আকামা হারিয়ে গেলে কী করবেন? নতুন কার্ড পাওয়ার নিয়ম
সৌদি আরবে প্রবাসীদের জন্য আকামা (Iqama) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিচয়পত্র। কাজ, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা গ্রহণসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে এটি দরকার হয়। কিন্তু অসাবধানতাবশত আকামা হারিয়ে গেলে কী করতে হবে, কোথায় জানাতে হবে এবং কীভাবে নতুন কার্ড পাওয়া যাবে—তা অনেক প্রবাসীরই জানা নেই। সৌদি আরবের নিয়ম অনুযায়ী, আকামা হারানোর বিষয়টি দ্রুত জানাতে হয়। বর্তমানে প্রবাসী কর্মীদের হারানো আকামার তথ্য জানানোর জন্য সৌদি আরবের Muqeem পোর্টালে অনলাইন সুবিধাও রয়েছে। ফলে আগের মতো প্রাথমিকভাবে হারানোর রিপোর্ট করতে একাধিক সরকারি দপ্তরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
তবে শুধু হারানোর রিপোর্ট করলেই নতুন আকামা হাতে পাওয়া যায় না। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর নিয়োগকর্তা বা স্পনসরের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন কার্ডের আবেদন, প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধ এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়।
আকামা হারিয়ে গেলে প্রথমে যা করতে হবে
সৌদি আরবে আকামা হারিয়ে গেলে প্রথম কাজ হলো বিষয়টি নিজের নিয়োগকর্তা বা কফিলকে জানানো। প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে সাধারণত নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি (GRO) Muqeem পোর্টালের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।
আকামা হারানোর বিষয়টি দীর্ঘ সময় গোপন রাখা বা রিপোর্ট করতে দেরি করা উচিত নয়। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নিয়ম অনুযায়ী, পাসপোর্ট বা আকামা হারানোর ঘটনা সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানাতে হয়। নির্ধারিত সময়ে রিপোর্ট না করলে জরিমানার বিধান রয়েছে।
আকামা হারানোর পর সেটি চুরি হয়েছে নাকি কোথাও পড়ে গেছে, সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি। চুরির ঘটনা হলে স্থানীয় পুলিশের কাছে অভিযোগ করে তার প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।
Muqeem পোর্টালে অনলাইনে হারানোর রিপোর্ট করার নিয়ম
সৌদি আরবের General Directorate of Passports বা Jawazat-এর ডিজিটাল সেবার আওতায় হারানো আকামার তথ্য অনলাইনে জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী কর্মীদের হারানো আকামার রিপোর্ট সরাসরি Muqeem পোর্টালের মাধ্যমে জমা দেওয়ার সুবিধা চালু হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কর্মীকে নিজে আবেদন করার পরিবর্তে নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। সাধারণত প্রক্রিয়াটি এভাবে সম্পন্ন হয়—
১. প্রথমে নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আকামা হারানোর বিষয়টি জানাতে হবে।
২. নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠানের Muqeem অ্যাকাউন্টে লগইন করবেন।
৩. সংশ্লিষ্ট কর্মীর তথ্য বা Applicant Dashboard থেকে হারানো আকামার নম্বর নির্বাচন বা প্রবেশ করাতে হবে।
৪. এরপর Jawazat Services অপশনে যেতে হবে।
৫. সেখান থেকে Report Loss of Expat Iqama সেবা নির্বাচন করতে হবে।
৬. প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে হারানোর রিপোর্ট অনলাইনে জমা দিতে হবে।
আবেদন জমা দেওয়ার পর Muqeem পোর্টালের মাধ্যমে প্রক্রিয়ার অগ্রগতি দেখা যায়। তবে রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর নতুন কার্ড ইস্যুর জন্য প্রয়োজনীয় পরবর্তী কার্যক্রমও সম্পন্ন করতে হবে।
নতুন আকামা কার্ড পাওয়ার জন্য কী করতে হবে?
