পূবালী ব্যাংকের শেয়ার নিয়ে হাইকোর্টের রুল, কী অভিযোগ?
পূবালী ব্যাংকের শেয়ার মালিকানা নিয়ে বিরোধে আদালতের আদেশ প্রতিপালন করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগের ব্যাখ্যা চেয়েছেন হাইকোর্ট। ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর জারি করা রুলে তাঁদের বিরুদ্ধে কেন আদালত অবমাননার ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। মামলার আবেদনকারী সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইন নিজের নামে ২ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার ৩৯৭টি শেয়ার নিবন্ধনের পাশাপাশি ৫১ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি লভ্যাংশ ও সুদ দাবি করেছেন।
একই ব্যক্তিকে ঘিরে আরেকটি পৃথক আইনি বিষয়ও রয়েছে। ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট বিবরণে বলা হয়েছে, নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ৩ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার জালিয়াতি, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে। এ ছাড়া তাঁর এবং পরিবারের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে ৬৩৮ কোটি টাকা অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
শেয়ার মালিকানা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হলেন বিনিয়োগকারী
পূবালী ব্যাংকের শেয়ার নিয়ে বিরোধটির সূত্র ১৯৯৪ সালে। মামলার বিবরণ অনুসারে, ওই বছরের ৩০ মে তাশিয়া খানম তাঁর মালিকানাধীন ৩০ হাজার ৩৪৭টি শেয়ার সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইনের কাছে বিক্রি করেন। লেনদেনের অংশ হিসেবে শেয়ার হস্তান্তরের দলিলও সম্পাদিত হয়েছিল।
শেয়ার হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পাঁচ দিন পর তাশিয়া খানম জালিয়াতির অভিযোগ তুলে মামলা করেন। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া চলে। পরে ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেন, শেয়ার হস্তান্তর বৈধ ছিল এবং তাশিয়া খানমের স্বাক্ষর জাল করা হয়নি। মামলার বিবরণে আরও বলা হয়েছে, আপিল বিভাগ ও রিভিউ পর্যায়েও ওই রায় বহাল ছিল।
বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত ঘিরেই আদালত অবমাননার অভিযোগ
আবেদনকারীর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে আদালতের রায়ের পর পূবালী ব্যাংকের বোর্ড সভায় নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত। মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের দেওয়া ছয় সপ্তাহের স্থগিতাদেশ ২০১১ সালের ২৭ জুন শেষ হয়ে যায়। এরপর নতুন কোনো স্থগিতাদেশ না থাকা সত্ত্বেও ১৩ জুলাই ব্যাংকটির ৮৩০তম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। মঞ্জুরুর রহমান ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইনের দাবি, সভায় শেয়ারসংক্রান্ত বোনাস শেয়ার ও ডিভিডেন্ড তাশিয়া খানমের নামে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত আদালতের চূড়ান্ত রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ কারণেই তিনি আদালত অবমাননার আবেদন করেন।
আবেদনটি কনটেম্পট পিটিশন নম্বর ৩৮৪/২০২৬ হিসেবে নথিভুক্ত। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে। ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর ওই বেঞ্চ পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন।
রুলের মাধ্যমে আদালত জানতে চেয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার ব্যবস্থা নেওয়া হবে না কেন। তবে রুল জারি হওয়া অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়; এ বিষয়ে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।
আবেদনকারীর দাবি ৫১ কোটি টাকার বেশি
শেয়ার নিবন্ধনের দাবি ছাড়াও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইন সংশ্লিষ্ট লভ্যাংশ ও সুদের অর্থ পরিশোধ চেয়েছেন। আবেদনে তিনি তাঁর নামে ২ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার ৩৯৭টি শেয়ার নিবন্ধনের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তাঁর দাবি করা লভ্যাংশ ও সুদের পরিমাণ ৫১ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি।
এই দাবির নিষ্পত্তিতে শেয়ার মালিকানা, আগের রায়ের কার্যকারিতা এবং পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের নেওয়া সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো বিবেচনায় আসতে পারে। তবে দাবিগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
ডেল্টা লাইফের নিরীক্ষায় ৩ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার অভিযোগ
মঞ্জুরুর রহমানকে ঘিরে আলোচিত অন্য আইনি বিষয়টি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির আর্থিক কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্দেশে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান একনাবিনের (ACNABIN) তৈরি প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটিতে ৩ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার জালিয়াতি, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের চিত্র উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মঞ্জুরুর রহমান ও তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে ৬৩৮ কোটি টাকা অর্থপাচারের অভিযোগে দুদক মামলা করেছে বলে জানানো হয়েছে। এসব অভিযোগের বিচারিক মূল্যায়ন সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও মামলার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে।
