ঢাকা, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

মেয়ের জন্মদিনের চার দিন পরই দাফন, বাবার বুকফাটা কান্না

সারাদেশ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০৪ ১৪:৫৪:১২
মেয়ের জন্মদিনের চার দিন পরই দাফন, বাবার বুকফাটা কান্না

২২ বছরের মেয়েকে ঘিরে কত স্বপ্নই না ছিল মা-বাবার। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করবে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে—এমন প্রত্যাশা ছিল মাইশা মুশফিরাতের পরিবারের। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই থেমে গেল তাঁর জীবন। গত শুক্রবার মেয়ের জন্মদিনে আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে আনন্দ করেছিলেন বাবা দিদারুল আলম। মঙ্গলবার সেই মেয়ের মরদেহ দাফন করতে হয়েছে মিরসরাইয়ের পারিবারিক কবরস্থানে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি মিনিবাস উল্টে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে দুর্ঘটনাটি ঘটে। একটি কনটেইনারবাহী লরির ধাক্কায় মিনিবাসটি উল্টে গেলে সেটির নিচে চাপা পড়েন মাইশা। একই ঘটনায় আরও তিনজন আহত হন। তাঁদের মধ্যে অপর এক শিক্ষার্থী গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোস্তফা মুনির চৌধুরী।

যে মেয়েকে ঘিরে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেয়েকে হারানোর শোক সামলাতে পারছিলেন না মা সালমা আক্তার। মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি তাঁকে বারবার কাঁদাচ্ছিল। দুর্ঘটনার দিন সকালে মাইশার সঙ্গে প্রায় দুই মিনিট কথা হয়েছিল তাঁর। তখন মেয়ের মাথাব্যথা ছিল।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ফোন করে দুর্ঘটনার খবর দেন। সালমা আক্তারকে হাসপাতালে আসতে বলা হয়। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মনে ছিল অনেক আশা। পড়াশোনায় ভালো মাইশা চাকরি করবে, বড় হবে—এমন স্বপ্নের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের স্বপ্ন ছিল চাকরি করবে। বড় হবে পড়ালেখা করে। পড়ালেখায় ভালো ছিল।’

হাসপাতালে মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় বিলাপ করছিলেন তিনি, ‘আঁর ঝিরে আনি দে। আঁর ঝিরে আঁই শোকেশে রাখমুতো।’

জন্মদিনের স্মৃতি মনে করে কাঁদলেন বাবা

দিদারুল আলমের সংসারে তিন ছেলে ও এক মেয়ে। চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে তিনি বারবার বলছিলেন, ‘আমার তিন ছেলে। এক মেয়ে। এখন মেয়েটা নাই।’

মেয়ের জন্মদিনের আনন্দের কথা মনে করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার একটা মেয়ে। ২২ বছর বয়স হয়েছিল। আমি মাইনে নিতে পারতেছি না। গত শুক্রবার তাঁর জন্মদিন পালন করছি। আত্মীয়স্বজন সবাইরে দাওয়াত দিছি। আমার ঝি কত খুশি। এখন শেষ, সব শেষ।’

সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর মেয়ের দুর্ঘটনার খবর পান দিদারুল। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, একটি কনটেইনারবাহী লরি মিনিবাসটিকে ধাক্কা দিলে সেটি তাঁর মেয়ের ওপর পড়ে। খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দেখেন, মাইশা আর বেঁচে নেই।

লরির ধাক্কায় উল্টে যায় মিনিবাস

দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুটি লরি একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলছিল। এ সময় একটি লরি রাস্তার পাশে থেমে থাকা মিনিবাসে আঘাত করে। ধাক্কার পর বাসটি একদিকে কাত হয়ে উল্টে যায়।

বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার সার্জেন্ট শফিউল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক এলাকায় মিনিবাস থেকে নেমেছিলেন মাইশা। এর কিছুক্ষণ পরই বাসটি উল্টে তাঁর ওপর পড়ে। এ ঘটনায় আরও তিনজন আহত হন। স্থানীয় লোকজন লরি দুটি আটক করেন। পরে পুলিশ লরি দুটি ও মিনিবাসটি থানায় নিয়ে যায়।

বেপরোয়া লরি চলাচল নিয়ে বাবার ক্ষোভ

মেয়ের মৃত্যুর পর ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে কনটেইনারবাহী লরির চলাচল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দিদারুল আলম। তাঁর অভিযোগ, দিনের বেলাতেও এসব লরি বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে। এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নজরদারি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

দিদারুল বলেন, ‘দিনের বেলা বেপরোয়াভাবে কনটেইনারবাহী লরিগুলো ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলতেছে। এগুলা কি আমাদের দেশের এমপি-মন্ত্রীরা দেখতেছে না। শত শত মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হইছে। মানুষ মইরতেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো মূল্যায়নই নাই।’

নিজের মতো আর কোনো পরিবারকে যেন এমন শোকের মুখোমুখি হতে না হয়, সেই আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা দোয়া করবেন, আর কারও বুক যেন খালি না হয় আমার মতো।’

পদচারী-সেতুর দাবিতে সড়ক ও রেলপথ বন্ধ

মাইশার মৃত্যুর খবর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়লে সহপাঠীরা প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং রেলপথ অবরোধ করেন। দুর্ঘটনার প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি সেখানে পদচারী-সেতু নির্মাণের দাবি জানান তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ নেওয়াজ চৌধুরী জানান, ওই এলাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই পদচারী-সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা।

অবরোধের কারণে মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার যানজট তৈরি হয়। রেল চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। সীতাকুণ্ড ও ফৌজদারহাট স্টেশনে আটকে থাকে মহানগর প্রভাতী ও মহানগর এক্সপ্রেস। চট্টগ্রাম থেকে মহানগর গোধূলী ট্রেনের যাত্রাও নির্ধারিত সময়ে শুরু করা যায়নি। এতে সড়ক ও রেলপথের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন।

পাঁচ ঘণ্টা পর স্বাভাবিক হয় যোগাযোগ

শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কথা বলতে ঘটনাস্থলে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। তাঁরা দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে পূরণের আশ্বাস দেন।

এই আশ্বাসের পর বিকেল সোয়া চারটার দিকে অবরোধ প্রত্যাহার করেন শিক্ষার্থীরা। ফলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথে যান চলাচল আবার শুরু হয়।

তবে অবরোধ শেষ হলেও মাইশাকে হারানোর শোক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি তাঁর পরিবার। যে মেয়েকে নিয়ে কয়েক দিন আগেও জন্মদিনের আয়োজন হয়েছিল, সেই মেয়ের স্মৃতিই এখন মা-বাবার কাছে সবচেয়ে বড় বেদনার কারণ।

পাঠকদের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

১. মাইশা মুশফিরাতের বয়স কত ছিল?

দুর্ঘটনায় নিহত মাইশার বয়স হয়েছিল ২২ বছর।

২. মাইশা কোথায় পড়াশোনা করতেন?

তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

৩. কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটে?

একটি কনটেইনারবাহী লরি থেমে থাকা মিনিবাসকে ধাক্কা দিলে বাসটি উল্টে মাইশার ওপর পড়ে। এতে তাঁর মৃত্যু হয়।

৪. দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা কী দাবি জানান?

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এলাকায় পদচারী-সেতু নির্মাণের দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।

৫. শিক্ষার্থীদের অবরোধ কখন শেষ হয়?

জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের আশ্বাসের পর বিকেল সোয়া চারটার দিকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর সড়ক ও রেলপথে চলাচল স্বাভাবিক হয়।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: