ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

কেয়া কসমেটিকসের ঋণ: বিপাকে শেয়ারবাজারের চার ব্যাংক

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৯ ১৯:২৪:১৩
কেয়া কসমেটিকসের ঋণ: বিপাকে শেয়ারবাজারের চার ব্যাংক

রপ্তানি আয় জমা না করার যে অভিযোগ কেয়া কসমেটিকস তুলেছিল, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে তার কোনো সত্যতা মেলেনি। উল্টে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি ও এর চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠানকেই দায়ী করা হয়েছে। এর মধ্যেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত চার বেসরকারি ব্যাংক বিপাকে পড়েছে, কারণ অনারোপিত সুদসহ কেয়া গ্রুপের কাছে তাদের পাওনা তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

অভিযোগের শুরু যেখানে

ঋণ পরিশোধের প্রশ্নে চাপে থাকা কেয়া গ্রুপ দাবি করে, ঋণদাতা ব্যাংকগুলো তাদের রপ্তানি আয় নির্দিষ্ট এফসি (বৈদেশিক মুদ্রা) হিসাবে জমা দেয়নি। এ নিয়ে ব্যাংকগুলোকে একের পর এক চিঠিও পাঠানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোর বক্তব্য, এসব দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা প্রমাণ কেয়া গ্রুপ আজ পর্যন্ত দেখাতে পারেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অভিযোগটিকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলছেন। তাঁদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হওয়ার পথ তৈরি করতেই এ অভিযোগ আনা হয়েছে। ব্যাংকের নথিপত্র সূত্রে আরও জানা গেছে, ঋণের দায় এড়াতে ও আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। পুরো পরিস্থিতি দেশের আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক যা খুঁজে পেল

অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই তদন্তের প্রতিবেদন পাঠানো হয় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। বর্তমানে কমিশনের একজন উপপরিচালক বিষয়টি তদন্ত করছেন। দুদক সূত্র নিশ্চিত করেছে, রপ্তানি আয় আত্মসাৎ বা জমা না হওয়ার অভিযোগের কোনো সত্যতা বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনের ভাষ্য আরও কড়া। সেখানে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠান কৌশলে রপ্তানি আয় অন্যত্র সরিয়েছেন বা পাচার করেছেন। পুরো প্রক্রিয়ায় মানি লন্ডারিংয়ের গুরুতর বিষয়ও জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

চার শাখার হিসাবে কী দেখা গেল

দুদক ও ব্যাংক সূত্র অনুযায়ী, কেয়া গ্রুপের নামে আসা রপ্তানি আয় চারটি শাখাতেই যথাযথভাবে দেশে এসেছিল। শাখাগুলো হলো সাউথইস্ট ব্যাংকের গুলশান, পূবালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল, ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের গুলশান। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইমপোর্ট পেমেন্ট, ব্যাংকিং চার্জ, উৎসে কর, ভ্যাট ও এআইটি মেটানোর পর বাকি অর্থ নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহকের হিসাবে সমন্বয় করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দীর্ঘ মেয়াদের পরিদর্শনের হিসাবে শাখাভিত্তিক রপ্তানি আয়ের পরিমাণ এ রকম:

ব্যাংক ও শাখারপ্তানি আয়
সাউথইস্ট ব্যাংক, গুলশান (২০০৪–২০২৩) প্রায় ৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা
পূবালী ব্যাংক, প্রিন্সিপাল প্রায় ৭২২ কোটি টাকা
ন্যাশনাল ব্যাংক, গুলশান ২৭০ লাখ মার্কিন ডলার
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ৬০ কোটি টাকার বেশি

সাউথইস্টের ক্ষেত্রে এর বড় অংশ ইমপোর্ট পেমেন্ট ও সুদে খরচ হয়ে বাকিটা গ্রাহকের চলতি হিসাবে গেছে। বাকি তিন ব্যাংকেও ঋণ ও এলসি দায় সমন্বয়ের পর অবশিষ্ট অর্থ কেয়া গ্রুপের হিসাবে জমা হয়েছে। এসব পর্যালোচনা শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, রপ্তানি আয় জমা না হওয়ার অভিযোগের কোনো আইনগত ভিত্তি বা সত্যতা নেই।

পাওনা বিশাল, বন্ধক তার তুলনায় সামান্য

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, চার ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য ঋণের তুলনায় অনেক কম। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মোট জামানতের মূল্য ঋণের ৩০ শতাংশেরও অনেক নিচে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আছে সাউথইস্ট ব্যাংক। তাদের ঋণ প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, অথচ বন্ধকি সম্পত্তির বাজারমূল্য পৌনে ৩০০ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের সাড়ে ৭০০ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে জামানত ২০০ কোটি টাকারও কম। পূবালী ব্যাংকের সোয়া ৫০০ কোটি টাকার বিপরীতে সম্পত্তি আছে দেড়শ কোটি টাকার। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

আদালতে ব্যাংকগুলো

পাওনা আদায়ে ব্যাংকগুলো অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে। পাশাপাশি সিআর মামলাও দায়ের হয়েছে। দুই ধরনের মামলাই এখন চলমান। একটি ব্যাংক ইতোমধ্যে কেয়া কসমেটিকসকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিত করে চিঠি দিয়েছে। এই বিপুল অর্থ আদায় না হলে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলে ব্যাংকগুলো আশঙ্কা করছে।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. কেয়া গ্রুপ ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ তুলেছিল?

তাদের দাবি ছিল, ঋণদাতা ব্যাংকগুলো রপ্তানি আয় নির্দিষ্ট এফসি (বৈদেশিক মুদ্রা) হিসাবে জমা করেনি।

২. বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে সেই অভিযোগের কী হয়েছে?

দুদক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে বরং কেয়া কসমেটিকস ও এর চেয়ারম্যানকে দায়ী করা হয়েছে।

৩. চার ব্যাংকের মোট পাওনা কত?

অনারোপিত সুদসহ কেয়া গ্রুপের কাছে সাউথইস্ট, ন্যাশনাল, পূবালী ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মোট পাওনা তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

৪. ঋণের বিপরীতে জামানত কতটা আছে?

মোট জামানতের বাজারমূল্য ঋণের ৩০ শতাংশেরও অনেক কম। সাউথইস্টের প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে সম্পত্তির মূল্য পৌনে ৩০০ কোটি টাকা।

৫. ব্যাংকগুলো পাওনা আদায়ে কী করছে?

অর্থঋণ আদালতে ও সিআর মামলা চলছে। একটি ব্যাংক কেয়া কসমেটিকসকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিত করে চিঠিও দিয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: