ঢাকা, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

বিদেশে বেতন আটকে রাখলে কোথায় অভিযোগ করবেন?

প্রবাসী ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ৩১ ১৯:৫৮:৪৫
বিদেশে বেতন আটকে রাখলে কোথায় অভিযোগ করবেন?

বিদেশে চাকরি করেও মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না? নিয়োগকর্তা বারবার আশ্বাস দিয়েও পাওনা টাকা পরিশোধ করছেন না? এমন পরিস্থিতিতে নীরবে অপেক্ষা না করে কর্মরত দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রমকল্যাণ উইংয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন। পাশাপাশি দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (ডিইএমও) এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সহায়তা চাইতে পারেন।

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের অনাদায়ী বেতন, ভাতা ও বিমার অর্থ আদায়ে সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে সরকারের। এ জন্য কর্মী নিজে অথবা তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্রসহ আবেদন করতে পারেন। তবে অভিযোগ করলেই সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কর্মরত দেশের শ্রম আইন, নিয়োগকর্তার সঙ্গে চুক্তি এবং অভিযোগের ধরন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

বিদেশে বেতন না পেলে প্রথমে কোথায় অভিযোগ করবেন?

বেতন আটকে রাখার ঘটনা ঘটলে প্রথমে কর্মরত দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রমকল্যাণ উইংয়ে যোগাযোগ করা উচিত। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের চাকরি, বেতন, নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ এবং অন্যান্য শ্রমসংক্রান্ত সমস্যায় এই উইং সহায়তা দিয়ে থাকে।

অভিযোগ জানানোর সময় লিখিতভাবে সমস্যার বিবরণ তুলে ধরুন। কত মাসের বেতন বকেয়া, মোট কত টাকা পাওনা এবং নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও কেন টাকা পাওয়া যাচ্ছে না, তা স্পষ্ট করে লিখুন।

কর্মরত দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের ঠিকানা, ফোন নম্বর ও ই-মেইল জানতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট দেখতে পারেন।

দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও অভিযোগ করতে পারবেন

বিদেশে থাকা কর্মী নিজে অভিযোগ জানাতে না পারলে বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও সহায়তা চাইতে পারেন। এ জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখা, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (ডিইএমও) অথবা সরাসরি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করা যায়।

আবেদনে কর্মীর নাম, পাসপোর্ট নম্বর, কর্মরত দেশের নাম, নিয়োগকর্তার পরিচয় এবং কত দিনের বেতন বকেয়া রয়েছে, তা উল্লেখ করতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।

প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারে ফোন করে সহায়তা নিন

বিদেশে বেতন আটকে রাখা বা কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত সমস্যায় সরকারি সহায়তা পেতে প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারে যোগাযোগ করা যায়।

প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারের নম্বর:

বাংলাদেশ থেকে: ১৬১৩৫ (টোল ফ্রি)

বিদেশ থেকে: +৮৮০ ৯৬১০ ১০২ ০৩০

সেবার সময়: ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিন

ফোন করার সময় কর্মীর পরিচয়, পাসপোর্ট নম্বর, কর্মরত দেশের নাম, কোম্পানির পরিচয় এবং বকেয়া বেতনের পরিমাণ জানাতে প্রস্তুত থাকুন। কল সেন্টার থেকে অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে নির্দেশনা পাওয়া যাবে।

বেতন আটকে রাখার অভিযোগ করতে যেসব কাগজ লাগবে

অভিযোগের সময় কর্মীর পরিচয়, চাকরির তথ্য এবং বকেয়া বেতনের প্রমাণ যতটা সম্ভব সংযুক্ত করা উচিত। এতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে বিষয়টি যাচাই করা সহজ হয়।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে—

পাসপোর্টের কপি।

ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের অনুমতিপত্র।

বিএমইটি স্মার্ট কার্ড, যদি থাকে।

বিদেশের রেসিডেন্স পারমিট বা পরিচয়পত্রের কপি।

নিয়োগপত্র ও চাকরির চুক্তিপত্র।

নিয়োগকর্তা বা কোম্পানির নাম, ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য।

কত মাসের বেতন বকেয়া, তার হিসাব।

বেতন স্লিপ বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট।

নিয়োগকর্তার সঙ্গে বেতন নিয়ে যোগাযোগের বার্তা বা অন্যান্য প্রমাণ।

সব কাগজ একসঙ্গে না থাকলেও অভিযোগ জানাতে দেরি করবেন না। প্রথমে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা সরকারি সহায়তা কেন্দ্রে যোগাযোগ করে আপনার পরিস্থিতিতে কোন নথি প্রয়োজন, তা জেনে নিন।

