কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তের পরও শেয়ারবাজারে বড় পতন
বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বাড়ানোর পরও দেশের শেয়ারবাজারে দরপতনের গতি কমেনি। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে মঙ্গলবার (০৩ নভেম্বর) লেনদেনের চিত্রে বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ডিএসইতে সব মূল্যসূচক কমার পাশাপাশি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর হারিয়েছে। অন্যদিকে সিএসইতেও সূচকের বড় পতনের সঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। এমন পরিস্থিতিতে বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশ বর্তমান কমিশনের পরিবর্তে অভিজ্ঞ ও যোগ্য নেতৃত্বে নতুন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
সূচকের পতনেই স্পষ্ট বাজারের দুর্বলতা
মঙ্গলবারের লেনদেনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪৯ দশমিক ২৬ পয়েন্ট হারিয়েছে। দিন শেষে সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৮৪ দশমিক ৩১ পয়েন্টে। একই দিনে শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৭ দশমিক ৫১ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৩০ দশমিক ২৯ পয়েন্টে নেমেছে।
বাছাই করা ৩০টি কোম্পানির শেয়ার নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচকও নিম্নমুখী ছিল। সূচকটি ২০ দশমিক ২৮ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ২১ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
দিনের লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৮৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দরবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে মাত্র ৬৮টি। বিপরীতে ২৬৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। বাকি ৫১টি প্রতিষ্ঠানের দর আগের কার্যদিবসের অবস্থানেই ছিল।
অর্থাৎ, লেনদেনের পরিধি থাকলেও বাজারের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর নিম্নমুখী ছিল। সব মূল্যসূচকের পতনও সেই দুর্বল প্রবণতাকে প্রতিফলিত করেছে।
দরপতনের মধ্যেও ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে
মঙ্গলবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট ৫৬৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে এই অঙ্ক ছিল ৪১৮ কোটি ২২ লাখ টাকা।
দুই দিনের লেনদেন তুলনা করলে দেখা যায়, এক কার্যদিবসের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
তবে লেনদেনের এই বৃদ্ধি বাজারের ইতিবাচক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়নি। কারণ, একই দিনে সব মূল্যসূচক কমেছে এবং লেনদেন হওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতন হয়েছে। ফলে বাজারে টাকার অঙ্কে লেনদেন বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি ফেরেনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হয়েছিল প্রত্যাশা
শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কার্যক্রম চালু রাখার সুযোগ সম্প্রসারণে গত সোমবার (০২ নভেম্বর) বিশেষ তহবিল সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
আগের নিয়ম অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সুবিধা বহাল থাকার কথা ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশেষ তহবিল ব্যবহার করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের আগে বাজারসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা ছিল, ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ দীর্ঘায়িত হলে বাজারে অর্থপ্রবাহ বজায় থাকবে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা দরপতনের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হয়েছিল।
কিন্তু সিদ্ধান্তের পরদিনই উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে পতন আরও তীব্র হওয়ায় সেই আশাবাদ কার্যত পূরণ হয়নি। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের মূলধনসংকট, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ দেশের শেয়ারবাজারকে দুর্বল অবস্থায় রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করলেও বাস্তব লেনদেনে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
২০২০ সালে চালু হয়েছিল বিশেষ তহবিল সুবিধা
করোনাভাইরাস মহামারির সময় শেয়ারবাজারে তারল্যসংকট মোকাবিলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশেষ তহবিল গঠনের নীতিমালা প্রবর্তন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নীতিমালা অনুসারে, প্রতিটি তফসিলি ব্যাংক নিজস্ব অর্থায়ন অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো সুবিধা গ্রহণ করে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারে।
এই তহবিলের অর্থ দিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো একটি বিশেষ সুবিধা পায়। প্রচলিত শেয়ারবাজার বিনিয়োগসীমা বা এক্সপোজার লিমিটের বাইরে রাখা হয় বিশেষ তহবিলের আওতায় করা বিনিয়োগ। ফলে ব্যাংকগুলো সাধারণ বিনিয়োগসীমার অতিরিক্ত অর্থ হিসেবেও এই তহবিল ব্যবহার করতে পারে।
তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু তহবিলের মেয়াদ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য এর পরিমাণও বাড়ানো প্রয়োজন।
ব্যাংকের বিশেষ তহবিল ৩০০ কোটি টাকা করার দাবি
