মুনাফা কমলেও নগদ প্রবাহে ঘুরে দাঁড়াল ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার
মুনাফা কমেছে, শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্যেও অবনতি হয়েছে; তবে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থের প্রবাহে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) আগের বছরের তুলনায় ৪২ শতাংশের বেশি কমলেও শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ১৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা ১৭ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ইপিএস কমেছে প্রায় ৩৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা ও সম্পদমূল্যের অবনতির পাশাপাশি নগদ প্রবাহের এই পরিবর্তন উঠে এসেছে। আগের বছরের এককালীন আয়, আর্থিক আয় কমে যাওয়া এবং পণ্য বিক্রির পরিমাণ হ্রাসকে মুনাফা কমার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে কর্তৃপক্ষ। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে ৪ টাকা ২৮ পয়সা
২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৮ টাকা ৫২ পয়সা। গত বছরের একই প্রান্তিকে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ইপিএস ছিল ১২ টাকা ৮০ পয়সা।
দুই বছরের একই সময়ের আর্থিক ফলাফল তুলনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে ৪ টাকা ২৮ পয়সা। শতকরা হিসাবে এই হ্রাস ৩৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।
জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে ইপিএসের পতন ৪২.১৬ শতাংশ
শুধু তৃতীয় প্রান্তিক নয়, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসের ফলাফলও কোম্পানিটির মুনাফার নিম্নমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১৮ টাকা ৮৫ পয়সা। ২০২৫ সালের একই নয় মাসে এই আয় ছিল ৩২ টাকা ৫৯ পয়সা।
এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইপিএস কমেছে ১৩ টাকা ৭৪ পয়সা। শতাংশের হিসাবে পতনের হার ৪২ দশমিক ১৬ শতাংশ।
আগের বছরের এককালীন লাভ এবার নেই
মুনাফার এই পতনের পেছনে আগের বছরের তুলনামূলক বেশি আয়ের একটি বিশেষ প্রভাব রয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে ট্রেডমার্ক ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিপরীতে প্রদেয় রয়্যালটিসংক্রান্ত দায় পুনর্মূল্যায়নের পর এককালীন লাভ স্বীকৃত হয়েছিল। ওই আয় আগের বছরের মুনাফাকে তুলনামূলকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
চলতি বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে একই ধরনের এককালীন লাভের প্রভাব না থাকায় আগের বছরের সঙ্গে তুলনায় শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে। এর পাশাপাশি আর্থিক আয় হ্রাস এবং পণ্য বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়াও কোম্পানিটির মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ঋণাত্মক নগদ প্রবাহ থেকে ইতিবাচক অবস্থানে
মুনাফার হিসাব নিম্নমুখী হলেও পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থ আসার ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ (এনওসিএফপিএস) দাঁড়িয়েছে ৩৮ টাকা ১৭ পয়সা।
এর বিপরীতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে এনওসিএফপিএস ছিল ঋণাত্মক ১৬ টাকা ৭০ পয়সা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এই সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে ৫৪ টাকা ৮৭ পয়সা।
কোম্পানি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পরিচালন কার্যক্রমে নগদ অর্থের বহির্গমন কমে যাওয়াই এই উন্নতির প্রধান কারণ। আগের বছরের একই সময়ে ইউস্যান্স পে-অ্যাবল অ্যাট সাইট (ইউপিএএস) ঋণপত্রের অধিকাংশ দায় পরিশোধ করা হয়েছিল। এ কারণে ২০২৫ সালের তুলনীয় সময়ে পরিচালন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যয় হয়।
চলতি বছরের প্রতিবেদনের সময়ে এ ধরনের নগদ অর্থের বহির্গমন তুলনামূলক কম ছিল। ফলে নিট মুনাফা কমে গেলেও পরিচালন নগদ প্রবাহ আগের বছরের ঋণাত্মক অবস্থান থেকে ইতিবাচক পর্যায়ে এসেছে।
নয় মাসে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য কমেছে ২৩ টাকা ১৫ পয়সা
কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থানের আরেকটি সূচক শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) হিসাবেও অবনতি হয়েছে।
২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৯৩ টাকা ১৫ পয়সা। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে এই মূল্য ছিল ১১৬ টাকা ৩০ পয়সা।
নয় মাসের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি এনএভি কমেছে ২৩ টাকা ১৫ পয়সা। শতাংশের হিসাবে এই হ্রাস ১৯ দশমিক ৯১ শতাংশ।
লভ্যাংশ বিতরণ ও মুনাফা সঞ্চয় কমায় এনএভিতে প্রভাব
শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ দুটি বিষয় তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ অর্থবছরের ঘোষিত ডিভিডেন্ড শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ এবং চলতি বছরে তুলনামূলক কম মুনাফা অর্জন।
ডিভিডেন্ড বিতরণের ফলে কোম্পানিটির সংরক্ষিত সম্পদে প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি মুনাফা কম হওয়ায় সংরক্ষিত আয়ের পরিমাণও আগের তুলনায় কম বেড়েছে। এই দুই প্রভাব মিলিয়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যে পতন হয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা, নগদ প্রবাহ ও সম্পদমূল্যের ভিন্ন চিত্র
ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসের আর্থিক ফলাফলে তিনটি ভিন্ন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে, নিট সম্পদমূল্যও আগের অবস্থান থেকে নেমেছে। তবে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহে এসেছে উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
আগের বছরের এককালীন লাভের অনুপস্থিতি, আর্থিক আয় ও বিক্রয় হ্রাস মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, পরিচালন কার্যক্রমে নগদ অর্থের বহির্গমন কমে যাওয়ায় নগদ প্রবাহ ইতিবাচক হয়েছে। লভ্যাংশ বিতরণ এবং মুনাফা সঞ্চয়ের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সম্পদমূল্যেও পতন ঘটেছে।
প্রাসঙ্গিক FAQ
১. ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের ইপিএস কত ছিল?
২০২৬ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৮ টাকা ৫২ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ১২ টাকা ৮০ পয়সা।
২. চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির মুনাফা কতটা কমেছে?
২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে ইপিএস হয়েছে ১৮ টাকা ৮৫ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ের ৩২ টাকা ৫৯ পয়সার তুলনায় ৪২ দশমিক ১৬ শতাংশ কম।
৩. ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের পরিচালন নগদ প্রবাহ কত হয়েছে?
২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ হয়েছে ৩৮ টাকা ১৭ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এটি ছিল ঋণাত্মক ১৬ টাকা ৭০ পয়সা।
৪. কোম্পানিটির মুনাফা কমার প্রধান কারণ কী?
আগের বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে থাকা এককালীন লাভের প্রভাব, চলতি বছরে আর্থিক আয় কমে যাওয়া এবং পণ্য বিক্রির পরিমাণ হ্রাস মুনাফা কমার প্রধান কারণ।
৫. ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কত ছিল?
ওই সময়ে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ছিল ৯৩ টাকা ১৫ পয়সা। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে তা ছিল ১১৬ টাকা ৩০ পয়সা।
তানভির ইসলাম/