অনলাইনে অভিযোগ জানানোর উপায়

বিদেশে বেতন আটকে রাখা বা প্রবাসী কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থায় আবেদন করা যায়।

এ জন্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে অভিযোগ দাখিলের অপশন নির্বাচন করতে হবে। অভিযোগে ঘটনার বিবরণ, নিয়োগকর্তার পরিচয়, বকেয়া বেতনের পরিমাণ এবং যোগাযোগের তথ্য দিতে হবে।

এ ছাড়া সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (GRS) ব্যবহার করেও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কাছে অভিযোগ জানানো যায়।

দূতাবাস কি আটকে থাকা বেতন আদায় করে দিতে পারে?

বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কর্মী ও নিয়োগকর্তার মধ্যে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নিতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বা অভিযোগের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে।

তবে দূতাবাস বিদেশের আদালতের মতো সরাসরি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রায় দিতে পারে না। বকেয়া বেতন আদায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইন ও কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।

সরকারি সিটিজেন চার্টারে অনাদায়ী বেতন, ভাতা ও বিমার অর্থ আদায়ে সহায়তার জন্য আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে সাত কার্যদিবসের যে সময়সীমা বলা হয়েছে, সেটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশাসনিক সময়; বকেয়া বেতন আদায়ের নিশ্চয়তা নয়।

বেতন আটকে রাখলে যেসব ভুল করবেন না

বেতন না পাওয়ার কারণে অনেক কর্মী হতাশ হয়ে হঠাৎ কর্মস্থল ছেড়ে দেন কিংবা নিয়োগকর্তার সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এতে পরবর্তী সময়ে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে। তাই কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

নিয়োগকর্তার কাছে লিখিতভাবে বকেয়া বেতনের হিসাব চান।

বেতন স্লিপ, ব্যাংক লেনদেন ও যোগাযোগের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।

কোনো কাগজ না বুঝে স্বাক্ষর করবেন না।

পাওনা টাকা না বুঝে পেয়েছেন—এমন স্বীকারোক্তি দেবেন না।

দালাল বা অননুমোদিত ব্যক্তির মাধ্যমে টাকা আদায়ের প্রলোভনে পড়বেন না।

ভয়ভীতি বা নির্যাতনের আশঙ্কা থাকলে নিরাপদ স্থানে গিয়ে দ্রুত স্থানীয় জরুরি সেবা ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

বিদেশে বেতন আটকে রাখা হলে চুপ করে অপেক্ষা না করে দ্রুত অভিযোগ জানানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কর্মরত দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং, প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার এবং দেশে থাকা পরিবারের মাধ্যমে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সহায়তা নেওয়া যায়।

অভিযোগের সঙ্গে চাকরির চুক্তিপত্র, বেতন আটকে রাখার প্রমাণ এবং নিয়োগকর্তার পরিচয় যুক্ত করলে বিষয়টি যাচাই করা সহজ হয়। নিজের পাওনা আদায়ের চেষ্টা করতে গিয়ে কোনো অবৈধ বা ঝুঁকিপূর্ণ পথে না যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. বিদেশে বেতন না পেলে প্রথমে কোথায় অভিযোগ করব?

প্রথমে কর্মরত দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রমকল্যাণ উইংয়ে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজনে প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারেও সহায়তা চাইতে পারেন।

২. বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্য কি অভিযোগ করতে পারবেন?

হ্যাঁ। পরিবারের সদস্যরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখা, ডিইএমও অথবা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করতে পারেন।

৩. বিদেশ থেকে প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারে ফোন করার নম্বর কত?

বিদেশ থেকে +৮৮০ ৯৬১০ ১০২ ০৩০ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়। বাংলাদেশ থেকে ১৬১৩৫ নম্বরে টোল ফ্রি কল করা যায়।

৪. বকেয়া বেতনের অভিযোগ করতে কী কী কাগজ লাগবে?

পাসপোর্ট, ওয়ার্ক পারমিট, চাকরির চুক্তিপত্র, নিয়োগকর্তার পরিচয় এবং বকেয়া বেতনের হিসাব প্রস্তুত রাখা উচিত। বেতন স্লিপ ও ব্যাংক স্টেটমেন্টও সহায়ক প্রমাণ।

৫. অভিযোগ করলেই কি সাত দিনের মধ্যে বকেয়া বেতন পাওয়া যাবে?

না। সাত কার্যদিবসের সময়সীমা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পত্র পাওয়ার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সময়। এটি বকেয়া বেতন আদায়ের নিশ্চয়তা নয়।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: