ঢাকা, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

দলিল আছে, খতিয়ানে নাম নেই? কী করবেন এখন

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০১ ১৬:২২:০০
দলিল আছে, খতিয়ানে নাম নেই? কী করবেন এখন

জমির দলিল নিজের কাছে, কিন্তু সর্বশেষ খতিয়ানে এখনো আগের মালিকের নাম—এমন পরিস্থিতিতে শুধু দলিল দেখিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। আবার খতিয়ানে নাম না থাকলেই দলিলের ভিত্তিতে পাওয়া অধিকার শেষ হয়ে যায়, এমনটিও নয়। জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে দলিলের ধারাবাহিকতা, বিক্রেতার স্বত্ব, জমির দাগ-খতিয়ান এবং দখলের তথ্য যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী নামজারি বা রেকর্ড সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশে জমি হস্তান্তরের পর নতুন মালিকের নামে সরকারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করার প্রক্রিয়াই নামজারি বা মিউটেশন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, খতিয়ান হলো জমির স্বত্ব ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের রেকর্ড; এটি নিজে মালিকানার দলিল নয়। অন্যদিকে, নামজারির মাধ্যমে হস্তান্তর বা উত্তরাধিকারের কারণে মালিকের নাম রেকর্ডে যুক্ত করা হয়।

দলিল থাকলেও খতিয়ানে নাম না থাকার কারণ কী?

জমি কেনার পর দলিল রেজিস্ট্রি হলেও বিভিন্ন কারণে খতিয়ানে নতুন মালিকের নাম নাও উঠতে পারে। যেমন, দলিল রেজিস্ট্রির পর নামজারির আবেদন করা হয়নি, আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ঘাটতি আছে অথবা জমির রেকর্ডে দাগ, পরিমাণ কিংবা মালিকানার ধারাবাহিকতা নিয়ে অসংগতি দেখা দিয়েছে।

আবার কোনো জমি একাধিকবার হস্তান্তর হলে আগের মালিকদের দলিল ও খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হয়। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশদের অংশ এবং বণ্টনের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধু সর্বশেষ দলিল হাতে থাকলেই পুরো মালিকানা-ইতিহাস পরিষ্কার হয়ে যায় না।

প্রথমে যাচাই করুন দলিলের বিক্রেতার মালিকানা

খতিয়ানে নাম না থাকার বিষয়টি সামনে এলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত দলিলের মাধ্যমে যিনি জমি বিক্রি করেছেন, তাঁর ওই জমি বিক্রির আইনগত অধিকার ছিল কি না তা যাচাই করা।

এ জন্য দেখতে হবে—

- বিক্রেতার নামে সর্বশেষ প্রযোজ্য খতিয়ান ছিল কি না।

- উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হলে তাঁর পূর্বসূরির নামে খতিয়ান এবং উত্তরাধিকারের প্রমাণ আছে কি না।

- বিক্রেতা কীভাবে জমির মালিক হয়েছেন, সেই আগের দলিলগুলো আছে কি না।

- দলিলে উল্লেখ করা মৌজা, জেএল নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও শ্রেণির সঙ্গে খতিয়ানের তথ্য মেলে কি না।

- একই জমি অন্য কারও কাছে বিক্রি, দান বা হস্তান্তর করা হয়েছে কি না।

এখানে একটি আইনি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৫৩সি ধারায় উত্তরাধিকার ছাড়া অন্যভাবে মালিক হওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে সর্বশেষ খতিয়ানে তাঁর নিজের নাম থাকার বিধান রয়েছে। উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হলে তাঁর নিজের অথবা পূর্বসূরির নাম খতিয়ানে থাকার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮

-এর ৫২এ ধারায় বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রির সময় প্রয়োজনীয় খতিয়ান-সংক্রান্ত তথ্য সংযুক্ত থাকার বিধান রয়েছে। তাই বিক্রেতার নাম খতিয়ানে না থাকার বিষয়টি উপেক্ষা না করে দলিলটি কীভাবে ও কোন মালিকানার ভিত্তিতে রেজিস্ট্রি হয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি।

নামজারি না হয়ে থাকলে কী করবেন?

