নামাজে মোবাইল বেজে উঠলে বন্ধ করা যাবে? জানুন হাদিসে কী আছে
নামাজে দাঁড়ানোর পর হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে উঠলে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান—ফোনটি বন্ধ করতে গেলে কি নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে? আবার ফোনের শব্দে আশপাশের মুসল্লিদেরও বিরক্তি হতে পারে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, নামাজের মধ্যে মোবাইল বেজে উঠলে শুধু রিং হওয়ার কারণে নামাজ ভেঙে যায় না। প্রয়োজন হলে সামান্য নড়াচড়া করে ফোনের শব্দ বন্ধ করা যেতে পারে। তবে নামাজের মধ্যে ফোন রিসিভ করে সাধারণ কথাবার্তা বলা যাবে না।
নামাজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এ ইবাদতে মনোযোগ, বিনয় ও একাগ্রতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী।” (সুরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১-২)
এ কারণে নামাজের সময় এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা নিজের কিংবা অন্য মুসল্লিদের মনোযোগ নষ্ট করে। মোবাইল ফোনের রিংটোনও অনেক সময় জামাতে থাকা মানুষের একাগ্রতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
নামাজের মধ্যে মোবাইল বাজলে কী করবেন?
নামাজ পড়ার সময় হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠলে প্রথমে শান্ত থাকতে হবে। ফোনটি যদি পকেট বা এমন কোনো জায়গায় থাকে, যেখান থেকে খুব সামান্য নড়াচড়া করে দ্রুত রিং বন্ধ করা সম্ভব, তাহলে তা করা যেতে পারে।
ফিকহি ব্যাখ্যায় প্রয়োজনের কারণে নামাজের মধ্যে সীমিত নড়াচড়ার সুযোগ রয়েছে। মোবাইলের রিং বন্ধ করার মতো প্রয়োজনীয় ও স্বল্প নড়াচড়াকে এ কারণে আলেমরা অনুমোদন করেছেন।
তবে ফোন বন্ধ করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার পকেট হাতড়ানো, স্ক্রিন দেখা, মেসেজ পড়া কিংবা ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া উচিত নয়। উদ্দেশ্য হবে শুধু যত দ্রুত ও কম নড়াচড়ায় সম্ভব শব্দ বন্ধ করা।
শুধু মোবাইল বাজলেই কি নামাজ ভেঙে যায়?
না। মোবাইলের রিং বেজে উঠেছে—এ কারণে নিজে থেকেই নামাজ বাতিল হয়ে যায় না।
কেউ যদি ফোনের শব্দ শুনেও সেটি বন্ধ না করেন এবং নামাজ চালিয়ে যান, তাতেও শুধু রিং হওয়ার কারণে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল নেই।
তবে ফোনের শব্দে যদি অন্য মুসল্লিদের নামাজে বিঘ্ন ঘটে এবং সামান্য নড়াচড়া করেই সেটি বন্ধ করা সম্ভব হয়, তাহলে রিং বন্ধ করে দেওয়া অধিক দায়িত্বশীল আচরণ।
নামাজের মধ্যে ফোন রিসিভ করে কথা বলা যাবে?
সাধারণ অবস্থায় নামাজের মধ্যে ফোন রিসিভ করে কথা বলা যাবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে নামাজের মধ্যে কথা বলার বিধান সম্পর্কে সাহাবিদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, নামাজ এমন ইবাদত যেখানে সাধারণ মানুষের কথাবার্তা বলা যায় না।
এ কারণে ফোন বেজে উঠলে ‘হ্যালো’, ‘কে’, ‘পরে কথা বলব’—এ ধরনের সাধারণ কথাবার্তাও নামাজের মধ্যে বলা উচিত নয়।
তবে জীবন রক্ষা বা অন্য কোনো চরম জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নামাজ ভাঙার প্রয়োজনীয়তা ও পরবর্তী করণীয় নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
ফোন সাইলেন্ট করতে গিয়ে কতটা নড়াচড়া করা যাবে?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রয়োজন ও নড়াচড়ার পরিমাণ।
নামাজে সামান্য নড়াচড়া এবং এমনভাবে দীর্ঘ সময় নড়াচড়া করা যাতে একজন ব্যক্তি নামাজের বাইরে থাকা মানুষের মতো দেখায়—দুটি এক বিষয় নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজের মধ্যে প্রয়োজনীয় নড়াচড়ার নজিরও পাওয়া যায়। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, তিনি তাঁর নাতনি উমামাহকে বহন করে নামাজ পড়েছেন। সিজদায় যাওয়ার সময় তাঁকে নামিয়ে রাখতেন এবং দাঁড়ানোর সময় আবার তুলে নিতেন।
এই হাদিস থেকে আলেমরা বুঝিয়েছেন, প্রয়োজনের কারণে সীমিত নড়াচড়া নামাজের সঙ্গে সবসময় সাংঘর্ষিক নয়।
তবে এই বিষয়টি মাথায় রেখে নামাজের মধ্যে মোবাইল নিয়ে অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া করা ঠিক হবে না। রিং বন্ধ করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
জামাতে নামাজের সময় মোবাইল বাজলে বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একাকী নামাজের তুলনায় জামাতে মোবাইলের রিং বেজে উঠলে অন্য মুসল্লিদেরও অসুবিধা হতে পারে। বিশেষ করে মসজিদে নীরব পরিবেশের মধ্যে জোরে রিংটোন বাজলে অনেকের মনোযোগ নষ্ট হয়।
ইসলামে অন্যের ইবাদতে অযথা বিঘ্ন সৃষ্টি না করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই নামাজে দাঁড়ানোর আগে মোবাইল সাইলেন্ট করে নেওয়া একজন মুসল্লির দায়িত্বশীলতার অংশ।
আর যদি ভুলে সাইলেন্ট করা না হয় এবং নামাজের মাঝখানে ফোন বেজে ওঠে, তাহলে সম্ভব হলে দ্রুত ও সামান্য নড়াচড়া করে শব্দ বন্ধ করা ভালো।
নামাজের আগে মোবাইল সাইলেন্ট করা কেন ভালো?
