ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

‘আমি ভাসমান’: ৯ বছর পর কানাডা থেকে মুখ খুললেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৩ ১৪:৫৮:১৬
‘আমি ভাসমান’: ৯ বছর পর কানাডা থেকে মুখ খুললেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা

২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে অস্ট্রেলিয়ার পথে রওনা হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। সেদিনের যাত্রা আর ফেরার পথে শেষ হয়নি। নয় বছর পেরিয়ে আজ তিনি কানাডার টরন্টোয় এমন এক অবস্থায় আছেন, যাকে নিজেই বর্ণনা করেছেন এভাবে: ‘আমি তো রিফিউজি হিসেবেই আছি এখন। কারণ হলো শেখ হাসিনার সরকার আমাকে একটা কনভিকশন (দোষী সাব্যস্ত করা) দিয়েছিল, একটা সাজানো মামলায়। …যার পরিপ্রেক্ষিতে আমি স্ট্যাটাসবিহীন একেবারে ফ্লোটিংম্যান, যাকে বলে ভাসমান লোক হিসেবে আছি।’

বিচারপতি এস কে সিনহা নামেও পরিচিত এই সাবেক প্রধান বিচারপতি দেশত্যাগ, পদত্যাগ আর পেনশন না পাওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। গত ২৭ আগস্ট, ২ সেপ্টেম্বর এবং সর্বশেষ গতকাল সোমবার হয়েছে সেই আলাপ।

ষোড়শ সংশোধনীর রায়: যেখান থেকে ফাটল ধরে

সিনহার বিদায়ের গল্পের কেন্দ্রে আছে একটি রায়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস হয়। এর বিরুদ্ধে রিট হলে হাইকোর্ট রায় দেন, আর সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।

২০১৭ সালের ১ জুন আপিলের শুনানি শেষ হলে মামলাটি রায়ের অপেক্ষায় রাখা হয়। ৩ জুলাই সিনহার নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বিভাগ একমত হয়ে আপিল খারিজ করেন। এতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারক অপসারণের ব্যবস্থা ফিরে আসে। ১ আগস্ট প্রকাশিত হয় পূর্ণাঙ্গ রায়।

সেই রায়ে গণতন্ত্র, রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, সুশাসন, দুর্নীতি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ নানা প্রসঙ্গে পর্যবেক্ষণ ছিল। ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, নেতা ও সরকারঘেঁষা আইনজীবীরা এসব নিয়ে অসন্তোষ জানান, কেউ কেউ প্রধান বিচারপতির পদত্যাগও চান। রায়কে স্বাগত জানায় বিএনপি।

সংসদেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার আলোচনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ ১৮ জন মন্ত্রী-সংসদ সদস্য প্রধান বিচারপতির কড়া সমালোচনা করেন। এরপর ২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সংসদে প্রস্তাব পাস হয়। তাতে রায় বাতিলে আইনি পদক্ষেপ এবং সংসদ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির ‘অসাংবিধানিক, আপত্তিকর, অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ’ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ ২০১৭ সালেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর আপিল বিভাগ কিছু পর্যবেক্ষণসহ সেই আবেদন নিষ্পত্তি করেন। ফলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারক অপসারণের বিধান বহাল থাকে।

বঙ্গভবনের সেই সন্ধ্যা

সিনহার দাবি, রায় ঘোষণার আগে তাঁকে চায়ের আমন্ত্রণে বঙ্গভবনে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। নিজের আত্মজীবনীমূলক বই ‘আ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’তে তিনি এ কথা লিখেছেন। বইটি লেখা হয়েছে বিদেশে থাকার সময়।

প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ২০১৭ সালের ১ জুলাই সকালে তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একটি ফোন আসে। ফোনদাতা নিজেকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সামরিক সচিব পরিচয় দিয়ে জানান, রাষ্ট্রপতি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় চা খেতে ডেকেছেন। সামরিক সচিবের কাছ থেকে একটি খুদে বার্তাও আসে। ২ জুলাই সন্ধ্যায় সিনহা বঙ্গভবনে যান। সেখানে রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক (বর্তমানে কারাবন্দী) ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম (প্রয়াত)।

সিনহার বর্ণনায়, আলোচনার মূল বিষয় ছিল ষোড়শ সংশোধনীর রায়। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ষোড়শ সংশোধনীর রায় সংক্রান্ত বিষয়টি উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছিলেন যেন সরকারের পক্ষে রায় দেওয়া হয়। আমি বলেছিলাম যে আমি সরকারের পক্ষে মতামত দিলেও হাইকোর্টের রায় বাতিল হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই; কারণ বিষয়টি নিয়ে তাঁরা (নিজে ও আপিল বিভাগের অপর বিচারপতিরা) তখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।’

তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল বারবার চাপ দিচ্ছিলেন, যেন অন্য বিচারকেরা বিপক্ষে মত দিলেও তিনি সরকারের পক্ষে থাকেন। তিনি অনড় থাকায় প্রধানমন্ত্রী মেজাজ হারান। আলাপ একসময় উত্তপ্ত বিতর্কে পৌঁছালে সিনহা জানান: ‘তখন আমি পদত্যাগ করব বলেছিলাম। এ সময় প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই পদত্যাগ না করতে অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী বললেন, “ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়ে রায়ের আগে পদত্যাগ করলে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।” অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পদত্যাগের যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম, তা থেকে সরে আসি।’

১২ দিনের ঘটনাপ্রবাহ: ছুটির চিঠি থেকে বিমানবন্দর

২ অক্টোবর। আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম শুরুর কথা ছিল ৩ অক্টোবর। তার আগের দিন রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়ে এক মাসের ছুটির কথা জানান প্রধান বিচারপতি। সিনহা বইয়ে লিখেছেন, সেদিন সকালে তিনি অসমাপ্ত কাজ গুছিয়ে নিতে আদালতে গিয়েছিলেন।

প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব জানান, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আবেদীন দুপুর ১২টায় দেখা করতে চান। সিনহা অনুমতি দেন। সাইফুল আবেদীন তখন জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালন করছেন, এবং ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসের ছুটিতে যেতে বলেন। সিনহা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর ভাষ্য, বাসায় ফেরার পর তিনি গৃহবন্দী হয়ে পড়েন।

ছুটির প্রজ্ঞাপন। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির শারীরিক অসুস্থতার কারণে ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিনের ছুটি মঞ্জুর করেছেন। এ সময় আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তৎকালীন সরকারের এক মন্ত্রীও জানান, শারীরিক সমস্যার কারণেই ছুটি নেওয়া হয়েছে। বিএনপি পাল্টা অভিযোগ তোলে, প্রধান বিচারপতিকে ‘গৃহবন্দী’ করে রাখা হয়েছে। ৫ অক্টোবর ছুটিতে থাকা সিনহা জনসমক্ষে এলে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা আরও বাড়ে।

১৩ অক্টোবর। সরকারি ভাষ্যে অসুস্থতার ছুটি চললেও দেশ ছাড়ার রাতে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে সিনহা বলেন, ‘তিনি অসুস্থ নন, তিনি ভালো আছেন। তিনি একটু বিব্রত।…বিচার বিভাগের স্বার্থে, বিচার বিভাগ যাতে কোনোভাবে কলুষিত না হয়, এ জন্য তিনি সাময়িকভাবে যাচ্ছেন।’ তিনি একটি লিখিত বিবৃতিও সাংবাদিকদের দেন। তাতে লেখা ছিল, তিনি সুস্থ আছেন; তবে একটি রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী এবং বিশেষ করে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী যেভাবে তাঁর সমালোচনা করেছেন, তাতে তিনি সত্যিই বিব্রত।

১৪ অক্টোবর। পরদিন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে যা ঘটেছে, তা বিচার বিভাগের ওপর সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ।

১০ নভেম্বর। বিদেশে থাকা অবস্থায় সিনহা তাঁর পদত্যাগপত্র পাঠান। মেয়াদ শেষ হওয়ার ৮২ দিন আগে ঘটে এই পদত্যাগ।

‘এটা ষড়যন্ত্র’: নয় বছর পরে সিনহার ব্যাখ্যা

ঘটনাটিকে তিনি এখন সরাসরি ষড়যন্ত্র বলছেন। তাঁর দাবি, তৎকালীন সরকারই তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। বলেন, ‘মানে এটাকে বলে কন্সপিরেসি (ষড়যন্ত্র), একেবারে কন্সপিরেসি। প্রথমত, ডিজিএফআইকে ব্যবহার করা হয়েছিল।…বিচারক হওয়ার কারণে হয়তো আমাকে আয়না ঘরে নিতে পারেনি। আপিল বিভাগের সহকর্মী বিচারকেরা বঙ্গভবন থেকে ফিরে এসে রাতারাতি আমার সঙ্গে বসবেন (আদালতে) না বলে বললেন।’

সহকর্মীরা একসঙ্গে না বসলে একজন প্রধান বিচারপতির আর কী থাকে, এই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘অথচ এর কিছুদিন আগে রায় (ষোড়শ সংশোধনী) দিলাম, একসঙ্গে দিলাম। রায়ের পর কী হয়ে গেল?’

তাঁর দাবি, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান তাঁকে বলেছিলেন, ‘স্যার আপনি থাকতে পারবেন না, আপনাকে দেশের বাইরে যেতে হবে।’ সিনহা বলেন, ‘ডিজিএফআই ও শেখ হাসিনার চোখ রাঙানি আমি ভয় পাইনি।...ভয় পেয়েছিলাম সহকর্মীদের ভূমিকায়। সহকর্মী বিচারকেরা যেহেতু সহযোগিতা করলেন না, আমি কী আর করব?’ আরও বলেন, ‘নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না, একপর্যায়ে দেশের বাইরে এলাম। ১৩ অক্টোবর (২০১৭) দেশ থেকে বের হই।’

সিনহার মতে, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ই এর আসল পটভূমি। তাঁর ব্যাখ্যা: ‘অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সরকারের অধীনে। মাসদার হোসেন মামলার রায় হয়েছে, রায় (অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা) বাস্তবায়ন হচ্ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ন্ত্রণ জাতীয় সংসদের অধীনে, মানে নির্বাহীর অধীনে ফিরিয়ে নিতে ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। আমি প্রতিবাদ করলাম। রায় দিয়ে বললাম ষোড়শ সংশোধনী যেটা করেছিল, তা অবৈধ। ওই আমার প্রতি ক্ষোভ—এটাই।’

অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা-বিধিমালা নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁর চিঠি চালাচালিতে দূরত্বের আভাস অবশ্য আরও আগেই মিলতে শুরু করেছিল।

দেশ ছাড়ার পর: মামলা, সাজা ও আটকে থাকা পাওনা

সিনহা বিদেশে যাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়। এর একটিতে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) চার কোটি টাকা প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ আনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এই মামলায় দুটি ধারায় তাঁকে ৭ ও ৪ বছর করে কারাদণ্ড দেন।

মামলার প্রসঙ্গে সিনহার বক্তব্য, ‘তিনটি কি না, জানি না। তবে একটি মামলা পড়েছি, যে মামলায় দণ্ড দেওয়া হয়েছে। উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের বাড়ি বিক্রি করে, বিক্রি করা টাকা থেকে চার নম্বর সেক্টরের অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছি, যা আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেছি। সম্পূর্ণ সত্য আড়াল করে মনগড়া ওই মামলা সাজানো হয়েছে।’

চাকরির আর্থিক সুবিধার মধ্যে অর্জিত ছুটি নগদায়ন বা ল্যাম্প গ্রান্ট (১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ) তিনি পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য: ‘১৮ মাসের মধ্যে আগে ১২ মাসের পাওনা অর্থ দিয়েছিল। বাকি ছয় মাস (ল্যাম্প গ্রান্ট) ও পেনশনের জন্য এখান (কানাডা থেকে) থেকে আবেদন করি। ছয় মাসের টাকা দিয়েছে।’

কিন্তু পেনশন মেলেনি। তাঁর অভিযোগ, ‘বলছে কনসাল জেনারেলের কাছ থেকে আমার দস্তখত কাউন্টার সাইন করা লাগবে। আই এম দ্য লাস্ট পারসন, একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যায়ের বা অফিসারের কাছে গিয়ে আমার সিগনেচার কাউন্টার সাইন করব, এটা অপমানজনক।…আমি না খেয়ে মরছি কিন্তু আমি কোনো দিনই ‘বো ডাউন’ (নত হওয়া) করি নাই।’

