Md Razib Ali
Senior Reporter
মোস্তাফিজ ও কেকেআর: খেলার ছলে রাজনীতির কূটচাল? উইজডেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য
বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রণ এখন আর কেবল বাউন্ডারি লাইনের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ক্রমশ ক্ষমতার অলিন্দে বন্দী হয়ে পড়ছে। মর্যাদাপূর্ণ ক্রিকেট সাময়িকী ‘উইজডেন’-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখন পুরোদমে রাজনৈতিক প্রভাবের শিকারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা এবং বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত এই কালো অধ্যায়কে বিশ্বদরবারে নতুন করে উন্মোচিত করেছে।
মোস্তাফিজ ও কেকেআর: খেলার ছলে রাজনীতির কূটচাল?
চলমান আইপিএলে টাইগার পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে কম নাটকীয়তা হয়নি। ৯.২ কোটি রুপির বিশাল অঙ্কে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) তাকে দলে নিলেও শেষ পর্যন্ত তাকে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে। উইজডেন সম্পাদক লরেন্স বুথের দাবি, বিসিসিআই-এর বিশেষ নির্দেশে তাকে স্কোয়াড থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। নেপথ্যের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভারতের চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তীব্র চাপ। বুথের মতে, ক্রিকেটের কৌশলগত কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক সমীকরণের বলি হয়েছেন এই বাংলাদেশি তারকা।
আইসিসির বৈষম্য ও বাংলাদেশের চরম সিদ্ধান্ত
মোস্তাফিজ ইস্যুতে তৈরি হওয়া অস্থিরতা জল অনেক দূর গড়িয়েছে। নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সূচি পুনর্নির্ধারণের আবেদন জানায়। তারা বিকল্প ভেন্যু হিসেবে শ্রীলঙ্কাকে বেছে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও আইসিসি তা সাফ নাকচ করে দেয়। এই অনড় অবস্থানের প্রতিবাদে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়।
লরেন্স বুথ আইসিসির এই দ্বিমুখী আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ক্ষেত্রে ভারতের সুবিধার্থে ভেন্যু বদলে দেওয়া হলেও বাংলাদেশের বেলায় আইসিসি ছিল রহস্যজনকভাবে কঠোর। এই বৈষম্য ক্রিকেটের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পাক-ভারত বৈরিতা ও ক্রিকেট অর্থনীতির সংকট
বাংলাদেশের এই সাহসী পদক্ষেপের পর পাকিস্তানও সুর চড়িয়েছে। তারা ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কটের হুমকি দিলেও বুথ একে ‘আত্মঘাতী’ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। লরেন্স বুথের মতে, পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নকভি যখন খেলা ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার কথা বলেন, তখন তিনি নিজের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদের ভার ভুলে যান। পাকিস্তান ক্রিকেটের এই অসহায়ত্ব মূলত ক্রিকেট অর্থনীতির ওপর ভারতের নিরঙ্কুশ আধিপত্যেরই প্রমাণ।
বিসিসিআই ও রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা
উইজডেনের বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে যে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) এখন মূলত দেশটির শাসকগোষ্ঠীর একটি সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে বুথ তুলে ধরেন—
এশিয়া কাপে জয়ের পর অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব সেই সাফল্যকে দেশের সামরিক বাহিনীর নামে উৎসর্গ করেছেন।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘অপারেশন সিঁদুর’ সংক্রান্ত টুইট, যা খেলার মাঠকে যুদ্ধের ময়দান হিসেবে চিত্রায়িত করে।
ক্রিকেটের ‘অরওয়েলিয়ান’ ভবিষ্যৎ
প্রতিবেদনের শেষাংশে লরেন্স বুথ সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, ক্রিকেটের বর্তমান কাঠামো ধীরে ধীরে একটি ‘অরওয়েলিয়ান’ বা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। যেখানে রাজনীতির প্রভাব এতটাই প্রকট যে সাধারণ ক্রীড়াপ্রেমীরাও তা উপেক্ষা করতে পারছে না। মোস্তাফিজ ইস্যু থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বর্জন—সবই প্রমাণ করে যে, ক্রিকেট এখন আর কেবল একটি খেলা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক প্রভাব ও বৈষম্যের এক বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
তানভির ইসলাম/