নামাজের আগে মোবাইল সাইলেন্ট করা খুবই সহজ একটি সতর্কতা। এতে নামাজের মধ্যে অপ্রত্যাশিত শব্দ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
পবিত্র কোরআনে নামাজে খুশু বা বিনয়ের কথা বলা হয়েছে। মুমিনের সফলতার বৈশিষ্ট্য হিসেবে নামাজে একাগ্রতাকে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নামাজের পরিবেশ শান্ত রাখা এবং নিজের মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে জামাতে নামাজ পড়ার সময় ফোন সাইলেন্ট করে রাখা উচিত। এতে নিজের পাশাপাশি অন্য মুসল্লিরাও নির্বিঘ্নে ইবাদত করতে পারেন।
ফোন দূরে থাকলে কী করবেন?
মোবাইল যদি এমন জায়গায় থাকে যেখান থেকে রিং বন্ধ করতে গেলে অনেকটা নড়াচড়া করতে হবে, তাহলে শুধু ফোন বন্ধ করার জন্য অতিরিক্ত নড়াচড়া করা ঠিক হবে না।
এ ক্ষেত্রে নামাজ চালিয়ে যাওয়াই ভালো। কারণ ফোনের শব্দ বন্ধ করার জন্য এমন কাজ করা উচিত নয়, যার ফলে নামাজের স্বাভাবিক অবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
অর্থাৎ, ফোন কাছে থাকলে সামান্য নড়াচড়ায় বন্ধ করা যেতে পারে; কিন্তু ফোন দূরে থাকলে সেটি আনতে গিয়ে বেশি নড়াচড়া করা উচিত নয়।
ফোনে মিউজিকের রিংটোন থাকলে কী করবেন?
মোবাইল ফোনের রিংটোনে গান বা বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা নিয়েও আলেমদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। অনেক আলেম বাদ্যযন্ত্রযুক্ত রিংটোন ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন।
তাই সাধারণ সময়েও ফোনে অশোভন বা অনুপযুক্ত রিংটোন ব্যবহার না করে সাধারণ রিংটোন রাখা ভালো। আর মসজিদে প্রবেশের আগে অবশ্যই ফোন সাইলেন্ট করে নেওয়া উচিত।
নামাজে মোবাইল নিয়ে ইসলামের মূল শিক্ষা কী?
এখানে মূল বিষয় শুধু ফোন বন্ধ করা নয়। বরং নামাজের খুশু, একাগ্রতা এবং অন্য মুসল্লির প্রতি দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের মধ্যে কোনো প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি হলে কীভাবে সংকেত দিতে হবে, সে বিষয়েও সাহাবিদের শিক্ষা দিয়েছেন। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, নামাজে কোনো বিষয় জানাতে হলে পুরুষরা ‘সুবহানাল্লাহ’ বলবে এবং নারীরা হাততালি দেবে।
এ থেকে বোঝা যায়, নামাজের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাজের ক্ষেত্রেও শরিয়ত নির্ধারিত শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে মূল নীতি হলো—নামাজের আগে সতর্ক হওয়া, আর ভুলে ফোন বেজে গেলে যত কম নড়াচড়ায় সম্ভব শব্দ বন্ধ করা।
ভুলে ফোন সাইলেন্ট না করেই নামাজ শুরু করলে?
