ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

এনআইডি কার্ডের নাম ভুল? অনলাইনে সংশোধনের নিয়ম জানুন

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ৩০ ১৮:০৫:৪০
এনআইডি কার্ডের নাম ভুল? অনলাইনে সংশোধনের নিয়ম জানুন

জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের নামের বানান ভুল থাকলে কিংবা শিক্ষাগত সনদ ও জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে নামের অমিল দেখা দিলে তা সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করা যায়। এ জন্য এখন আর শুরুতেই নির্বাচন অফিসে গিয়ে আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে হয় না। ঘরে বসেই জাতীয় পরিচয়পত্রের অনলাইন সেবা পোর্টালে অ্যাকাউন্ট খুলে সংশোধনের আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা এবং ফি পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।

তবে এনআইডি কার্ডে নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে শুধু আবেদন করলেই হবে না। যে নামটি সঠিক, তার পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র দিতে হবে। আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, ভুলের ধরন এবং কতটা পরিবর্তন চাওয়া হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও আলাদা হতে পারে। বিশেষ করে নামের সামান্য বানান সংশোধন এবং সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তনের আবেদন একভাবে বিবেচিত হয় না।

এনআইডি কার্ডের নাম সংশোধনে কোথায় আবেদন করবেন?

জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম সংশোধনের আবেদন করতে হবে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত অনলাইন পোর্টালে। ওয়েবসাইটটির ঠিকানা:

https://services.nidw.gov.bd

যাদের আগে থেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে, তারা এই পোর্টালে অ্যাকাউন্ট নিবন্ধন করে লগইন করতে পারবেন। এরপর নিজের প্রোফাইলের তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন করা যাবে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনলাইন পোর্টালের পাশাপাশি এনআইডি উইং এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা, থানা বা জেলা নির্বাচন অফিসের মাধ্যমেও সংশোধনের আবেদন করা যায়।

অনলাইনে এনআইডি কার্ডের নাম সংশোধনের আবেদন যেভাবে করবেন

নাম সংশোধনের জন্য অনলাইন আবেদন করতে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।

১. এনআইডি পোর্টালে অ্যাকাউন্ট খুলুন

প্রথমে https://services.nidw.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। সেখানে ‘রেজিস্টার করুন’ অপশনে ক্লিক করে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু করুন।

এরপর নির্দেশনা অনুযায়ী মোবাইল নম্বর বা ইমেইলে পাঠানো যাচাইকরণ কোড ব্যবহার করে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।

২. পরিচয় যাচাই করে লগইন করুন

অ্যাকাউন্ট নিবন্ধনের পর প্রয়োজনীয় যাচাইকরণ সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী, মোবাইল বা ইমেইলে পাওয়া অ্যাক্টিভেশন কোড দেওয়ার পাশাপাশি NID Wallet অ্যাপ ব্যবহার করে মুখমণ্ডল যাচাই করতে হতে পারে।

যাচাই সম্পন্ন হলে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করে এনআইডির প্রোফাইল দেখতে পারবেন।

৩. নামের ভুল সংশোধনের অপশন নির্বাচন করুন

লগইন করার পর প্রোফাইলের তথ্য পরিবর্তন বা সংশোধনের অপশন থেকে নাম সংশোধনের আবেদন শুরু করুন। বাংলা অথবা ইংরেজি নামের যে অংশে ভুল রয়েছে, সেটি সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে।

আবেদন জমা দেওয়ার আগে পুরোনো তথ্য ও প্রস্তাবিত সংশোধিত তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে নিন। কারণ ভুল তথ্য দিয়ে আবেদন করলে সেটি বাতিল হতে পারে বা অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

৪. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করুন

নামের সংশোধনের পক্ষে যেসব প্রমাণপত্র প্রয়োজন, সেগুলো নির্ধারিত নিয়মে স্ক্যান করে বা পরিষ্কার ছবি তুলে আপলোড করতে হবে।

কোনো কাগজে নামের বানান এক রকম এবং অন্য কাগজে ভিন্ন হলে কোন তথ্যটি সঠিক, তা প্রমাণ করার মতো নথি জমা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অস্পষ্ট ছবি, অসম্পূর্ণ কাগজপত্র বা পরস্পরবিরোধী তথ্য আবেদন নিষ্পত্তিতে জটিলতা তৈরি করতে পারে।

৫. নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে আবেদন জমা দিন

প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি যুক্ত করার পর পোর্টালে প্রদর্শিত নির্দেশনা অনুসরণ করে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হবে। ফি জমা দেওয়ার পর আবেদনটি চূড়ান্তভাবে সাবমিট করুন।

আবেদন জমা দেওয়ার পর পাওয়া রসিদ বা আবেদন নম্বর সংরক্ষণ করুন। পরবর্তী সময়ে আবেদনের অবস্থা জানতে এটি কাজে লাগবে।

নাম সংশোধনে কোন কোন কাগজপত্র লাগবে?

নির্বাচন কমিশনের অনলাইন নির্দেশনায় নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরিবর্তনের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন দলিলের কথা বলা হয়েছে।

যাদের এসএসসি বা সমমানের সনদ রয়েছে: নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার সনদ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারীর এসএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে এই সনদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

যাদের এসএসসি বা সমমানের সনদ নেই: সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে চাকরির বই বা এমপিওর কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে। অন্যান্য ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স বা কাবিননামার মতো গ্রহণযোগ্য দলিলের সত্যায়িত অনুলিপি জমা দিতে হতে পারে।

নামের বানান সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও যেসব নথি চাওয়া হতে পারে, সেগুলো হলো—

এসএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত সনদ

জন্মনিবন্ধন সনদ

পাসপোর্ট

নাগরিকত্ব সনদ

চাকরির প্রমাণপত্র

কাবিননামা

পিতা, মাতা বা স্বামী-স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি

সব আবেদনকারীর জন্য একই কাগজপত্র বাধ্যতামূলক নয়। সংশোধনের ধরন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় নথি নির্ধারণ করে।

সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তন করতে হলে কী করতে হবে?

এনআইডিতে শুধু একটি বা দুটি অক্ষরের বানান ভুল থাকলে সেটি সাধারণ বানান সংশোধনের আবেদন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু কেউ যদি ডাকনাম বা অন্য নামে নিবন্ধিত হয়ে থাকেন এবং সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তন করতে চান, তাহলে অতিরিক্ত প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, এ ধরনের আবেদনে গ্রহণযোগ্য শিক্ষাগত বা অন্যান্য প্রমাণপত্রের পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সম্পাদিত হলফনামা এবং জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির কপি জমা দিতে হয়। বিবাহিত আবেদনকারীর ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপিও প্রয়োজন হতে পারে।

এ ধরনের আবেদনে কাগজপত্রের মূল কপি নিয়ে ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাই সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তনের আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা জেনে নেওয়া ভালো।

এনআইডি সংশোধনের ফি কত টাকা?

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধনের জন্য নির্ধারিত ফি দিতে হয়। তবে কত টাকা লাগবে, তা সংশোধনের ধরন এবং আবেদনের পর্যায়ের ওপর নির্ভর করতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের অনলাইন পোর্টালে ‘ফি হিসাব করুন’ নামে আলাদা সুবিধা রয়েছে। সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, আবেদনের ধরন ও বিতরণের ধরন নির্বাচন করে সংশোধনের ফি জানা যায়।

ফি জানার জন্য সরাসরি এই লিংকে যেতে পারেন:

https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/fees

আবেদন জমা দেওয়ার আগে পোর্টালে প্রদর্শিত ফি যাচাই করে নেওয়া উচিত। কারণ সব ধরনের সংশোধনের জন্য একই পরিমাণ টাকা প্রযোজ্য নয়।

আবেদন জমা দেওয়ার পর কীভাবে অবস্থা জানবেন?

অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার পর নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করে আবেদনের বর্তমান অবস্থা দেখা যায়। নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে আবেদনসংক্রান্ত তথ্য দেখার সুবিধা রয়েছে।

আবেদন যাচাইয়ের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শুনানি বা সরেজমিন তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে। তাই আবেদন জমা দেওয়ার পর মোবাইল নম্বর ও ইমেইলে আসা বার্তা খেয়াল রাখুন।

আবেদন অনুমোদিত হলে সংশোধিত তথ্য অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি অনলাইন থেকে সংগ্রহ করা যাবে।

এনআইডিতে নাম সংশোধনের আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন

নামের ভুল সংশোধনের আবেদন করার আগে জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ, পাসপোর্টসহ নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে নামের বানান মিলিয়ে নেওয়া উচিত। কোন বানানটি সঠিক, তার পক্ষে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র প্রস্তুত রাখুন।

একই তথ্য বারবার পরিবর্তনের আবেদন করা ঠিক নয়। নির্বাচন কমিশনের ২০২৬ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম বা জন্মতারিখ সম্পূর্ণ পরিবর্তনের পর একই বিষয়ে দ্বিতীয়বার সংশোধনের আবেদন গ্রহণে বিধিনিষেধ রয়েছে। সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তনের মতো জটিল আবেদন উচ্চপর্যায়ে নিষ্পত্তির জন্য পাঠানো হতে পারে।

তাই আবেদন করার সময় সঠিক তথ্য দেওয়া, প্রয়োজনীয় নথি যুক্ত করা এবং জমা দেওয়ার আগে পুরো আবেদন যাচাই করা জরুরি। এতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানো সহজ হবে।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. এনআইডি কার্ডের নাম কি অনলাইনে সংশোধন করা যায়?

হ্যাঁ। নির্বাচন কমিশনের https://services.nidw.gov.bd পোর্টালে অ্যাকাউন্ট নিবন্ধন করে লগইন করার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ নাম সংশোধনের আবেদন করা যায়।

২. এনআইডিতে নামের বানান সংশোধনে কোন সনদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

আবেদনকারীর এসএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে সংশ্লিষ্ট সনদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলে অন্যান্য গ্রহণযোগ্য দলিল দিয়ে সঠিক নামের প্রমাণ দিতে হয়।

৩. এনআইডিতে সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তন করতে কি হলফনামা লাগে?

হ্যাঁ। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ডাকনাম বা অন্য নামে নিবন্ধিত থাকলে সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তনের আবেদনে গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্রের পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হলফনামা ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির কপি প্রয়োজন হতে পারে।

৪. এনআইডি কার্ডের নাম সংশোধন করতে কত টাকা লাগে?

সংশোধনের ধরন ও আবেদনের পর্যায় অনুযায়ী ফি ভিন্ন হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের অনলাইন পোর্টালের ফি হিসাব করার অপশন থেকে নির্দিষ্ট ফি জানা যাবে।

৫. অনলাইনে আবেদন করার পর কি নির্বাচন অফিসে যেতে হবে?

সব ক্ষেত্রে সরাসরি যেতে হয় না। তবে আবেদনের ধরন ও যাচাইয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ব্যক্তিগত শুনানি, মূল কাগজপত্র প্রদর্শন বা অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য আবেদনকারীকে ডাকতে পারে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: