ই-টিন আছে, আয়কর রিটার্ন দেননি? জরিমানার নিয়ম জানুন
ই-টিন খোলা আছে, কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি—এমন করদাতাদের সবারই কি ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে? উত্তর হলো, না। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে জরিমানা হতে পারে; তবে সবার জন্য একই অঙ্কের জরিমানা নির্ধারিত নয়। আগে আয় নিরূপণ হয়েছে কি না, কোন আইনি বিধানের আওতায় রিটার্ন জমা দেওয়ার কথা ছিল এবং করদাতার পরিস্থিতি কী—এসবের ওপর জরিমানার সীমা নির্ভর করে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ই-টিনধারীদের রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এতে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু আইনটির বিধান অনুযায়ী, আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি, এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা। আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে হিসাব হবে ভিন্ন নিয়মে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে জরিমানা আরোপের সুযোগ রয়েছে। তবে ই-টিন নিবন্ধন থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা কার্যকর হয় না। সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার আইনের শর্ত বিবেচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
রিটার্ন না দিলে জরিমানার হিসাব যেভাবে হবে
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬(১) অনুযায়ী, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া ১৬৬, ১৭২, ১৯১, ১৯৩ অথবা ২১২ ধারার অধীনে রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন।
আইনের বিধান অনুসারে, সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করা করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম জরিমানা ১ হাজার টাকা। রিটার্ন দাখিল না করার বিষয়টি অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য আরও ৫০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
তবে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে করদাতার আগের আয় নিরূপণের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ।
আগে আয় নিরূপণ হয়নি: ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা।
আগে আয় নিরূপণ হয়েছে: সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা—এই দুটির মধ্যে যেটি বেশি, সেটিই সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা।
অতএব, ৫ হাজার টাকা কোনো সর্বজনীন নির্ধারিত জরিমানা নয়। এটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য সর্বোচ্চ সীমা। জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে আইনের শর্ত ও করদাতার অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
আয় করমুক্ত হলেও কি রিটার্ন জমা দিতে হয়?
ই-টিন থাকলেও রিটার্ন জমা দিতে হবে কি না, তা শুধু আয়ের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। আয়কর আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি তাঁদের আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতার আওতায় পড়তে পারেন।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে যাঁদের রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
যাঁদের বার্ষিক আয় প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে।
যাঁদের ক্ষেত্রে আইনের শর্ত অনুযায়ী আগের বছরগুলোর আয় নিরূপণ বা করযোগ্য আয়ের বিষয়টি প্রযোজ্য।
ফার্মের অংশীদার।
কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী।
সরকারি কর্মচারীসহ আইন দ্বারা নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি।
যাঁদের নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ বা আইনগত প্রয়োজনে রিটার্ন জমার প্রমাণ দিতে হয়।
এ ছাড়া আইন অনুযায়ী অন্য শ্রেণির ব্যক্তির জন্যও রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে। তাই আয় করযোগ্য নয় বলে রিটার্ন দেওয়ার প্রয়োজন নেই, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম যাচাই করা উচিত।
২০২৫-২৬ করবর্ষে রিটার্ন জমার সময় কত দিন বাড়ানো হয়েছিল
স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের জন্য সাধারণ করদিবস ৩০ নভেম্বর। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কোনো নির্দিষ্ট করবর্ষে সময়সীমা বাড়ালে সেই করবর্ষের জন্য বর্ধিত সময় প্রযোজ্য হয়।
এর আগের করবর্ষ, ২০২৫-২০২৬-এ রিটার্ন জমার সাধারণ সময়সীমা ছিল ৩০ নভেম্বর। পরে কয়েক ধাপে সময় বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব না হলে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নিয়ম জেনে নেওয়া প্রয়োজন। দেরিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কর, অতিরিক্ত অর্থ বা জরিমানা প্রযোজ্য কি না, তা করদাতার পরিস্থিতি ও আইনের বিধানের ওপর নির্ভর করতে পারে।
ই-টিন নিয়েছেন, এখন আয় নেই—কী করবেন
ব্যাংকিং সেবা, ঋণ গ্রহণ, সম্পত্তি নিবন্ধন কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে অনেকেই ই-টিন নিবন্ধন করেন। পরে কারও আয় কমে যেতে পারে, আবার কারও টিআইএন নেওয়ার প্রাথমিক প্রয়োজনও আর নাও থাকতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে দেখতে হবে, বর্তমান অবস্থায় রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না। আয় করমুক্ত সীমার নিচে নেমে যাওয়া কিংবা বর্তমানে কর দিতে না হওয়ার অর্থ এই নয় যে রিটার্ন দাখিলের দায়িত্বও শেষ হয়ে গেছে।