দলিলের ভিত্তিতে জমি কেনার পরও যদি নিজের নামে নামজারি না হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট জমির উপজেলা বা সার্কেল ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে নামজারির উদ্যোগ নিতে হবে। অনলাইনে আবেদন করার ব্যবস্থাও রয়েছে।

নামজারির জন্য সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে—

- রেজিস্ট্রি করা দলিলের কপি।

- আগের মালিকানার দলিল বা স্বত্বের ধারাবাহিকতার কাগজপত্র।

- সংশ্লিষ্ট খতিয়ান বা পর্চা।

- জমির মৌজা, জেএল নম্বর ও দাগের তথ্য।

- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য।

- প্রয়োজন অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের প্রমাণ এবং অন্যান্য সহায়ক কাগজপত্র।

জমির ধরন, মালিকানা অর্জনের পদ্ধতি এবং আবেদনের পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজ চাইতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের নির্দেশনা মিলিয়ে নেওয়া ভালো।

নামজারি আবেদন করা যায় সরকারি ই-নামজারি ব্যবস্থার মাধ্যমে: ই-নামজারি পোর্টাল। ভূমি মন্ত্রণালয়+1

আবেদন করার পর আপত্তি বা কাগজপত্রের ঘাটতি জানালে?

নামজারি আবেদন জমা দেওয়ার পর ভূমি অফিস দলিল ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করতে পারে। কোনো কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে বা তথ্যের মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেলে তা নির্দিষ্ট করে জানানো হতে পারে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় তথ্য বা কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে প্রথম আদেশে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে আবেদনকারীকে সাধারণত সাত কার্যদিবস অথবা যুক্তিসংগত সময় দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘাটতি পূরণ না হলে পরবর্তী আদেশে আবেদন নামঞ্জুর হতে পারে। তবে পরে প্রয়োজনীয় কাগজ পাওয়া গেলে নামজারি কার্যক্রম পুনরায় চালুর সুযোগের কথাও নির্দেশনায় রয়েছে।

তাই আবেদন নামঞ্জুর হলে শুধু ফলাফল দেখে থেমে না থেকে আদেশের কপি সংগ্রহ করতে হবে। সেখানে কী কারণে আবেদন গ্রহণ করা হয়নি, কোন কাগজ বা তথ্য প্রয়োজন এবং সমস্যাটি সংশোধনযোগ্য কি না—তা বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।

দলিল ও খতিয়ানে দাগ বা জমির পরিমাণ না মিললে?

দলিলে এক দাগ নম্বর, আর খতিয়ানে অন্য দাগ নম্বর; কোথাও জমির পরিমাণে পার্থক্য—এমন সমস্যা থাকলে সরাসরি নামজারি আবেদন করলেই সমাধান নাও হতে পারে।

প্রথমে সংশ্লিষ্ট মৌজার সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস—যে জরিপের খতিয়ান প্রযোজ্য, সেগুলো এবং নকশা মিলিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনে আগের দলিল ও জমির মালিকানা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতাও পরীক্ষা করতে হবে।

যদি দলিলের লেখায় ভুল থাকে, তাহলে সেটি কী ধরনের ভুল এবং আইনগতভাবে কীভাবে সংশোধন করা যায়, তা নির্ধারণ জরুরি। আর যদি জমির পরিচয়, সীমানা বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকে, তাহলে কেবল নামজারির আবেদন দিয়ে সেই বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

উত্তরাধিকারসূত্রে জমি হলে করণীয় আলাদা হতে পারে

জমির মালিক মারা যাওয়ার পর উত্তরাধিকারীরা জমি পেলেও খতিয়ানে মৃত ব্যক্তির নাম থেকে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার সনদ, মৃত্যুর প্রমাণ, পূর্ববর্তী খতিয়ান ও মালিকানার কাগজপত্র যাচাই করে নামজারির ব্যবস্থা করতে হয়।

