জমির খাজনা অনলাইনে দেওয়ার নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর দিতে এখন আর সরাসরি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। জমির মালিক নিজেই সরকারি ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে খতিয়ান যুক্ত করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে সেই তথ্য যাচাই ও অনুমোদন করা হলে অনলাইনে কর পরিশোধের সুযোগ পাওয়া যায়। টাকা জমা দেওয়ার পর ডিজিটাল দাখিলাও সংগ্রহ করা যায়। ফলে বাড়িতে বসেই জমির বকেয়া ও চলতি বছরের খাজনা পরিশোধ করা সম্ভব।
বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত পোর্টাল ldtax.gov.bd ব্যবহার করে এই সেবা পাওয়া যায়। তবে অনলাইনে খাজনা দিতে হলে আগে কিছু তথ্য ও কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে। নিবন্ধন, জমির হোল্ডিং যুক্ত করা, অনুমোদন এবং পেমেন্ট—প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে সম্পন্ন করলেই প্রক্রিয়াটি শেষ হবে।
অনলাইনে জমির খাজনা দিতে যা প্রয়োজন
ভূমি উন্নয়ন কর পোর্টালে জমির হোল্ডিং নিবন্ধনের জন্য কয়েকটি তথ্য হাতের কাছে রাখতে হবে। সরকারি পোর্টালে উল্লেখিত প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র হলো—
সচল মোবাইল নম্বর।
জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর।
জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা জন্মতারিখ।
জমির দাখিলা অথবা নামজারি বা খারিজ খতিয়ানের তথ্য।
নিবন্ধনের সময় দেওয়া তথ্যের সঙ্গে জমির রেকর্ডের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। ভুল তথ্য দিলে খতিয়ান যুক্ত করা বা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।
জমির খাজনা অনলাইনে দেওয়ার নিয়ম
অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করতে হয়। নিচে সহজভাবে তা তুলে ধরা হলো।
১. সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
প্রথমে মোবাইল বা কম্পিউটারের ব্রাউজার থেকে ভূমি উন্নয়ন করের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। ঠিকানাটি হলো: https://ldtax.gov.bd
ওয়েবসাইটে প্রবেশের পর ‘নিবন্ধন করুন’ অপশনে ক্লিক করতে হবে। আগে থেকে অ্যাকাউন্ট খোলা থাকলে নতুন করে নিবন্ধন না করে লগইন করতে পারবেন।
২. নাগরিক অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন
নিবন্ধন পৃষ্ঠায় প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এ পর্যায়ে সচল মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর এবং এনআইডিতে উল্লেখিত জন্মতারিখ দিতে হবে।
নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন করে নিবন্ধন শেষ করতে হবে। নিবন্ধনের সময় নিজের সঠিক তথ্য ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তী সময়ে জমির খতিয়ান যুক্ত করার ক্ষেত্রে এসব তথ্য কাজে লাগবে।
৩. জমির খতিয়ান যুক্ত করুন
অ্যাকাউন্ট তৈরি হলে লগইন করে নিজের জমির খতিয়ান বা হোল্ডিং যুক্ত করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট জমির অবস্থান ও রেকর্ডের তথ্য দিতে হবে।
সাধারণত জমির বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন বা মৌজা এবং খতিয়ানসংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন হয়। জমির দাখিলা বা খারিজ খতিয়ান দেখে তথ্যগুলো পূরণ করলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা কমে।
একাধিক জমি থাকলে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুসারে প্রতিটি খতিয়ান বা হোল্ডিং যুক্ত করতে হবে। তথ্য জমা দেওয়ার আগে নাম, খতিয়ান নম্বর ও জমির অবস্থান ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
৪. খতিয়ান অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করুন
খতিয়ান যুক্ত করলেই সঙ্গে সঙ্গে খাজনা পরিশোধ করা যাবে না। জমির তথ্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাধ্যমে যাচাই ও সমন্বয় করে অনুমোদন করতে হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৩ এপ্রিল ২০২৩ সালের পরিপত্র অনুযায়ী, নাগরিক নিবন্ধন করে খতিয়ান যুক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যে হোল্ডিং যাচাই ও সমন্বয় করে অনুমোদন দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
অনুমোদন সম্পন্ন হলে নিবন্ধিত প্রোফাইল থেকে অনলাইনে কর পরিশোধ করা যাবে। খতিয়ান অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত পেমেন্টের সুযোগ না পেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
৫. বকেয়া ও চলতি বছরের খাজনা দেখুন
খতিয়ান অনুমোদিত হওয়ার পর অ্যাকাউন্টে লগইন করে সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংয়ের বিস্তারিত তথ্য দেখতে হবে। সেখানে জমির বিপরীতে কত টাকা ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া রয়েছে এবং চলতি বছরের জন্য কত টাকা দিতে হবে, তা যাচাই করতে পারবেন।
টাকা জমা দেওয়ার আগে হোল্ডিংয়ের তথ্য ও করের পরিমাণ ভালোভাবে মিলিয়ে নিন। জমির ব্যবহার, শ্রেণি ও রেকর্ড অনুযায়ী কর নির্ধারিত হতে পারে।
৬. অনলাইনে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন
হোল্ডিংয়ের বিস্তারিত অংশ থেকে ‘অনলাইন পেমেন্ট’ অপশন নির্বাচন করতে হবে। এরপর প্রদর্শিত নির্দেশনা অনুসারে পরিশোধযোগ্য টাকার পরিমাণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে পেমেন্ট গেটওয়েতে যেতে হবে।
সেখানে প্রদর্শিত অনুমোদিত পেমেন্ট মাধ্যম থেকে সুবিধাজনক একটি মাধ্যম বেছে নিয়ে লেনদেন সম্পন্ন করতে হবে। পেমেন্টের আগে মোট টাকার পরিমাণ এবং নির্বাচিত হোল্ডিং আবার যাচাই করে নেওয়া ভালো।
আরও পড়ুন:
Namjari Status Check: নামজারি হয়েছে কি না অনলাইনে দেখবেন যেভাবে
ওয়ারিশি জমি নিজের নামে নিতে কী করবেন? জানুন নিয়ম
লেনদেন সফল হলে পেমেন্টের তথ্য সিস্টেমে সংরক্ষিত হবে। কোনো কারণে টাকা কেটে নেওয়ার পরও পেমেন্টের অবস্থা নিশ্চিত না হলে একই টাকা আবার জমা দেওয়ার আগে লেনদেনের তথ্য যাচাই করুন।
৭. অনলাইন দাখিলা সংগ্রহ করুন
খাজনা পরিশোধের পর সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংয়ের দাখিলা বা রসিদ সংগ্রহ করতে হবে। এটি অনলাইন প্রোফাইল থেকে দেখা ও ডাউনলোড করার সুযোগ থাকে।
দাখিলায় জমির তথ্য, করের পরিমাণ এবং পরিশোধের বিবরণ থাকে। ভবিষ্যতে জমি কেনাবেচা, নামজারি বা অন্যান্য ভূমিসেবা গ্রহণের সময় এ রসিদ প্রয়োজন হতে পারে। তাই দাখিলার ডিজিটাল কপি সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনে প্রিন্ট করে রাখা ভালো।
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকেও কি খাজনা দেওয়া যায়?
যাঁদের নিজের স্মার্টফোন বা কম্পিউটার নেই, কিংবা অনলাইনে নিবন্ধন করতে সমস্যা হয়, তাঁরাও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে পারবেন। এ জন্য ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের (ইউডিসি) সহায়তা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, জন্মতারিখ ও খতিয়ানের তথ্য দিয়ে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে নিবন্ধন এবং ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের সুবিধা চালু রয়েছে।
তবে সেন্টারের সহায়তা নিলেও নিজের জমির তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া জরুরি। সেবার জন্য নির্ধারিত সরকারি কর ও সহায়তা ফি সম্পর্কে আগে জেনে নিতে হবে। সরকার নির্ধারিত অর্থের অতিরিক্ত টাকা দেওয়া উচিত নয়।
একাধিক মালিকের জমির খাজনা কীভাবে দেবেন?
যৌথ মালিকানার জমির ক্ষেত্রে একজন মালিক নিজের অংশের খাজনা আলাদাভাবে দিতে চাইলে বিষয়টি একটু ভিন্ন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে নামজারি বা মিউটেশনের মাধ্যমে পৃথক হোল্ডিং তৈরি করতে হবে।
অর্থাৎ, যৌথ খতিয়ানে থাকা জমির একজন মালিক ইচ্ছা করলেই পুরো হোল্ডিং থেকে নিজের অংশের কর আলাদা করে দিতে পারবেন না। নিজের অংশের জন্য পৃথক হোল্ডিং তৈরি হওয়ার পর সেই অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে হবে।
অগ্রিম কত বছরের জমির খাজনা দেওয়া যায়?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৩ এপ্রিল ২০২৩ সালের পরিপত্র অনুযায়ী, কোনো জমির মালিক বকেয়া ও চলতি বছরের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করার পর পরবর্তী সর্বোচ্চ তিন বছরের কর অগ্রিম দিতে পারবেন।
তবে অগ্রিম কর দেওয়া থাকলেও জমির ব্যবহার পরিবর্তন বা সরকারি নির্দেশনার কারণে করের পরিমাণ বেড়ে গেলে অতিরিক্ত অর্থ বকেয়া হিসেবে পরিশোধ করতে হতে পারে।
অনলাইনে খাজনা দিতে সমস্যা হলে কোথায় যোগাযোগ করবেন?
নিবন্ধন, খতিয়ান যুক্ত করা, অনুমোদন বা পেমেন্টের সময় কোনো সমস্যা হলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্রে যোগাযোগ করা যায়। এ জন্য ১৬১২২ নম্বরে ফোন করতে পারবেন।
এ ছাড়া জমির তথ্য বা হোল্ডিং অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
জমির খাজনা দেওয়ার আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
অনলাইনে কর পরিশোধের সময় কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, সরকারি ওয়েবসাইটের ঠিকানা যাচাই করে তবেই ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, জমির খতিয়ান ও মালিকানার তথ্যের সঙ্গে নিবন্ধনের তথ্য মিলিয়ে নিতে হবে। তৃতীয়ত, পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার পর দাখিলা সংগ্রহ না করে প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা জমির কর পরিশোধের প্রমাণ। এটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন হলেও শুধু দাখিলা থাকলেই জমির মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না। জমির মালিকানা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দলিল ও ভূমি রেকর্ডও গুরুত্বপূর্ণ।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. জমির খাজনা অনলাইনে দিতে কোন ওয়েবসাইটে যেতে হবে?
বাংলাদেশ সরকারের ভূমি উন্নয়ন করের সরকারি ওয়েবসাইট ldtax.gov.bd-এ গিয়ে নাগরিক নিবন্ধন করে জমির খতিয়ান যুক্ত করতে হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর অনলাইনে কর দেওয়া যাবে।
২. অনলাইনে জমির খাজনা দিতে কী কী তথ্য প্রয়োজন?
সচল মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, এনআইডিতে থাকা জন্মতারিখ এবং জমির দাখিলা বা খারিজ খতিয়ানের তথ্য প্রয়োজন।
৩. খতিয়ান যুক্ত করার কত দিনের মধ্যে অনুমোদন পাওয়া যায়?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৩ এপ্রিল ২০২৩ সালের পরিপত্র অনুযায়ী, খতিয়ান যুক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যে হোল্ডিং যাচাই ও সমন্বয় করে অনুমোদন দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
৪. ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে কি জমির খাজনা দেওয়া যায়?
হ্যাঁ। জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, জন্মতারিখ ও খতিয়ানের তথ্য দিয়ে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের সহায়তায় নিবন্ধন এবং ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা যায়।
৫. জমির খাজনা দেওয়ার পর কীভাবে রসিদ পাওয়া যাবে?
অনলাইনে পেমেন্ট সফল হলে সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংয়ের দাখিলা বা রসিদ অনলাইন প্রোফাইল থেকে সংগ্রহ ও ডাউনলোড করা যায়। ভবিষ্যতের প্রয়োজনে এটি সংরক্ষণ করে রাখা উচিত।
তানভির ইসলাম/