প্রযোজ্য শর্ত পূরণ হলে টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা যায়। তবে বাতিলের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়। টিআইএন বাতিলের আবেদন এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়।
আগের রিটার্ন জমা হয়েছে কি না, যেভাবে যাচাই করবেন
কোন করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছেন, তা মনে না থাকলে অনলাইনে নিজের রেকর্ড পরীক্ষা করা যেতে পারে। এ জন্য কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।
প্রথম ধাপ: ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করুন।
এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টাল খুলে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।
দ্বিতীয় ধাপ: জমা দেওয়া রিটার্নের রেকর্ড দেখুন।
কোন কোন করবর্ষের রিটার্ন জমা হয়েছে, তা পরীক্ষা করুন। সংশ্লিষ্ট প্রাপ্তিস্বীকার বা রিটার্নের রেকর্ড রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করুন।
তৃতীয় ধাপ: বকেয়া থাকলে ব্যবস্থা নিন।
যে করবর্ষের রিটার্ন জমা হয়নি, সেটি শনাক্ত করে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল করুন। দেরির কারণে কর, সুদ বা জরিমানা প্রযোজ্য কি না, তা যাচাই করুন।
চতুর্থ ধাপ: জরিমানার নোটিশ পেলে কারণ জানুন।
নোটিশ পেলে কোন করবর্ষের জন্য এবং কী কারণে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন। প্রয়োজন হলে কর আইনজীবী বা অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নিন।
অনলাইনে রিটার্ন দেওয়ার সময় যে ভুলগুলো এড়াবেন
রিটার্ন দাখিলের সময় সঠিক করবর্ষ নির্বাচন করা এবং আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায়ের তথ্য নির্ভুলভাবে দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে প্রযোজ্য কর, অগ্রিম কর এবং উৎসে কর্তিত করের তথ্যও যাচাই করতে হবে।
রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকার বা সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সংরক্ষণ করুন। নিজের এনআইডি, টিআইএন, পাসওয়ার্ড ও আর্থিক তথ্য অপরিচিত ব্যক্তি কিংবা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবেন না।
২০২৬-২৭ করবর্ষে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বিষয়ে এনবিআরের নির্দেশনা রয়েছে। তবে নির্ধারিত কিছু শ্রেণির করদাতা ও বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুমোদিত বিকল্প পদ্ধতি প্রযোজ্য হতে পারে।
৫ হাজার টাকা জরিমানা এড়াতে প্রথমেই যা জানা প্রয়োজন
ই-টিন থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি—এমন পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হলো নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থান পরিষ্কার করা। রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না, কোন করবর্ষের রিটার্ন বাকি রয়েছে এবং জরিমানার বিধান প্রযোজ্য কি না, তা যাচাই করা দরকার।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় জরিমানার বিধান থাকলেও প্রত্যেক করদাতার ক্ষেত্রে একই অঙ্ক কার্যকর হয় না। আগে আয় নিরূপণ হয়েছে কি না এবং আইনের কোন শর্ত প্রযোজ্য, তার ওপর জরিমানার সীমা নির্ভর করে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ৫ হাজার টাকা জরিমানার তথ্যকে সবার জন্য প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনগত বাধ্যবাধকতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ই-টিন থাকলেই কি ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে?
না। আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি, এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা। এটি সবার জন্য স্বয়ংক্রিয় জরিমানা নয়।
২. রিটার্ন জমা না দিলে সর্বনিম্ন জরিমানা কত?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্তে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্যকৃত করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা হতে পারে। ন্যূনতম জরিমানা ১ হাজার টাকা। ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
৩. আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে জরিমানার সীমা কী?
সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেটিই সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা।
৪. আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলে কি রিটার্ন জমা দিতে হবে না?
সব ক্ষেত্রে নয়। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পেশা, পদ, ব্যবসায়িক অবস্থান কিংবা সেবা গ্রহণের প্রয়োজনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে।
৫. আগের আয়কর রিটার্নের তথ্য অনলাইনে কোথায় দেখব?
এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টালে লগইন করে জমা দেওয়া রিটার্নের রেকর্ড যাচাই করতে পারেন। বকেয়া রিটার্ন বা জরিমানার নোটিশ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
আল-মামুন/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে
- ওয়ানডে দলে ফিরবেন মুশফিক-রিয়াদ? ব্যাটিং কোচ হচ্ছেন ডি ভিলিয়ার্স?
- জমির দাগ, খতিয়ান ও নকশা যাচাইয়ের সহজ নিয়ম
- জমির দলিল হারালে নকল তুলতে কত টাকা খরচ হবে?
- টেক্সটাইল খাতে সংকট, বন্ধ ১৪ কোম্পানির কারখানা,বিপাকে বিনিয়োগকারীরা
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ৯টি দেশের টাকার মান
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ৬টি দেশের টাকার মান