এটি খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। নামাজ শুরু করার পর যদি মনে হয় ফোন বেজে উঠতে পারে, তাহলে সম্ভব হলে নামাজের মধ্যে সামান্য নড়াচড়া করে ফোন সাইলেন্ট করা যেতে পারে।
তবে ফোনের স্ক্রিন দেখে কল কে করেছে, মেসেজ এসেছে কি না কিংবা নোটিফিকেশন পরীক্ষা করা উচিত নয়। এতে নামাজের মনোযোগ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়াও বেড়ে যায়।
তাহলে সবচেয়ে ভালো করণীয় কী?
নামাজে মোবাইল বাজলে করণীয়কে সহজভাবে বলা যায়—ফোনের রিংয়ের কারণে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই, আবার সেটিকে উপেক্ষা করে অন্য মুসল্লিদের বিরক্ত করাও উচিত নয়।
ফোন কাছে থাকলে এবং সামান্য নড়াচড়ায় রিং বন্ধ করা সম্ভব হলে তা করে নেওয়া যায়। এরপর সঙ্গে সঙ্গে নামাজের অবস্থায় ফিরে মনোযোগ দিতে হবে।
অন্যদিকে, ফোন বন্ধ করতে গিয়ে যদি বেশি নড়াচড়া করতে হয়, তাহলে সেটি করার প্রয়োজন নেই। আর নামাজের মধ্যে ফোন রিসিভ করে সাধারণ কথাবার্তা বলা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
নামাজের সময় মোবাইল ফোন বেজে উঠলে শুধু রিং হওয়ার কারণে নামাজ ভেঙে যায় না। প্রয়োজন হলে সামান্য ও নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া করে ফোনের শব্দ বন্ধ করা যেতে পারে। তবে ফোন নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যস্ত হওয়া বা কল রিসিভ করে সাধারণ কথাবার্তা বলা নামাজের উদ্দেশ্য ও বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সবচেয়ে ভালো হলো, নামাজে দাঁড়ানোর আগেই মোবাইল সাইলেন্ট বা বন্ধ করে নেওয়া। এতে নিজের নামাজে একাগ্রতা বজায় থাকবে এবং অন্য মুসল্লিদের ইবাদতেও কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটবে না।
ধর্মীয় বিধানের ক্ষেত্রে মাজহাবভেদে কিছু খুঁটিনাটি পার্থক্য থাকতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নামাজের সহিহ হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হলে স্থানীয় যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
FAQ
১. নামাজের মধ্যে মোবাইল বাজলে কি নামাজ ভেঙে যায়?
না। শুধু মোবাইলের রিং বেজে উঠলে নামাজ ভেঙে যায় না। প্রয়োজন হলে সামান্য নড়াচড়া করে রিং বন্ধ করা যেতে পারে।
২. নামাজের মধ্যে ফোন সাইলেন্ট করা যাবে কি?
হ্যাঁ, ফোনের শব্দে অন্য মুসল্লিদের বিরক্তি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সামান্য নড়াচড়া করে ফোন সাইলেন্ট করা যেতে পারে।
৩. নামাজের মধ্যে ফোন রিসিভ করে কথা বলা যাবে কি?
সাধারণ অবস্থায় যাবে না। নামাজের মধ্যে সাধারণ কথাবার্তা বলা নিষিদ্ধ। চরম জরুরি পরিস্থিতির বিধান আলাদা।
৪. ফোন বন্ধ করতে গিয়ে বেশি নড়াচড়া করলে কী হবে?
অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত নড়াচড়া করা উচিত নয়। ফোন বন্ধ করতে সামান্য নড়াচড়া যথেষ্ট হলে সেটুকুই করা উচিত।
৫. নামাজের আগে মোবাইল সাইলেন্ট করা কি ভালো?
অবশ্যই। নামাজের আগে ফোন সাইলেন্ট বা বন্ধ করে রাখলে নিজের একাগ্রতা বজায় থাকে এবং অন্য মুসল্লিদেরও বিরক্তি হয় না।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- মুনাফার ধারাবাহিকতার পর বিএসআরএম স্টিলে আসছে বড় সিদ্ধান্ত
- Vivo V80 কেনার আগে জেনে নিন এর ভালো-মন্দ, কার জন্য সেরা
- Vivo V80: ৭,২০০mAh ব্যাটারি ও ZEISS ক্যামেরার চমক
- আর্জেন্টিনা বনাম বেনিন ম্যাচ কখন, কোথায় কীভাবে লাইভ দেখবেন
- OPPO F35 Pro 5G: ৮,০০০mAh ব্যাটারি ও ১৪৪Hz AMOLED
- আর্জেন্টিনা বনাম বেনিন ম্যাচ: সময়, একাদশ ও লাইভ দেখার উপায়
- ডোমিনেজ স্টিলে মালিকানা বদল, এবার পর্ষদেও বড় রদবদল
- আয়-সম্পদে বড় উত্থান অ্যাপেক্স ফুডসের, ডিভিডেন্ড কেন একই?