ডেল্টা লাইফের শেয়ারহোল্ডার ও পলিসি গ্রাহক মানিক রতন চাকমাও কোম্পানিকে ঘিরে একটি মামলা করেছেন। তিনি বনানী থানায় মামলাটি দায়ের করেন। তদন্তে পুলিশের গাফিলতি হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে পরে মহানগর আদালতে রিভিশন আবেদন করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট আদালত তাঁর রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। এরপর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দুদকের কাছে স্থানান্তরের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
চূড়ান্ত রায় কার্যকর করা নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠেছে
পূবালী ব্যাংকের বিরোধে হাইকোর্টের রায়, আপিল বিভাগের পর্যায় এবং রিভিউ প্রক্রিয়ার পরও শেয়ার ও লভ্যাংশ নিয়ে বিরোধ দেখা দেওয়ায় আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি সামনে এসেছে। মামলার আবেদনকারীর অভিযোগ, পরবর্তী বোর্ড সিদ্ধান্ত আদালতের চূড়ান্ত রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হিসেবে দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ ও রিভিউ পর্যায়ে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয়ে Res Judicata নীতি প্রযোজ্য হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট মামলায় এই নীতির প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা সংশ্লিষ্ট আইনি বিষয় ও আদালতের মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল।
আদালত অবমাননার রুল এবং ডেল্টা লাইফসংক্রান্ত অভিযোগ—দুটি বিষয়ই ব্যাংক ও বিমা খাতে জবাবদিহি, শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার এবং আদালতের আদেশ প্রতিপালনের গুরুত্ব সামনে এনেছে। শেয়ার মালিকানা ও ডিভিডেন্ড বণ্টনের বিরোধ কিংবা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।
পূবালী ব্যাংকের শেয়ারসংক্রান্ত আবেদনে হাইকোর্টের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ডেল্টা লাইফের অভিযোগগুলোর তদন্ত ও বিচারিক অগ্রগতি—দুটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো অভিযোগ বা রুলকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই; সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর নিষ্পত্তিই আইনি অবস্থান স্পষ্ট করবে।
FAQ
১. পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট কী আদেশ দিয়েছেন?
২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর হাইকোর্ট পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন আদালত অবমাননার ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
২. পূবালী ব্যাংকের শেয়ার নিয়ে বিরোধের শুরু কীভাবে?
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের ৩০ মে তাশিয়া খানম তাঁর ৩০ হাজার ৩৪৭টি শেয়ার সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইনের কাছে বিক্রি করেন। পরে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে মামলা করা হয়।
৩. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইন কী দাবি জানিয়েছেন?
তিনি নিজের নামে ২ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার ৩৯৭টি শেয়ার নিবন্ধন এবং ৫১ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি লভ্যাংশ ও সুদ পরিশোধের দাবি করেছেন।
৪. ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে?
সংশ্লিষ্ট বিবরণ অনুযায়ী, একনাবিনের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ৩ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার জালিয়াতি, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের চিত্র উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মঞ্জুরুর রহমান ও তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে ৬৩৮ কোটি টাকা অর্থপাচারের অভিযোগে দুদক মামলা করেছে বলে জানানো হয়েছে।
৫. হাইকোর্টের রুল কি আদালত অবমাননার অভিযোগ প্রমাণ করে?
না। রুলের মাধ্যমে আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চান। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারিত হবে বিচারিক প্রক্রিয়া ও আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
আল-মামুন/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে
- জমি রেজিস্ট্রির সময় কী কী দেখে স্বাক্ষর করবেন? জেনে নিন
- ওয়ারিশের জমি নামজারি ও আলাদা খতিয়ান করার নিয়ম
- আজকের টাকার রেট কত:বেড়েছে২টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- OnePlus Turbo 7 Pro-তে ১৮৫Hz ডিসপ্লে, ১০,০০০mAh ব্যাটারি?
- জমির রেকর্ডে ভুল? সংশোধনের আবেদন করবেন যেখানে
- জমির দাগ, খতিয়ান ও নকশা যাচাইয়ের সহজ নিয়ম
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ৯টি দেশের টাকার মান
- আজকের মালয়েশিয়ান রিংগিত রেট কত (২৩ অক্টোবর ২০২৬)