা ঠেকাতে নিয়মিত উপযুক্ত লিপ বাম ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং কিছু অভ্যাস এড়িয়ে চলা জরুরি।
ঠোঁটের ত্বক শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল। এ কারণে ঠান্ডা, শুষ্ক বাতাস ও রোদের প্রভাবেও ঠোঁট দ্রুত আর্দ্রতা হারাতে পারে। শুরুতে ঠোঁট টানটান বা রুক্ষ মনে হলেও পরে চামড়া উঠতে পারে, ফাটল দেখা দিতে পারে এবং কখনো কখনো রক্তও বের হতে পারে।
শীতকালে ঠোঁট ফাটে কেন?
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কমে গেলে ঠোঁটের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ঠান্ডা বাতাস ও শুষ্ক পরিবেশের সংস্পর্শে থাকলে ঠোঁটের ত্বক আরও দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে।
ঠোঁট ফাটার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে—
ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাস: শীতের বাতাস ঠোঁটের আর্দ্রতা কমিয়ে শুষ্কতা বাড়াতে পারে।
বারবার ঠোঁট চাটা: লালা শুকিয়ে যাওয়ার সময় ঠোঁট আরও শুষ্ক হয়ে যায়। ফলে ফাটার প্রবণতা বাড়ে।
পর্যাপ্ত পানি পান না করা: শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে ঠোঁটও শুষ্ক হতে পারে।
রোদে থাকা: শীতকালেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ঠোঁটের ক্ষতি করতে পারে।
প্রসাধনীর উপাদান: কিছু লিপ বাম, লিপস্টিক, টুথপেস্ট বা প্রসাধনীর সুগন্ধি ও অন্যান্য উপাদান ঠোঁটে জ্বালাপোড়া বা অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
শীতকালে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করার কার্যকর উপায়
১. নিয়মিত পেট্রোলিয়াম জেলি বা উপযুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করুন
ঠোঁটের শুষ্কতা কমাতে পেট্রোলিয়াম জেলি বা পেট্রোলাটামযুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো ঠোঁটের ওপর একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে, যা আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
দিনে কয়েকবার এবং বিশেষ করে ঘুমানোর আগে ঠোঁটে লিপ বাম লাগান। ঠোঁট বেশি শুষ্ক বা ফেটে গেলে তুলনামূলক ঘন মলম ব্যবহার করা যেতে পারে।
লিপ বাম কেনার সময় পেট্রোলাটাম, মিনারেল অয়েল, সিরামাইড, ডাইমেথিকোন বা শিয়া বাটারের মতো উপাদান আছে কি না দেখতে পারেন। সুগন্ধিমুক্ত ও সংবেদনশীল ত্বকের উপযোগী পণ্য বেছে নেওয়া ভালো।
২. ঠোঁট চাটার অভ্যাস বাদ দিন
ঠোঁট শুকিয়ে গেলে অনেকেই স্বস্তি পেতে বারবার জিহ্বা দিয়ে ভেজান। কিন্তু এটি ঠোঁট ফাটার অন্যতম সাধারণ কারণ। লালার পানি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এতে থাকা উপাদান ঠোঁটের সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে।
তাই ঠোঁট শুকিয়ে গেলে জিহ্বা দিয়ে ভেজানোর পরিবর্তে লিপ বাম লাগান। একই সঙ্গে ঠোঁট কামড়ানো বা দাঁত দিয়ে চামড়া তোলার অভ্যাসও পরিহার করুন।
৩. ঠোঁটের খোসা টেনে তুলবেন না
ঠোঁট ফাটলে অনেক সময় শুকনো চামড়া উঠে আসে। অস্বস্তি থেকে অনেকে হাত দিয়ে সেই চামড়া টেনে তোলেন। এতে ঠোঁটে ক্ষত তৈরি হতে পারে, রক্তপাত হতে পারে এবং সুস্থ হতে বেশি সময় লাগতে পারে।
এ ধরনের সমস্যা এড়াতে ঠোঁটের খোসা টেনে তুলবেন না। বরং নিয়মিত ময়েশ্চারাইজিং লিপ বাম ব্যবহার করে ঠোঁট নরম রাখুন।
৪. বাইরে যাওয়ার আগে সানস্ক্রিনযুক্ত লিপ বাম লাগান
শীতকালে রোদের তীব্রতা কম মনে হলেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ঠোঁটের ক্ষতি করতে পারে। তাই বাইরে যাওয়ার আগে SPF ৩০ বা তার বেশি সুরক্ষামাত্রার লিপ বাম ব্যবহার করা ভালো।
দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে প্রায় দুই ঘণ্টা পর আবার লাগান। খাওয়া বা ঠোঁট মুছে ফেলার পর প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় ব্যবহার করুন।
৫. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিলে ঠোঁটসহ ত্বকের বিভিন্ন অংশ শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। তাই শীতকালেও নিয়মিত পানি পান করা প্রয়োজন।
তবে শুধু পানি পান করলেই ঠোঁট ফাটা বন্ধ হবে—এমন নয়। ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতে লিপ বাম ব্যবহার এবং শুষ্ক বাতাস থেকে সুরক্ষাও জরুরি।
৬. ঠান্ডা বাতাস থেকে ঠোঁট রক্ষা করুন
বাইরে বের হলে ঠোঁট যেন সরাসরি ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে না আসে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। প্রয়োজন হলে নরম স্কার্ফ দিয়ে মুখের নিচের অংশ ঢেকে রাখতে পারেন।
ঘরের বাতাস অতিরিক্ত শুষ্ক হলে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে রাতে শোবার ঘরের বাতাসে আর্দ্রতা বজায় রাখতে এটি সহায়ক হতে পারে। তবে যন্ত্রটি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি।
কোন ধরনের লিপ বাম ব্যবহার করবেন না?
