ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২

Alamin Islam

Senior Reporter

তাপমাত্রা নিয়ে বড় দুঃসংবাদ: ২০৫০ সালে চরম বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ

সারাদেশ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ জানুয়ারি ২৭ ১৫:০৭:৪০
তাপমাত্রা নিয়ে বড় দুঃসংবাদ: ২০৫০ সালে চরম বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ

ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার এক প্রামাণ্য চিত্র তুলে ধরেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তাদের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে চরম তাপমাত্রার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের ছয়টি দেশের মধ্যে ঠাঁই হয়েছে বাংলাদেশের। অসহনীয় এই তাপপ্রবাহ কেবল জনজীবন নয়, দেশের সার্বিক কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেবে।

গত সোমবার (২৬ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার সাসটেইনেবিলিটি’-তে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিজ্ঞান বিভাগের নেতৃত্বে এই আন্তর্জাতিক গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

বিপন্ন ৩শ কোটির বেশি মানুষ

গবেষকদের দাবি, জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী দুই দশকে তাপপ্রবাহের কবলে পড়া মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে। প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় বিশ্বের গড় তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তবে শতাব্দীর মধ্যভাগ নাগাদ পৃথিবীর ৪১ শতাংশ মানুষ অসহনীয় গরমে দিনাতিপাত করবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই তালিকায় থাকবে প্রায় ৩৭৯ কোটি মানুষ, যা ২০১০ সালে ছিল মাত্র ১৫৪ কোটি।

‘সিডিডি’ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান

তাপপ্রবাহের তীব্রতা মাপার জন্য বিজ্ঞানীরা ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ (CDD) নামক একটি উচ্চ প্রযুক্তির গাণিতিক মডেল ও সূচক ব্যবহার করেছেন। কোনো স্থানে বছরে ৩ হাজারের বেশি সিডিডি থাকলে সেটিকে চরম তাপপ্রবণ এলাকা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই সূচকের ভিত্তিতে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত দেশ হিসেবে ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া ও ফিলিপাইনের পাশে রাখা হয়েছে বাংলাদেশকে।

ঘূর্ণিঝড়-বন্যার পর এবার ‘নীরব ঘাতক’ তাপমাত্রা

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ মোকাবিলা করে আসছে। তবে অক্সফোর্ডের এই গবেষণা একটি নতুন সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে, যাকে গবেষকরা বলছেন ‘নীরব ঘাতক’। এই চরম উত্তাপ দেশের কৃষিখাত, অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর এমন এক নজিরবিহীন প্রভাব ফেলবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

বিশেষজ্ঞ মতামত: এখনই পদক্ষেপের সময়

গবেষণার প্রধান লেখক ড. জেসাস লিজানা মনে করেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার আগেই ঘরবাড়ি শীতল রাখার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, "আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সাধারণ মানুষের এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বেড়ে যাবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে আমাদের ভবন নির্মাণ কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হবে।"

একই সুর শোনা গেছে অক্সফোর্ড মার্টিন ফিউচার অব কুলিং প্রোগ্রামের প্রধান ড. রাধিকা খোসলা-র কণ্ঠে। তিনি এই গবেষণার ফলকে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, "তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত থেকে শুরু করে অভিবাসন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে আসবে। রাজনীতিবিদদের এখনই টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটা জরুরি।"

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বাড়লে ঘর শীতল রাখার জন্য বিদ্যুতের চাহিদা এবং সেই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ—উভয়ই আশঙ্কাজনক হারে বাড়বে। বিপরীতে কানাডা বা সুইজারল্যান্ডের মতো শীতপ্রধান দেশে কৃত্রিমভাবে ঘর গরম রাখার প্রয়োজন কমে আসবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য এই গবেষণার বার্তা স্পষ্ট—আসন্ন দশকের সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই আধুনিক স্থাপত্যশৈলী এবং পরিবেশবান্ধব শীতলকরণ প্রযুক্তি গ্রহণ করা ছাড়া বিকল্প নেই।

সম্ভাব্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ) নিচে দেওয়া হলো:

প্রশ্ন ১: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বাংলাদেশ নিয়ে কী বলা হয়েছে?