হারানোর রিপোর্ট সম্পন্ন হওয়ার পর নিয়োগকর্তা বা স্পনসরকে নতুন আকামা ইস্যুর ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মীর তথ্য যাচাই করে প্রতিস্থাপন আকামার আবেদন করতে হয়।
সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে—
হারানো আকামার নম্বর বা আগের আকামার কপি।
বৈধ পাসপোর্টের তথ্য বা কপি।
কর্মীর ব্যক্তিগত ও নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য।
হারানোর রিপোর্টের তথ্য বা রেফারেন্স নম্বর।
সংশ্লিষ্ট সরকারি ফি বা জরিমানা পরিশোধের তথ্য।
সব ক্ষেত্রে একই কাগজপত্র লাগবে এমন নয়। কর্মীর অবস্থান, স্পনসরশিপের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথি ভিন্ন হতে পারে।
নিয়োগকর্তা Muqeem বা Absher Business-এর মাধ্যমে প্রযোজ্য সেবা ব্যবহার করে আবেদন সম্পন্ন করবেন। আবেদন অনুমোদিত হলে নতুন আকামা কার্ড সংগ্রহ বা সরবরাহের পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আকামা হারালে কত রিয়াল জরিমানা দিতে হয়?
আকামা হারানোর ঘটনায় জরিমানার বিষয়টি প্রবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত Iqama System Violations and Penalties তালিকায় পাসপোর্ট বা আকামা হারানোর তথ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে না জানানোর জন্য জরিমানার উল্লেখ রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী জরিমানার পরিমাণ হলো—
প্রথমবার: ১ হাজার সৌদি রিয়াল।
দ্বিতীয়বার: ২ হাজার সৌদি রিয়াল।
তৃতীয়বার: ৩ হাজার সৌদি রিয়াল।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, এই জরিমানার বিধানটি হারানোর ঘটনা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট না করার সঙ্গে সম্পর্কিত। নতুন আকামা কার্ড ইস্যুর মোট খরচ এবং রিপোর্ট দেরি করার জরিমানা এক বিষয় নয়।
এ ছাড়া আকামা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সরকারি ফি, Muqeem সেবার চার্জ বা অন্যান্য খরচ আলাদা হতে পারে। তাই সবার জন্য নতুন কার্ডের মোট খরচ একই হবে—এমনটি বলা যাবে না। আবেদন করার সময় Muqeem, Absher বা সংশ্লিষ্ট সরকারি পেমেন্ট ব্যবস্থায় প্রদর্শিত অর্থ যাচাই করে পরিশোধ করতে হবে।
আকামা চুরি হলে কী করবেন?
আকামা হারানো এবং চুরি হওয়া এক বিষয় নয়। কোথাও পড়ে গেলে সেটি হারানো হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে কেউ চুরি করলে দ্রুত স্থানীয় পুলিশকে জানিয়ে অভিযোগের প্রমাণ সংগ্রহ করা উচিত।
এরপর নিয়োগকর্তা বা স্পনসরের মাধ্যমে Jawazat-এ হারানো বা চুরির তথ্য জানাতে হবে। পুলিশের অভিযোগের কপি বা রেফারেন্স নম্বর থাকলে সেটি সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত তথ্য বা প্রমাণ চাইতে পারে।
পরিবারের সদস্যের আকামা হারালে কী করবেন?
সৌদি আরবে কর্মীর নিজের আকামা এবং পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের (Dependent) আকামা ব্যবস্থাপনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। কর্মীর ক্ষেত্রে সাধারণত নিয়োগকর্তা Muqeem-এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম করেন। অন্যদিকে স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের অন্য নির্ভরশীল সদস্যের আকামা হারালে পরিবারের প্রধান বা স্পনসরকে Absher-এর সংশ্লিষ্ট সেবা কিংবা Jawazat-এর নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যের আকামা নম্বর, পাসপোর্টের তথ্য এবং স্পনসরের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য প্রস্তুত রাখা ভালো। সেবার ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্রও প্রয়োজন হতে পারে।
আকামার ডিজিটাল কপি থাকলে কি চলবে?
আকামার ফিজিক্যাল কার্ড হারিয়ে গেলেও আগে থেকে সংরক্ষিত ছবি বা ডিজিটাল তথ্য কাজে আসতে পারে। এতে আকামা নম্বর ও ব্যক্তিগত তথ্য দ্রুত পাওয়া যায়। Absher অ্যাপেও প্রবাসীদের ডিজিটাল পরিচয়সংক্রান্ত সুবিধা রয়েছে।
তবে ডিজিটাল কপি থাকলেই হারানো ফিজিক্যাল কার্ডের প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন কার্ড ইস্যুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট কাজে ডিজিটাল পরিচয় গ্রহণযোগ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের কাছে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
আকামা হারানো এড়াতে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
প্রবাসীদের জন্য আকামা শুধু পরিচয়পত্র নয়, সৌদি আরবে বৈধভাবে বসবাস ও বিভিন্ন সেবা গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ নথি। তাই কার্ডটি নিরাপদ স্থানে রাখা প্রয়োজন।
এ ছাড়া আকামার সামনে ও পেছনের পরিষ্কার ছবি বা স্ক্যান কপি নিজের ফোনে এবং নিরাপদ অনলাইন সংরক্ষণস্থলে রাখা যেতে পারে। এতে কার্ড হারিয়ে গেলে নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা সহজ হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আকামা হারানোর পর দেরি না করে নিয়োগকর্তা বা স্পনসরকে জানানো এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে Jawazat-এর কাছে রিপোর্ট নিশ্চিত করা। এতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও জরিমানার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবে আকামা হারিয়ে গেলে নতুন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া এখন আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। বিশেষ করে Muqeem পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে হারানোর রিপোর্ট করার সুবিধা প্রবাসী কর্মীদের সময় ও ভোগান্তি কমাতে পারে। তবে দ্রুত রিপোর্ট করা, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রস্তুত রাখা এবং স্পনসরের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন কার্ডের আবেদন সম্পন্ন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. সৌদি আরবে আকামা হারালে কত দিনের মধ্যে রিপোর্ট করতে হয়?
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নিয়ম অনুযায়ী, আকামা হারানোর বিষয়টি সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানাতে হয়। দেরি হলে জরিমানার বিধান রয়েছে।
২. আকামা হারালে কি নিজে অনলাইনে রিপোর্ট করা যায়?
প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি Muqeem পোর্টালের মাধ্যমে রিপোর্ট জমা দেন। পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের ক্ষেত্রে স্পনসরকে Absher বা Jawazat-এর সংশ্লিষ্ট সেবা ব্যবহার করতে হয়।
৩. প্রথমবার আকামা হারালে জরিমানা কত?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত জরিমানার তালিকা অনুযায়ী, হারানোর ঘটনা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট না করলে প্রথমবার ১ হাজার সৌদি রিয়াল জরিমানা হতে পারে।
৪. আকামা হারালে নতুন কার্ড পেতে কত টাকা লাগে?
নতুন কার্ডের মোট খরচ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সরকারি ফি, রিপোর্ট ও প্রতিস্থাপন সেবার চার্জ এবং প্রযোজ্য জরিমানার ওপর। তাই আবেদন করার সময় সরকারি পোর্টালে প্রদর্শিত অর্থ যাচাই করতে হবে।
৫. আকামার ছবি বা ডিজিটাল কপি থাকলে কি নতুন কার্ড লাগবে না?
না। ডিজিটাল কপি আকামার তথ্য শনাক্ত করতে সহায়তা করলেও হারানো ফিজিক্যাল কার্ডের প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন কার্ডের আবেদন করতে হবে।
তানভির ইসলাম/