ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

শেয়ারবাজারে বন্ধ ৩৭ কোম্পানির ১৪টিই টেক্সটাইল খাতের

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৪ ১৯:৪৯:২১
শেয়ারবাজারে বন্ধ ৩৭ কোম্পানির ১৪টিই টেক্সটাইল খাতের

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশ এখন আর্থিক সংকট ও উৎপাদন বন্ধের চাপে রয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) হিসাব অনুযায়ী, বাজারে থাকা ৫৮টি টেক্সটাইল কোম্পানির মধ্যে ১৪টির কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। আরও ২৮টি প্রতিষ্ঠান নেমে গেছে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির অনুমোদন, আর্থিক তথ্য যাচাই এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এই সংকটের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অতীতে শেয়ারবাজার থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা বেশ কয়েকটি কোম্পানির কারখানা পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে। ডিএসইর তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তালিকাভুক্ত ১৬টি টেক্সটাইল কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে মোট ২ হাজার ২০১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এর মধ্যে ১০টি কোম্পানির উৎপাদন এখন পুরোপুরি বন্ধ।

আর্থিক দুর্বলতা নিয়ে অভিযোগ, প্রশ্নে আইপিও যাচাই

টেক্সটাইল খাতের সংকটের সঙ্গে তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইপিওর অনুমোদন চাওয়ার সময় অনেক কোম্পানি তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তথ্য গোপন করেছে কিংবা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। তাঁদের দাবি, এর ফলে আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজার থেকে শত শত কোটি টাকা সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের অভিযোগ আরও বিস্তৃত। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তালিকাভুক্ত হওয়া অধিকাংশ টেক্সটাইল কোম্পানি বাজারে আসার সময় কাল্পনিক মুনাফা ও মিথ্যা আর্থিক বিবরণী দেখিয়েছিল। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের বাস্তবে স্থায়ী কারখানা ছিল না বলেও তাঁরা অভিযোগ করেছেন।

এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুর্বল টেক্সটাইল কোম্পানিগুলোর অনেকেই মূলত শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ কঠোর যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব কোম্পানিকে অনৈতিকভাবে অনুমোদন দিয়েছিল।

ডিএসইর সতর্কবার্তা উপেক্ষার অভিযোগ

তালিকাভুক্তির অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, বিগত সরকারের সময়ে ডিএসই কোম্পানিগুলোর দুর্বল আর্থিক বিবরণী সম্পর্কে সতর্ক করেছিল এবং তালিকাভুক্তির বিষয়ে তীব্র আপত্তিও জানিয়েছিল। তা সত্ত্বেও তৎকালীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আসার অনুমতি দেয় বলে তাঁর বক্তব্য।

মইনুল ইসলামের মতে, অনিয়মের অভিযোগ থাকা কোম্পানিগুলোর ধারাবাহিক খারাপ পারফরম্যান্স সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত করেছে। এর প্রভাব পড়েছে পুরো শেয়ারবাজারের ওপর, যা বাজারকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে।

তবে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদও জানিয়েছেন ডিএসই চেয়ারম্যান। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে আইপিও অনুমোদন ও তালিকাভুক্তির নিয়মে বেশ কিছু সংস্কার আনা হয়েছে এবং তদারকিও বাড়ানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে আগামীতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

৩৭টি বন্ধ কোম্পানির ১৪টিই টেক্সটাইল খাতের

ডিএসইর ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের হিসাব অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া মোট ৩৭টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ১৪টি টেক্সটাইল খাতের প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ, বন্ধ হয়ে যাওয়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে টেক্সটাইল খাতের অংশ উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে, বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৫৮টি টেক্সটাইল কোম্পানির মধ্যে ১৪টির কারখানা পুরোপুরি বন্ধ এবং আরও ২৮টি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। সাধারণত পরপর দুই বছর লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হলে, নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করলে, টানা ছয় মাসের বেশি কারখানা বন্ধ থাকলে কিংবা পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে সঞ্চিত লোকসান বেশি হলে কোম্পানিকে এই ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়।

পুনর্বাসনের উদ্যোগ থাকলেও ঋণ পেতে সমস্যায় উদ্যোক্তারা

কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে শুধু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগই নয়, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও অর্থায়নের সংকটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল কোম্পানিগুলো তীব্র চলতি মূলধনের সংকটে রয়েছে। ফলে তাদের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে।

সরকার বন্ধ ও নিষ্ক্রিয় কারখানাগুলো পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ তহবিলের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর কঠোর শর্ত এবং ঋণ দিতে অনীহার কারণে বেশিরভাগ উদ্যোক্তা ওই সুবিধা নিতে পারছেন না বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

উৎপাদন বন্ধের পেছনে ব্যয় ও জ্বালানি সংকট

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) এক কর্মকর্তা কারখানা বন্ধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ ও অবকাঠামোগত সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, কাঁচামালের আকাশচুম্বী দাম, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ যন্ত্রাংশের উচ্চমূল্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকট এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অধিকাংশ কোম্পানি উৎপাদন স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে।

ফলে টেক্সটাইল খাতের সংকটের চিত্রে একদিকে রয়েছে কারখানা বন্ধ ও কোম্পানির আর্থিক দুরবস্থা, অন্যদিকে রয়েছে আইপিও অনুমোদনের সময় যাচাই-বাছাই নিয়ে অভিযোগ এবং বর্তমান ব্যবসায়িক ব্যয়ের চাপ। এ পরিস্থিতিতে বাজারের আস্থা পুনরুদ্ধার, কোম্পানির আর্থিক অবস্থার যথাযথ যাচাই এবং বন্ধ কারখানার ভবিষ্যৎ—সবগুলো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

FAQ

১. বর্তমানে কতটি তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল কোম্পানির কারখানা বন্ধ?

ডিএসইর ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের হিসাব অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৫৮টি টেক্সটাইল কোম্পানির মধ্যে ১৪টির কারখানা পুরোপুরি বন্ধ।

২. ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ১৬টি টেক্সটাইল কোম্পানি কত টাকা সংগ্রহ করেছিল?

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজার থেকে মোট ২ হাজার ২০১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল।

৩. ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে কতটি টেক্সটাইল কোম্পানি রয়েছে?

উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী, ২৮টি টেক্সটাইল কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে।

৪. টেক্সটাইল কোম্পানিগুলোর আইপিও নিয়ে কী অভিযোগ উঠেছে?

খাতসংশ্লিষ্ট ও বাজার বিশ্লেষকদের অভিযোগ, কিছু কোম্পানি তালিকাভুক্তির সময় প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন করেছে বা কাল্পনিক মুনাফা ও মিথ্যা আর্থিক বিবরণী দেখিয়েছে।

৫. কারখানাগুলো উৎপাদন বন্ধ রাখার কী কী কারণ উল্লেখ করা হয়েছে?

বিটিএমএর এক কর্মকর্তার মতে, কাঁচামালের উচ্চমূল্য, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ যন্ত্রাংশের দাম, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা উৎপাদন স্থগিত হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: