এক গ্রাম ইউরেনিয়ামও দেবে না ইরান, হামলার শঙ্কায়ও অনড় তেহরান
নতুন করে মার্কিন হামলার আশঙ্কা ঘনীভূত হলেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রশ্নে এক চুলও নড়তে রাজি নয় ইরান। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়ি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের এক গ্রামও ইরান থেকে সরানো হবে না। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কূটনৈতিক ব্যস্ততা বাড়লেও যুদ্ধ থামার কোনো ইঙ্গিত এখনো মিলছে না।
রেজায়ির বার্তা: ইউরেনিয়াম দেশেই থাকবে, মাত্রা নিয়ে আলোচনা সম্ভব
গত মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠকের পর রেজায়ি এ কথা বলেন। তবে তাঁর বক্তব্যে নমনীয়তার একটি জায়গাও রয়েছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানোর সম্ভাবনা তিনি নাকচ করেননি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই সেটি করা যেতে পারে। তেহরান আগেও এমন প্রস্তাব দিয়েছিল।
পারমাণবিক কর্মসূচিকে রেজায়ি 'জাতীয় সম্পদ' বলে বর্ণনা করেছেন। ইরানের শাসকগোষ্ঠীর যুক্তি, সামরিক চাপের মুখে এ কর্মসূচি বন্ধ করা আত্মসমর্পণের সমান। আর বন্ধ করলেও ভবিষ্যতে হামলা হবে না, এমন নিশ্চয়তা কোথায়, সেই প্রশ্নও তাঁরা তুলছেন।
মধ্যস্থতার দৌড়ঝাঁপ, কিন্তু অগ্রগতি নেই
ইরান যুদ্ধ ও ইয়েমেনের সাম্প্রতিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করতে গতকাল বুধবার তেহরানে যান মুনির। এর আগে সোমবার সেখানে গিয়েছিলেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। তেহরানে যাওয়ার আগের দিন তিনি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন। অন্য আরব কর্মকর্তাদেরও তেহরান সফরের ইঙ্গিত মিলেছে। চলতি সপ্তাহে ইরানি কর্মকর্তারা একাধিক দেশের কূটনীতিকের সঙ্গে বসেছেন।
ওয়াশিংটনের দিকেও তৎপরতা আছে। খবর প্রকাশিত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবু নতুন করে যুদ্ধ শুরুর শঙ্কা কমেছে বলে মনে হচ্ছে না।
ইরানের শর্ত: আগে সমঝোতা স্মারকে ফেরা
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মুনিরকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বলার মতো নতুন কিছু ইরানের কাছে নেই। গত মাসে দেওয়া শর্তগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। সেগুলো মানা হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব।
মধ্যস্থতাকারীরা এ সপ্তাহে ইরানকে কী প্রস্তাব দিয়েছেন, তা প্রকাশ্যে আসেনি। তাঁদের বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের শর্ত মেনে আস্থা তৈরি করতে হবে। শর্তগুলোর মধ্যে আছে:
জুন মাসের সমঝোতা স্মারকে ফিরে যাওয়া
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাময়িকভাবে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের চুক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া
ওই সমঝোতা স্মারকে আরও ছিল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বৃহত্তর সমঝোতার আলোচনা অবিলম্বে শুরুর প্রতিশ্রুতি, ইরানের বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, জব্দ ইরানি সম্পদ ছাড়া এবং লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গতকাল তেহরানে ইরানি রপ্তানিকারকদের এক সম্মেলনে বলেন, দেশটির ওপর নতুন হামলা ও আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি আছে। তাঁর ভাষ্য, ইরান এখন প্রকৃত অর্থেই যুদ্ধের মধ্যে আছে, শান্তি থেকে এখনো অনেক দূরে। তাই সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে যুদ্ধাবস্থার বাস্তবতা মাথায় রেখে।
বিশ্লেষকের মত: নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা ছাড়া ছাড় নয়
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক গবেষক ও উপপ্রধান এলি গেরানমায়েহ মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা তোলার নিশ্চয়তা না পেলে ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছাড়বে না। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ইরানিরা জানিয়েছে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনায় তারা রাজি। তবে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের একটি সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সরাসরি যুক্ত থাকতে হবে। এ ধরনের আলোচনা শুরু হতে এখনো অনেক পথ বাকি বলে তাঁর মত।
মধ্যপ্রাচ্যে আরও মার্কিন শক্তি
গত মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো কয়েকজন কর্মকর্তার বরাতে জানায়, পেন্টাগন ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি ও একটি মেরিন ইউনিট মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। এটিকে ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তারা ইরানে বিভিন্ন সম্ভাব্য সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে আছে পিক্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় হামলা চালিয়ে পাহাড়ের ভেতরের পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং 'মাদার অব অল বম্বস' নামে পরিচিত শক্তিশালী বোমা ফেলা। আগে হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ দখল এবং আরও ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।
জবাবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি গতকাল এক নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার হামলা চালালে বা কাউকে হত্যা করলে তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা কোনো সংযম না দেখিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কেন ইউরেনিয়াম নিয়েই এত টানাপোড়েন
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের যুদ্ধ শুরুর অন্যতম কারণ ছিল দেশটির বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি। ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর পর বারবার বলেছেন, তিনি এ কর্মসূচি পুরোপুরি শেষ করতে চান। তবে চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন, সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো গেলে ওয়াশিংটন সন্তুষ্ট হতে পারে।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এর আগে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ধারণা করেছিল, তেহরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম আছে। পারমাণবিক বোমার জন্য ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ করতে হয়। ওই হামলার পর এ বছরও দুই দেশ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানে, যাতে দেশটির পারমাণবিক অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমানে ইরানের কাছে কী পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে, সেগুলোর অবস্থা কী এবং কোথায় রাখা হয়েছে, তা যাচাই করা যাচ্ছে না। কারণ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান আইএইএকে স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। তেহরানের অভিযোগ, সংস্থাটি মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থে কাজ করছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা পারমাণবিক বোমা বানানোর চেষ্টা করছেন না। কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বেসামরিক কাজেও ব্যবহৃত হয়, যেমন ওষুধ তৈরি এবং রাশিয়ার সহযোগিতায় বুশেহর বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন। তবে রেজায়ির মতো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোয় হামলা চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য থাকার যৌক্তিকতা কী। কয়েক দশকের পুরোনো এ কর্মসূচিকে ইরানের শাসকগোষ্ঠী দেশের সার্বভৌম অধিকার ও অর্জন হিসেবে দেখে। যুদ্ধ, হামলা ও হত্যাকাণ্ডের মধ্যেও এটি বন্ধ হয়নি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ইরান কি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠাবে?
না। মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের এক গ্রামও ইরান থেকে সরানো হবে না। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে দেশের ভেতরেই সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানোর সম্ভাবনা তিনি নাকচ করেননি।
২. ইরান হরমুজ প্রণালি খুলতে কী শর্ত দিয়েছে?
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের ভাষ্য, গত মাসে দেওয়া শর্তগুলো যুক্তরাষ্ট্র মানলে সাত দিনের মধ্যে প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব। শর্তের মধ্যে আছে জুনের সমঝোতা স্মারকে ফেরা এবং ইরান-ওমান চুক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া।
৩. আইএইএ কেন ইরানের ইউরেনিয়ামের হিসাব যাচাই করতে পারছে না?
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান সংস্থাটিকে পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। তেহরানের অভিযোগ, আইএইএ মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থে কাজ করছে।
৪. যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানে নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে?
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, পেন্টাগন ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট রণতরি ও একটি মেরিন ইউনিট মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। এটিকে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলার প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৫. আইএইএর ধারণায় ইরানের কাছে কত ইউরেনিয়াম ছিল?
২০২৫ সালের জুনের হামলার আগে সংস্থাটির ধারণা ছিল, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম আছে। পারমাণবিক বোমার জন্য ইউরেনিয়াম ৯০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ করতে হয়।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- জমির দলিল তুলতে কত টাকা লাগে? জেনে নিন খরচের হিসাব
- একই জমির মালিক দুইজন? সত্যতা যাচাই করবেন যেভাবে
- আজ ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট সোনা ও রুপার দাম কত
- আজকের স্বর্ণের দাম কত: ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট সোনার দাম
- আজকের সোনার দাম কত: ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট সোনা ও রুপার দাম
- OPPO Reno 17 Pro: লঞ্চ কবে, দাম কত ও কী থাকছে নতুন ফিচারে?
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ১৮টি দেশের টাকার মান
- Pulsar F250-এ ২০ হাজার টাকা ছাড়, N160 ও 150-এ উপহার
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ১৯টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- Yamaha FZS V5 Hybrid-এর দাম কত? ফিচার ও মাইলেজ জানুন
- Royal Enfield Himalayan 750-এর দাম ও লঞ্চ নিয়ে যা জানা গেল
- আজ প্রতি ভরি ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট সোনার দাম কত