বিশেষ তহবিলের সুবিধা আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) একটি প্রস্তাব দিয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, প্রতিটি ব্যাংকের জন্য নির্ধারিত ২০০ কোটি টাকার তহবিলসীমা বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হোক। একই সঙ্গে বিশেষ তহবিলের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০৩১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব দিয়েছে ডিবিএ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তহবিলের পরিমাণ বৃদ্ধি ও মেয়াদ দীর্ঘায়িত করা হলে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
বিএসইসির কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তোষ, নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের পরও বাজারে পতন অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশ।
তাদের বক্তব্য, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে ওঠার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে বাজারে তার বিপরীত পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম চললেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।
বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ধারাবাহিক দরপতন নিয়ন্ত্রণে বর্তমান কমিশনের কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কেন বাজারের পতন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না এবং এ বিষয়ে কমিশনের সুস্পষ্ট অবস্থান কী—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বিএসইসির কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রীকে পরিবর্তন করেছেন উল্লেখ করে বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশ বলছেন, শেয়ারবাজারের স্বার্থেও বর্তমান কমিশন পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
নতুন কমিশনে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ও বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিত্ব চান সংশ্লিষ্টরা
শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশ।
তাদের প্রস্তাব, বিনিয়োগকারীদের সমস্যা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তুলে ধরতে বিনিয়োগকারী সংগঠনের যোগ্য প্রতিনিধিদের কমিশনের পরামর্শক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
এতে বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা আরও কার্যকর ধারণা পাবেন বলে মনে করছেন তারা।
সিএসইতে টানা দুই কার্যদিবস সূচকের বড় পতন
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পাশাপাশি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও মঙ্গলবার নেতিবাচক লেনদেন হয়েছে। বাজারটির সার্বিক মূল্যসূচক কমার পাশাপাশি মোট লেনদেনের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে।
মঙ্গলবার সিএসইতে মোট ১২ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে। আগের কার্যদিবসে এই পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। ফলে এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
এদিন সিএসইতে ৪৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে। বিপরীতে ১১২টি প্রতিষ্ঠানের দর কমেছে। আর ৮৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম অপরিবর্তিত ছিল।
সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৭৪ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ২১৪ দশমিক ৭০ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এর আগের কার্যদিবসেও সূচকটি ১০৪ দশমিক ৬০ পয়েন্ট হারিয়েছিল।
এতে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে টানা দুই কার্যদিবস বড় ধরনের সূচক পতনের ঘটনা ঘটেছে।
স্থিতিশীলতার জন্য কার্যকর নজরদারির তাগিদ
বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বৃদ্ধির মতো নীতিগত সিদ্ধান্তের পরও দেশের দুই শেয়ারবাজারে দরপতন অব্যাহত থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সুবিধা বাড়ানো নয়, বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত উদ্যোগও জরুরি।
তাদের মতে, বাজারে আস্থা ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা আরও গভীর হতে পারে।
FAQ
১. ০৩ নভেম্বর বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে কী ধরনের লেনদেন হয়েছে?
মঙ্গলবার ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে দরপতন হয়েছে। ডিএসইর সব মূল্যসূচক কমেছে এবং সিএসইর সার্বিক সূচকও বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে।
২. বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের মেয়াদ কত দিন বাড়ানো হয়েছে?
বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ তহবিল সুবিধার মেয়াদ এক বছর বাড়িয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে।
৩. ডিএসইতে মঙ্গলবার কত টাকার লেনদেন হয়েছে?
মঙ্গলবার ডিএসইতে প্রায় ৫৬৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৪১৮ কোটি ২২ লাখ টাকা।
৪. ডিবিএ বিশেষ তহবিলের বিষয়ে কী প্রস্তাব দিয়েছে?
ডিবিএ প্রতিটি ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের সীমা ২০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে সুবিধাটির মেয়াদ ২০৩১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।
৫. বাজারসংশ্লিষ্টরা কেন বিএসইসি পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন?
বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, ধারাবাহিক দরপতন নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ কারণে অভিজ্ঞ ও যোগ্য নেতৃত্বে নতুন কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে।
তানভির ইসলাম/