সব লিপ বাম সবার জন্য উপযোগী নয়। কিছু পণ্যে থাকা সুগন্ধি, স্বাদ বা শীতল অনুভূতি তৈরির উপাদান ঠোঁটের শুষ্কতা ও জ্বালাপোড়া বাড়াতে পারে।
ঠোঁট ফাটা অবস্থায় নিচের উপাদানগুলো আছে—এমন পণ্য এড়িয়ে চলা ভালো:
মেনথল
কর্পূর
ইউক্যালিপটাস
পেপারমিন্ট বা মিন্টের সুগন্ধি
দারুচিনি বা সাইট্রাস ফ্লেভার
ফেনল
স্যালিসাইলিক অ্যাসিড
অতিরিক্ত সুগন্ধি বা ফ্লেভারযুক্ত উপাদান
কোনো লিপ বাম লাগানোর পর ঠোঁটে জ্বালাপোড়া, চুলকানি বা অস্বস্তি হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করুন। ঠোঁট ভালো না হওয়া পর্যন্ত সুগন্ধিমুক্ত ও সাধারণ উপাদানের পণ্য ব্যবহার করাই ভালো।
ঠোঁট ফাটলে কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
সাধারণ শুষ্কতা ও ঠোঁট ফাটা ঘরোয়া যত্নে অনেক সময় কমে যায়। তবে সব ক্ষেত্রে এটি শুধু শীতের প্রভাব নয়। অ্যালার্জি, সংক্রমণ কিংবা অন্য কোনো সমস্যার কারণেও ঠোঁট দীর্ঘদিন শুষ্ক ও ফাটা থাকতে পারে।
নিয়মিত যত্ন নেওয়ার পরও দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে উন্নতি না হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ঠোঁট অতিরিক্ত ফুলে গেলে, গরম ও লাল হয়ে গেলে, তীব্র ব্যথা হলে বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। দীর্ঘদিন ধরে না শুকানো ক্ষত বা ঘা থাকলেও অবহেলা করা ঠিক নয়।
ঠোঁটে ছোট পানিভর্তি ফোসকা দেখা দিলে সেটি সাধারণ শুষ্কতার বদলে কোল্ড সোরের লক্ষণও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিজে থেকে কোনো ওষুধ ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শীতেও ঠোঁট সুস্থ রাখতে প্রতিদিনের যত্ন
ঠোঁট ফাটা প্রতিরোধে আলাদা কোনো জটিল রুটিনের প্রয়োজন নেই। সকালে, বাইরে যাওয়ার আগে, প্রয়োজন অনুযায়ী দিনের বিভিন্ন সময়ে এবং ঘুমানোর আগে উপযুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করুন। ঠোঁট চাটা ও খোসা তোলার অভ্যাস বাদ দিন। পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং ঠান্ডা বাতাস ও রোদ থেকে ঠোঁটকে সুরক্ষিত রাখুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঠোঁটে অস্বস্তি তৈরি করে এমন প্রসাধনী ব্যবহার না করা। নিয়মিত যত্নের পরও সমস্যা না কমলে এর কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন
১. শীতকালে ঠোঁট ফাটা বন্ধ করতে কী ব্যবহার করবেন?
পেট্রোলিয়াম জেলি বা পেট্রোলাটামযুক্ত সুগন্ধিমুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করতে পারেন। দিনে কয়েকবার এবং ঘুমানোর আগে লাগালে ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
২. ঠোঁট ফাটলে বারবার জিহ্বা দিয়ে ভেজানো কি ঠিক?
না। লালা শুকিয়ে যাওয়ার পর ঠোঁট আরও শুষ্ক হতে পারে। তাই ঠোঁট চাটার পরিবর্তে লিপ বাম ব্যবহার করুন।
৩. ঠোঁট ফাটা অবস্থায় কি স্ক্রাব ব্যবহার করা যাবে?
ফাটা বা ক্ষতযুক্ত ঠোঁটে স্ক্রাব ব্যবহার না করাই ভালো। এতে ত্বকে আরও জ্বালাপোড়া ও ক্ষত তৈরি হতে পারে।
৪. শীতকালেও কি SPFযুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করা প্রয়োজন?
হ্যাঁ। শীতকালেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ঠোঁটের ক্ষতি করতে পারে। বাইরে যাওয়ার আগে SPF ৩০ বা তার বেশি সুরক্ষামাত্রার লিপ বাম ব্যবহার করা ভালো।
৫. ঠোঁট ফাটা কত দিনেও না সারলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
নিয়মিত যত্ন নেওয়ার পরও দুই থেকে তিন সপ্তাহে উন্নতি না হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। তীব্র ব্যথা, ফোলা, সংক্রমণ বা না শুকানো ক্ষত থাকলে আরও আগেই চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
তানভির ইসলাম/