উত্তর: গবেষণায় জানানো হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রলয়ংকরী প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে চরম তাপমাত্রার ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের শীর্ষ ছয়টি দেশের তালিকায় থাকবে বাংলাদেশ। এটি মূলত ‘সিডিডি’ নামক এক বৈজ্ঞানিক সূচকের ভিত্তিতে নিরূপণ করা হয়েছে।

প্রশ্ন ২: ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের কত শতাংশ মানুষ চরম তাপপ্রবাহের শিকার হবে?

উত্তর: যদি বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তবে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ মানুষ (প্রায় ৩৭৯ কোটি) অসহনীয় তাপমাত্রার মধ্যে বসবাস করবে। ২০১০ সালে এই হার ছিল মাত্র ২৩ শতাংশ।

প্রশ্ন ৩: চরম তাপমাত্রার ঝুঁকিতে থাকা অন্য ৫টি দেশ কী কী?

উত্তর: বাংলাদেশের পাশাপাশি চরম তাপমাত্রার ঝুঁকিতে থাকা অন্য পাঁচটি দেশ হলো ভারত, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইন।

প্রশ্ন ৪: ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ (CDD) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: সিডিডি (CDD) হলো একটি বৈজ্ঞানিক সূচক যা দিয়ে বোঝা যায় ঘরের ভেতর আরামদায়ক তাপমাত্রা বজায় রাখতে কতটা কৃত্রিম শীতলীকরণ (যেমন—এসি বা ফ্যান) প্রয়োজন। কোনো এলাকায় বছরে ৩ হাজারের বেশি সিডিডি থাকলে তাকে ‘চরম তাপপ্রবণ’ অঞ্চল বলা হয়।

প্রশ্ন ৫: চরম তাপমাত্রা কেন বাংলাদেশের জন্য ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে পরিচিত?

উত্তর: ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো দুর্যোগ দৃশ্যমান হলেও তীব্র তাপপ্রবাহ নিরবে জনস্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এজন্য বিশেষজ্ঞরা একে ‘নীরব ঘাতক’ বলছেন।

প্রশ্ন ৬: এই উষ্ণতা মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের প্রধান পরামর্শ কী?

উত্তর: বিশেষজ্ঞরা ২০৫০ সালের মধ্যে নেট-জিরো কার্বন নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, ভবন নির্মাণ খাতে কার্বনমুক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রতিটি দেশে টেকসই ও কার্যকর শীতলকরণ কৌশল তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রশ্ন ৭: তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে কী ঘটবে?

উত্তর: তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ার ওপর নজিরবিহীন নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মানুষের জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

তানভির ইসলাম/

ট্যাগ: ২০৫০ সালে বাংলাদেশের তাপমাত্রা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাংলাদেশ চরম তাপমাত্রার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ বাংলাদেশের আবহাওয়া নিয়ে দুঃসংবাদ নেচার সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট বাংলাদেশ তাপপ্রবাহের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকা জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশ ২০৫০ চরম তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ সিডিডি সূচক তাপমাত্রা গবেষণা বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাপমাত্রা নিয়ে অক্সফোর্ডের সতর্কবার্তা ২০৫০ সালের মহাবিপর্যয় বাংলাদেশ বাংলাদেশের আবহাওয়া সংবাদ গরমের ঝুঁকিতে শীর্ষ ৬ দেশ Bangladesh extreme temperature risk 2050 Oxford University temperature study Bangladesh Nature Sustainability research Bangladesh heat Bangladesh among top 6 heat-vulnerable countries Extreme heatwave prediction Bangladesh Climate change impact Bangladesh 2050 Cooling Degree Days (CDD) index Bangladesh Most heat-stressed countries 2050 list Global warming news Bangladesh Future temperature rise in Bangladesh Oxford Martin Future of Cooling study Bangladesh weather warning 2050

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