শীর্ষ ২০ খেলাপির দখলে শেয়ারবাজারের ব্যাংকের ১০ হাজার কোটি টাকা
মাত্র ছয় মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ আদায়ের সুযোগ থাকলেও বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পিএলসি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ছিল ৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। অথচ এই সময়ে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। ঋণ উদ্ধারে এমন দুর্বল অগ্রগতির মধ্যে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে দেখা দিয়েছে বিপুল মূলধন ঘাটতি ও বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘সুপারভাইজরি ডাটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স’ বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রূপালী ব্যাংকের এই আর্থিক চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত না আসায় ব্যাংকটির আর্থিক ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
মোট ঋণের প্রায় ৩৮ শতাংশই খেলাপি
ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে ঋণের গুণগত মানের পরিসংখ্যানে। ২০২৬ সালের জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৭ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৮০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মোট ঋণের প্রায় ৩৭.৯৮ শতাংশ এখন খেলাপি।
এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের মূলধন অবস্থায়ও। জুন শেষে প্রকৃত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা।
ঋণ আদায়ের আগের পরিসংখ্যানের সঙ্গে চলতি বছরের পরিস্থিতির তুলনা করলেও বড় ব্যবধান দেখা যায়। ২০২৪ সালে শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে ৪৫.৭০ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ৩৬১ কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছিল। অথচ ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা।
ব্যাংকটির চলতি বছরের মোট ঋণ আদায়ের লক্ষ্য ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা হলেও জুন পর্যন্ত সব মিলিয়ে আদায় হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা।
বড় ঋণের তালিকায় বেক্সিমকো, ক্রনি ও সুগার করপোরেশন
রূপালী ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রয়েছে কয়েকটি বড় ঋণগ্রহীতার কাছে। শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকায় সবচেয়ে বেশি পাওনা বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে, যার পরিমাণ ৯৯৪ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা ৯০৮ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ক্রনি গ্রুপের কাছে ৮৭২ কোটি, জুট টেক্সটাইল মিলসের কাছে ৭২৪ কোটি এবং নূরজাহান গ্রুপের কাছে ৬৩০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।
অন্যান্য বড় ঋণগ্রহীতার মধ্যে এইচএস কম্পোজিটের কাছে ৬২০ কোটি, মাদারীপুর স্পিনিংয়ের কাছে ৬১৮ কোটি, বদর স্পিনিংয়ের কাছে ৬০৪ কোটি, ডলি কনস্ট্রাকশনের কাছে ৫০৬ কোটি এবং সাত্তার গ্রুপের কাছে ৪০৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ঋণ পুনর্গঠন বা রেসিডিউলিংয়ের মাধ্যমে বসুন্ধরা পেপার মিলস, ইউনিভার্সেল মেডিকেল, বেনীটেক্স ও জুট টেক্সটাইল মিলস সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
ঋণ বাদ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু টাকা ফিরছে সামান্য
অনাদায়ী ঋণের চাপ কমাতে রূপালী ব্যাংকের হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ অবলোপন বা রাইট-অফ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে ৫১৮ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ৪৯৪ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আরও ৪৯০ কোটি টাকা ব্যালান্স শিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে ঋণ অবলোপনের তুলনায় সংশ্লিষ্ট খাত থেকে অর্থ উদ্ধারের পরিমাণ অত্যন্ত কম। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অবলোপন করা ঋণ থেকে ব্যাংকটি আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
আইনি প্রক্রিয়াতেও আটকে রয়েছে বিপুল অর্থ। অর্থ ঋণ আদালতে রূপালী ব্যাংকের ১২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার ২ হাজার ৫৯৬টি মামলা এখনো ঝুলে আছে। এসব মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা থাকায় ঋণের অর্থ পুনরুদ্ধারের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ছয় মাস শেষে পরিচালন লোকসান ২৩৩ কোটি টাকা
খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ এবং আর্থিক চাপের কারণে ব্যাংকটির আয়-ব্যয়ের অবস্থাও দুর্বল হয়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৩৩ কোটি টাকা। একই সময়ে নিট লোকসান হয়েছে ৩৯৭ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বড় অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী থাকলে ব্যাংকের হাতে ব্যবহারযোগ্য অর্থের সংকট তৈরি হয়। এতে নতুন করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়। পাশাপাশি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা শেয়ারবাজারে এর শেয়ারের দর এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কৃষিঋণ বিতরণে অবশ্য লক্ষ্য ছাড়িয়েছে ব্যাংকটি
ব্যাংকটির আর্থিক সংকটের মধ্যেও কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে অগ্রগতি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রূপালী ব্যাংক ৪০০ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০৫ কোটি টাকা। দুটি অর্থবছরেই কৃষিঋণ বিতরণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারিতে রূপালী ব্যাংক
বিপুল খেলাপি ঋণ ও দুর্বল আদায় পরিস্থিতি সামাল দিতে রূপালী ব্যাংকের ওপর তদারকি জোরদার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে ‘প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন’ (পিসিএ) কাঠামোর আওতায় কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে শীর্ষ ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে নগদ অর্থ আদায়ের কার্যক্রম জোরদার করতে বলা হয়েছে। ব্যাংকটির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনাদায়ী ঋণ উদ্ধার, মূলধন ঘাটতি সামাল দেওয়া এবং লোকসানের চাপ কমিয়ে আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে কত টাকা পাওনা রয়েছে?
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ছিল ৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা।
২. ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে কত টাকা আদায় হয়েছে?
জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা।
৩. রূপালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ কত?
২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১৯ হাজার ৮০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৭.৯৮ শতাংশ।
৪. রূপালী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় ঋণখেলাপি কোন প্রতিষ্ঠান?
বেক্সিমকো গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা ৯৯৪ কোটি টাকা।
৫. রূপালী ব্যাংকের জুন শেষে লোকসান কত হয়েছে?
২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান ২৩৩ কোটি এবং নিট লোকসান ৩৯৭ কোটি টাকা হয়েছে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- HSC Result 2026প্রকাশ: সহজে ঘরে বসে মোবাইলে রেজাল্ট দেখুন এখানে
- আজ এইচএসসি রেজাল্ট ২০২৬: অনলাইনে মার্কশিটসহ ফল দেখবেন যেভাবে
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ৬টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- ওয়ারিশ সনদ দিয়ে জমি নামজারি করবেন যেভাবে, জেনে নিন নিয়ম
- আজ HSC Result 2026: অনলাইনে মার্কশিটসহ ফল দেখবেন যেভাবে
- ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে ৪ কোম্পানি