কানাডার জীবন: স্ত্রীর স্থায়ী বাসের মর্যাদা হয়েছে, তাঁর হয়নি

সিনহা জানান, অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রথমে কানাডা, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র, তারপর আবার কানাডায় ফিরেছেন তিনি। এখন ছোট মেয়ের সঙ্গে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রীর স্ট্যাটাস হয়ে গিয়েছে, পিআর (পারমানেন্ট রেসিডেন্সি বা স্থায়ী বাস) হয়ে গিয়েছে। তবে আমাকে দিচ্ছে না।’

এর কারণ হিসেবে তিনি বাংলাদেশে সাজানো মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়াকে দায়ী করেন। তাঁর কথায়, ‘আমার পিআর অ্যাপ্রুভ হয়েছে। তবে পুলিশ রিপোর্ট পাইনি, কার্ড ইস্যু হয়নি।’

দেশে ফেরার পথও আপাতত বন্ধ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরপরই তিনি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছিলেন। টরন্টোয় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে সর্বশেষ ৪ আগস্ট রিমাইন্ডার দিয়ে মেইল পাঠিয়েছেন। সিনহা বলেন, ‘আমি দেশে ফিরতে চাই। পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছি, দুই বছরের বেশি হয়ে গেল। কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে রিমাইন্ডার দিয়ে সর্বশেষ ৪ আগস্ট মেইল পাঠিয়ে বললাম—এর কী অবস্থা? কোনো রেসপন্স পাইনি।’

যেভাবে প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। দেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম অমুসলিম প্রধান বিচারপতি। চাকরির মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। শপথ থেকে পদত্যাগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ছিলেন ২ বছর ৯ মাস ২৫ দিন।

সরকার তখন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে জেতা, যে নির্বাচনে ভোটের আগেই ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন এবং বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দল ভোট বর্জন করে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক সরকারগুলো প্রধান বিচারপতির পদে সাধারণত নিজেদের পছন্দের মানুষকেই চায়; একতরফা নির্বাচনের সরকার তো পছন্দের বাইরে কাউকে বসাবেই না। সিনহাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।

দায়িত্বকালে তিনি বিভিন্ন কারণে আলোচনায় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় আসামিদের ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানি হয়েছিল আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চে, যার একজন ছিলেন সিনহা। আবার মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার মৃত্যুদণ্ড আপিল বিভাগে চূড়ান্ত হওয়ার সময়ও প্রধান বিচারপতি ছিলেন তিনি। তবে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয় তাঁর নিজের লেখা ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. এস কে সিনহা কবে এবং কোথায় গিয়েছিলেন?

২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে তিনি ঢাকা ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। এরপর কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র হয়ে আবার কানাডায় ফিরেছেন।

২. এখন তিনি কোথায় থাকেন?

কানাডার টরন্টোয়, ছোট মেয়ের সঙ্গে।

৩. তিনি কেন নিজেকে ‘ভাসমান’ বলছেন?

সিনহার ভাষ্য, বাংলাদেশে সাজানো মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় কানাডায় তাঁর পিআরের পুলিশ রিপোর্ট মেলেনি, কার্ডও ইস্যু হয়নি। তাই তিনি নিজেকে স্ট্যাটাসবিহীন মনে করছেন। তাঁর স্ত্রীর পিআর হয়ে গেছে।

৪. তিনি কি পেনশন পেয়েছেন?

না। ১৮ মাসের ল্যাম্প গ্রান্টের পুরোটা পেলেও পেনশন আটকে আছে। তাঁর অভিযোগ, এর জন্য কনসাল জেনারেলের কাছ থেকে স্বাক্ষর কাউন্টার সাইন করাতে বলা হচ্ছে।

৫. তিনি পদত্যাগ করেছিলেন কবে?

২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর বিদেশ থেকে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠান। মেয়াদ শেষ হতে তখনো ৮২ দিন বাকি ছিল।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