একাধিক ওয়ারিশ থাকলে প্রত্যেকের আইনগত অংশ বিবেচনায় নিতে হবে। উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে বণ্টনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩বি ধারায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি আপসের মাধ্যমে ভাগ করার পর বণ্টননামা প্রস্তুত, স্বাক্ষর ও রেজিস্ট্রেশনের বিধান রয়েছে; সেই দলিলের ভিত্তিতে খতিয়ান সংশোধনের কথা বলা হয়েছে।

নামজারি না হলে কি দলিলের মালিকানা বাতিল হয়ে যায়?

শুধু খতিয়ানে নাম না থাকার কারণে কোনো রেজিস্ট্রি করা দলিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তবে দলিলটি বৈধ কি না, বিক্রেতার মালিকানা ছিল কি না এবং জমিটি আইন অনুযায়ী হস্তান্তরযোগ্য ছিল কি না, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে বিক্রেতার স্বত্বে ঘাটতি, একই জমি একাধিকবার বিক্রি, জাল দলিল, ভুল দাগ বা জমির পরিমাণ নিয়ে বিরোধ থাকলে বিষয়টি জটিল হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দলিল, খতিয়ান, নকশা ও আগের মালিকানার কাগজপত্র নিয়ে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে স্বত্ব বা সংশ্লিষ্ট বিরোধের নিষ্পত্তি করতে হতে পারে।

জমি নিয়ে ঝুঁকি এড়াতে যে কাজগুলো করবেন

দলিল হাতে পাওয়ার পর নামজারি ও ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের বিষয়টি ফেলে রাখা ঠিক নয়। পাশাপাশি জমির বাস্তব দখল, সীমানা, দাগ নম্বর এবং ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন।

মনে রাখতে হবে, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ বা নামজারি খতিয়ান একা মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আবার দলিল থাকলেই বিক্রেতার আগের স্বত্বের ত্রুটি দূর হয়ে যায় না। তাই জমি কেনার আগে ও পরে—দুই সময়েই দলিলের ধারাবাহিকতা এবং সরকারি রেকর্ড মিলিয়ে দেখা সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. দলিল আছে কিন্তু খতিয়ানে নাম নেই—তাহলে কি জমির মালিকানা থাকবে?

শুধু খতিয়ানে নাম না থাকার কারণে দলিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। তবে দলিলের বৈধতা, বিক্রেতার মালিকানা এবং জমি হস্তান্তরের আইনগত শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

২. দলিল রেজিস্ট্রি করার পর কি আলাদাভাবে নামজারি করতে হয়?

হ্যাঁ, সাধারণভাবে দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের পর নতুন মালিকের নামে ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের জন্য নামজারি করতে হয়।

৩. নামজারির আবেদন কোথায় করতে হবে?

সরকারি ই-নামজারি পোর্টাল অথবা সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা সার্কেল ভূমি অফিসের মাধ্যমে আবেদন করা যায়।

৪. নামজারির আবেদন বাতিল হলে কী করবেন?

প্রথমে নামঞ্জুরের লিখিত আদেশ সংগ্রহ করে কারণ জানতে হবে। কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করে নির্দেশনা অনুযায়ী পুনরায় আবেদন বা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

৫. খতিয়ানে নাম না থাকলে কি জমি বিক্রি করা যাবে?

জমি বিক্রির ক্ষেত্রে সর্বশেষ খতিয়ান ও মালিকানার শর্ত আইন অনুযায়ী পূরণ করতে হয়। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৫৩সি ধারায় এ বিষয়ে বিধান রয়েছে। তাই খতিয়ানে নিজের নাম না থাকলে বিক্রির আগে আইনগত অবস্থান যাচাই করা জরুরি।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: