নতুন ভোটার হতে কী কী কাগজ লাগে? জেনে নিন তালিকা
জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি পেতে নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সময় শুধু জন্মনিবন্ধন সনদ থাকলেই হয় না; আবেদনকারীর পরিচয়, পারিবারিক তথ্য ও বর্তমান ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য আরও কয়েকটি নথি প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে রয়েছে অনলাইন জন্মনিবন্ধন, বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, নাগরিকত্ব সনদ এবং ঠিকানার প্রমাণ। বিবাহিত আবেদনকারীর ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর পরিচয়পত্র ও বিয়ের কাবিননামাও প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত পদ্ধতিতে অনলাইনে নিবন্ধন ফরম-২ পূরণ করে আবেদন করতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করতে হয়। আবেদনকারীর তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি ছবি, আঙুলের ছাপ ও অন্যান্য বায়োমেট্রিক তথ্য নেওয়া হয়। তাই আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখলে প্রক্রিয়াটি সহজ হয়।
নতুন ভোটার হতে কী কী কাগজপত্র লাগবে?
নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা নির্বাচন অফিসের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন ভোটার নিবন্ধনের জন্য সাধারণত নিচের কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত রাখতে হয়।
১. অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ: আবেদনকারীর অনলাইন যাচাইযোগ্য জন্মনিবন্ধন সনদের কপি।
২. শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ: পঞ্চম, অষ্টম, এসএসসি, এইচএসসি বা সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের ফটোকপি। শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ না থাকলে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা নিতে হবে।
৩. বাবা ও মায়ের এনআইডি: পিতা ও মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি। তাঁদের কেউ মারা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইন মৃত্যু নিবন্ধন সনদ জমা দিতে হতে পারে।
৪. নাগরিকত্ব সনদ: ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অথবা পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধির দেওয়া নাগরিকত্ব সনদ।
৫. ঠিকানার প্রমাণ: বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিল, পানি বিল, গ্যাস বিল, বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত কাগজ, হোল্ডিং ট্যাক্স বা পৌরকর পরিশোধের রসিদ চাওয়া হতে পারে।
৬. রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার রিপোর্ট: রক্তের গ্রুপ জানা থাকলে পরীক্ষার রিপোর্টের কপি সঙ্গে রাখা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী এটি জমা দিতে হবে।
৭. পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স: থাকলে এসব পরিচয়-সহায়ক নথির কপি সঙ্গে রাখা ভালো। বিশেষ করে প্রবাসফেরত আবেদনকারীর ক্ষেত্রে পাসপোর্ট-সংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন হতে পারে।
৮. বিবাহিতদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজ: বিবাহিত আবেদনকারীর স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডির কপি এবং বিয়ের কাবিননামা বা প্রযোজ্য বিবাহ-সংক্রান্ত নথি।
৯. নিবন্ধন ফরম-২: অনলাইনে পূরণ করা ফরম-২-এর প্রিন্ট কপি।
১০. শনাক্তকারী ও যাচাইকারীর তথ্য: ফরমে নির্ধারিত স্থানে শনাক্তকারী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির নাম, এনআইডি নম্বর, স্বাক্ষর ও প্রয়োজনীয় সিল থাকতে হবে।
সব আবেদনকারীর জন্য প্রতিটি কাগজ বাধ্যতামূলক নয়। আবেদনকারীর বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, ঠিকানা ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত নথি চাওয়া হতে পারে। তাই চূড়ান্ত তালিকা সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিস থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
নতুন ভোটার নিবন্ধনের আবেদন করবেন যেভাবে
নতুন ভোটার হওয়ার আবেদন অনলাইনে অথবা সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে করা যায়। অনলাইনে আবেদন করতে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা পোর্টালে যেতে হবে।
অনলাইনে আবেদন করার ধাপগুলো হলো—
প্রথম ধাপ: ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা পোর্টাল services.nidw.gov.bd-এ প্রবেশ করুন। সেখানে নতুন ভোটার নিবন্ধনের অপশন থেকে আবেদন শুরু করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: নিবন্ধন ফরম-২ পূরণ করুন
আবেদনকারীর নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান, বাবা-মায়ের পরিচয়, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ এবং বাবা-মায়ের এনআইডির সঙ্গে তথ্যের মিল রাখা জরুরি।
তৃতীয় ধাপ: আবেদনপত্র প্রিন্ট করুন
অনলাইনে তথ্য পূরণ করে আবেদন সম্পন্ন করার পর নির্দেশনা অনুযায়ী নিবন্ধন ফরম-২ প্রিন্ট করতে হবে। ফরমের নির্ধারিত স্থানে শনাক্তকারীর তথ্য ও স্বাক্ষর এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির যাচাইসংক্রান্ত তথ্য নিতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিন
প্রিন্ট করা ফরমের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে জমা দিতে হবে। কোনো নথির মূল কপি দেখাতে হতে পারে, তাই সেগুলোও সঙ্গে রাখা ভালো।
পঞ্চম ধাপ: বায়োমেট্রিক তথ্য দিন
নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ছবি, আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ বা প্রয়োজনীয় অন্যান্য বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে হবে। এ সময় আবেদনকারীর পরিচয় ও তথ্য যাচাই করা হয়।
ষষ্ঠ ধাপ: নিবন্ধনের অগ্রগতি জানুন
আবেদন ও বায়োমেট্রিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী অবস্থা জানা যাবে। নিবন্ধন সম্পন্ন হলে এনআইডি নম্বর ও কার্ড সংগ্রহের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নতুন ভোটার হতে কি ১৮ বছর বয়স হতে হবে?
ভোটার হিসেবে ভোট দেওয়ার যোগ্যতা এবং জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনের বিষয়টি আলাদা করে বুঝতে হবে। সাধারণভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে ভোট দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের নাগরিককে ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করতে হয়।
তবে ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় নিবন্ধনসংক্রান্ত পরিপত্র প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এই বয়সের নাগরিকদেরও পরিচয় নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পরিচয় নিবন্ধন করলেই ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে ভোট দেওয়ার অধিকার তৈরি হয় না।
তাই আবেদন করার আগে নিজের বয়স অনুযায়ী কোন প্রক্রিয়া প্রযোজ্য, তা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা থেকে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
বাবা-মায়ের এনআইডি না থাকলে কী করবেন?
নতুন ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আবেদনকারীর পারিবারিক পরিচয় ও জন্মসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ে এসব নথি ব্যবহার করা হয়।
বাবা-মায়ের কারও এনআইডি না থাকলে বা তাঁদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করা উচিত। বাবা-মায়ের কেউ মারা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী মৃত্যু নিবন্ধন সনদসহ বিকল্প প্রমাণপত্র দিতে হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে নিজের মতো করে অন্য কারও পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করা যাবে না। আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে জমা দেওয়া নথির মিল থাকা জরুরি।
জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত সনদে নামের বানান আলাদা হলে কী করবেন?
নতুন ভোটার নিবন্ধনের সময় জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ ও বাবা-মায়ের এনআইডিতে থাকা নামের তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। এসব নথিতে নামের বানান, জন্মতারিখ বা বাবা-মায়ের নাম আলাদা থাকলে যাচাইয়ের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তাই আবেদন করার আগে নথিগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। কোনো তথ্য ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ভুল তথ্য দিয়ে আবেদন করলে নিবন্ধন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে বা অতিরিক্ত প্রমাণপত্র চাওয়া হতে পারে।
নতুন ভোটার হতে কত টাকা লাগে?
নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত আবেদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তবে অনলাইন আবেদন বা নির্বাচন অফিসে কাগজপত্র জমা দেওয়ার নামে কোনো অননুমোদিত ব্যক্তিকে টাকা দেওয়া উচিত নয়।
কোনো সেবার জন্য ফি প্রযোজ্য কি না, তা নির্বাচন কমিশনের সরকারি ফি তালিকা অথবা সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিস থেকে নিশ্চিত হওয়া উচিত। আবেদন করার জন্য দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
নতুন ভোটার নিবন্ধনে যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
আবেদন করার সময় কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকলে অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমতে পারে।
জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত সনদে থাকা নাম ও জন্মতারিখ মিলিয়ে নিন।
বাবা-মায়ের এনআইডি নম্বর সঠিকভাবে লিখুন।
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার তথ্য যথাযথভাবে দিন।
ফরমের নির্ধারিত স্থানে শনাক্তকারী ও যাচাইকারীর স্বাক্ষর নিশ্চিত করুন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পরিষ্কার ফটোকপি জমা দিন।
আগে থেকেই ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত না হয়ে দ্বিতীয়বার আবেদন করবেন না।
বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার জন্য নির্ধারিত দিনে নিজে উপস্থিত থাকুন।
নতুন ভোটার হতে আবেদনকারীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজ হলো অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ, বাবা-মায়ের এনআইডি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, নাগরিকত্ব সনদ এবং ঠিকানার প্রমাণ। এর সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী বিবাহসংক্রান্ত নথি, পাসপোর্ট বা অন্যান্য কাগজ জমা দিতে হতে পারে।
আবেদনের আগে সব নথির তথ্য মিলিয়ে অনলাইনে ফরম-২ পূরণ করুন এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। এতে নতুন ভোটার নিবন্ধনের সময় ভুল বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্রের কারণে তৈরি হওয়া জটিলতা এড়ানো সহজ হবে।
প্রাসঙ্গিক FAQ
১. নতুন ভোটার হতে সবচেয়ে জরুরি কাগজ কোনগুলো?
অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ, বাবা-মায়ের এনআইডির কপি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, নাগরিকত্ব সনদ এবং ঠিকানার প্রমাণ সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ নথি।
২. নতুন ভোটার হতে কি অনলাইনে আবেদন করতে হয়?
অনলাইনে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা পোর্টালে ফরম-২ পূরণ করা যায়। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিস থেকেও ফরম সংগ্রহ করে আবেদন করা যায়।
৩. ১৬ বছর বয়সে কি নতুন ভোটার হওয়া যায়?
২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কমিশনের পরিপত্র অনুযায়ী ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। তবে ভোট দেওয়ার জন্য ১৮ বছর পূর্ণ হতে হবে।
৪. বাবা-মায়ের এনআইডি না থাকলে কী হবে?
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করে বিকল্প পরিচয় ও সম্পর্কের প্রমাণপত্র সম্পর্কে জানতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত নথি চাওয়া হতে পারে।
৫. নতুন ভোটার হতে কি নির্বাচন অফিসে সশরীরে যেতে হয়?
হ্যাঁ। আবেদন যাচাই এবং ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার জন্য আবেদনকারীকে নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে সশরীরে উপস্থিত হতে হয়।
আল-মামুন/