ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

পুলিশের প্রায় ৪৯২ কর্মকর্তার পদোন্নতি, প্রজ্ঞাপন নভেম্বরে?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৮ ১৫:০৪:৩৩
পুলিশের প্রায় ৪৯২ কর্মকর্তার পদোন্নতি, প্রজ্ঞাপন নভেম্বরে?

পুলিশের বিভিন্ন পদে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পদোন্নতি কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রায় ৪৯২ জন কর্মকর্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। পরিদর্শক থেকে উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদা পর্যন্ত বিস্তৃত এই উদ্যোগের প্রক্রিয়া নভেম্বরের মাঝামাঝি চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) একাধিক ব্যাচের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া এই উদ্যোগ বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশের প্রথম বড় পদোন্নতি কার্যক্রম। দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় তৈরি হওয়া জটিলতা নিরসনের পাশাপাশি বাহিনীর সদস্যদের মনোবল বাড়ানোর বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পাচ্ছে।

শূন্য পদে একাধিক কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব

পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পুলিশ সদর দপ্তরের দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে অন্তত তিনজন কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি (ডিপিসি) প্রায় ১৬০ জন পরিদর্শক ও ট্রাফিক পরিদর্শককে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে উন্নীত করার অনুমোদন দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন এখনো প্রকাশিত হয়নি।

পরবর্তী ধাপে ৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএস ব্যাচের প্রায় ১৫৫ জন এএসপির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতির কথা রয়েছে। পুলিশ সুপার (এসপি) পদে উন্নীত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন ২৮তম, ২৯তম ও ৩০তম বিসিএস ব্যাচের আরও ৯৫ জন কর্মকর্তা।

এ ছাড়া আগে অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে এসপি হওয়া ২৮তম ও ২৯তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবার নিয়মিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে, ২২তম ও ২৪তম বিসিএস ব্যাচের ৬০ জনের বেশি এসপি অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) হয়েছিলেন। তাদের পদোন্নতিও নিয়মিত করার কথা রয়েছে।

ডিআইজি ও অতিরিক্ত আইজিপি পদেও পদোন্নতির পরিকল্পনা

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১তম, ২২তম ও ২৪তম বিসিএস ব্যাচের প্রায় ২০ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৭তম ও ১৮তম বিসিএস ব্যাচের দুজন কর্মকর্তা অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) হতে পারেন।

তবে এবার ২০তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের ডিআইজি পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হবে না। এই ব্যাচের প্রায় ৩৩ জন কর্মকর্তা এখনো পদোন্নতি পাননি।

পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তারা পাঁচ দফায় পদোন্নতি পেয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তাদের আরেক দফায় পদোন্নতি দেওয়া হয়।

এর আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে দুই দফায় পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। ওই দুই দফায় ১০ জন ডিআইজিকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে উন্নীত করা হয়।

পদোন্নতিতে মূল্যায়নের দায়িত্ব যাদের

পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, পেশাগত দক্ষতা, মেধা, চাকরির রেকর্ড, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন এবং গোয়েন্দা যাচাই প্রতিবেদন বিবেচনা করা হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা।

এএসপি থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি পদ পর্যন্ত পদোন্নতির বিষয় পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বাধীন বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি। অন্যদিকে, ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির দায়িত্ব পালন করে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)।

পদোন্নতি না পাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়ে ভিন্নমত

পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপিপন্থী হিসেবে বিবেচিত কিছু কর্মকর্তা ভালো চাকরির রেকর্ড ও পেশাগত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি বা উপযুক্ত পদায়ন পাননি। এবার তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে বলে তিনি জানান।

ওই কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, একই ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা এবং তাদের চেয়ে কম জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও আগেই পদোন্নতি পেয়েছিলেন।

তবে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত সব কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন দুই অতিরিক্ত ডিআইজি। তাদের মতে, কিছু কর্মকর্তার মেধার ঘাটতি ছিল, কারও চাকরির রেকর্ড ভালো ছিল না, আবার কারও বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগও ছিল।

তাদের একজন বলেন, ‘এসএসবির উচিত সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মেধা, চাকরির রেকর্ড, নিষ্ঠা ও সততার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া।’

অন্য এক অতিরিক্ত ডিআইজি জানান, তাঁর দুই বছর আগেই পদোন্নতি পাওয়ার কথা ছিল। তিনি বলেন, ‘একই বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া অন্যান্য ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা এরই মধ্যে পদোন্নতি পেয়েছেন। এ ধরনের বৈষম্য কর্মকর্তাদের মনোবল মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে।’

বাধ্যতামূলক অবসর ও ঊর্ধ্বতন পদে শূন্যতা

পুলিশের পদোন্নতি কার্যক্রমে গতি আনার পেছনে ঊর্ধ্বতন পদে শূন্যতা তৈরির বিষয়টিও রয়েছে। আগের সরকারের আমলে বছরের পর বছর পদোন্নতি আটকে থাকার পাশাপাশি প্রশাসনিক রদবদলের সময় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারায় জনস্বার্থে ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ করা কোনো সরকারি কর্মচারীকে নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করেও অবসরে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতেও কয়েকজন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। তবে অভিযোগগুলো এক রকম নয় এবং সব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কয়েকজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, তাদের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তারা পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন কিংবা জুলাইয়ের ঘটনাবলিতে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। তা সত্ত্বেও তাদের অবসরে পাঠানো হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারা প্রয়োগ করে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়েছে।

এ অবস্থায় কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন, বাহিনীতে পেশাদারত্ব ও সততা ফিরিয়ে আনতে পদোন্নতির সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে মেধাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

১. পুলিশের কতজন কর্মকর্তার পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

পরিদর্শক থেকে ডিআইজি পদমর্যাদা পর্যন্ত প্রায় ৪৯২ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতির জন্য বিবেচনায় নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

২. পদোন্নতির প্রক্রিয়া কখন শেষ হতে পারে?

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের মাঝামাঝি প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।

৩. কোন কোন পদে পদোন্নতির পরিকল্পনা রয়েছে?

পরিদর্শক ও ট্রাফিক পরিদর্শক থেকে এএসপি, এএসপি থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এসপি, অতিরিক্ত ডিআইজি, ডিআইজি এবং অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

৪. পদোন্নতির ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচনা করা হয়?

জ্যেষ্ঠতা, পেশাগত দক্ষতা, মেধা, চাকরির রেকর্ড, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন এবং গোয়েন্দা যাচাই প্রতিবেদন মূল্যায়ন করা হয়।

৫. পদোন্নতির বিষয়ে কোন কমিটি দায়িত্ব পালন করে?

এএসপি থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি পদ পর্যন্ত বিষয়টি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বাধীন বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি। ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির দায়িত্বে রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: