আপনার জমির দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে
জমি কেনার পর হাতে দলিলের কপি পেলেই সেটি আইনগতভাবে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল জমা দেওয়া, রেজিস্ট্রির জন্য গ্রহণ করা এবং বালাম বইয়ে নকল ও প্রয়োজনীয় রেকর্ড সম্পন্ন করা এক বিষয় নয়। দলিলটি সত্যিই নিবন্ধিত হয়েছে কি না নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড যাচাই করতে হবে। এ জন্য দলিল নম্বর, রেজিস্ট্রির সাল, ক্রেতা-বিক্রেতার নাম এবং বালাম বইয়ের তথ্য মিলিয়ে দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে জমির দলিল নিবন্ধনের সরকারি রেকর্ড সংরক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। তাই কোনো দলিল নিয়ে সন্দেহ থাকলে শুধু কাগজে থাকা সিল, স্বাক্ষর বা রসিদের ওপর নির্ভর না করে ওই অফিসের সূচিবহি ও বালাম বই পরীক্ষা করাই নির্ভরযোগ্য উপায়।
প্রথমে বুঝুন, দলিল গ্রহণ আর রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়া এক নয়
অনেকেই মনে করেন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল জমা দিয়ে রসিদ পেলেই রেজিস্ট্রির কাজ শেষ। বাস্তবে প্রক্রিয়াটি আরও কয়েক ধাপে সম্পন্ন হয়।
দলিল দাখিলের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই করেন। প্রযোজ্য ফি ও শুল্ক পরিশোধ এবং নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে দলিল গ্রহণ করা হয়। এরপর দলিলের অনুলিপি বালাম বা ভলিউম বইয়ে লিপিবদ্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট সূচিবহিতে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার কাজ থাকে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের প্রকাশিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী, বালাম বইয়ে দলিলের অনুলিপি প্রস্তুত এবং সাব-রেজিস্ট্রারের প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়াকে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই শুধু জমা দেওয়ার রসিদ হাতে থাকলেই চূড়ান্ত নিবন্ধন নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না।
১. দলিলের শেষ পৃষ্ঠার তথ্য মিলিয়ে দেখুন
মূল দলিল হাতে থাকলে প্রথমেই এর শেষ পৃষ্ঠার উল্টো দিক পরীক্ষা করুন। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর সেখানে সাধারণত দলিলটি কোন সালে, কত নম্বর বালাম বইয়ে এবং কত পৃষ্ঠা থেকে কত পৃষ্ঠা পর্যন্ত নকল করা হয়েছে, সেই তথ্য উল্লেখ থাকে। সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরও থাকার কথা।
এই তথ্যগুলো দলিলের নিবন্ধনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। এগুলো লিখে রাখুন অথবা প্রয়োজন হলে ছবি তুলে সংরক্ষণ করুন। পরে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে বালাম বইয়ের রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারবেন।
তবে কেবল সিল বা স্বাক্ষর দেখেই দলিলের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া উচিত নয়। সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।
২. সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ করুন
যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধনের জন্য দাখিল বা রেজিস্ট্রি করা হয়েছে, সেই অফিসেই যাচাইয়ের আবেদন করতে হবে। সাধারণত দলিলের নম্বর, রেজিস্ট্রির সাল, দাতা ও গ্রহীতার নাম এবং জমির পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে রেকর্ড খুঁজে দেখা যায়।
অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে দলিলের তথ্য জানিয়ে সূচিবহি তল্লাশি ও বালাম বই পরিদর্শনের আবেদন করতে পারেন। প্রয়োজনীয় ফি থাকলে নির্ধারিত নিয়মে তা পরিশোধ করতে হবে।
দলিলের নম্বর বা বালাম বইয়ের তথ্য জানা না থাকলেও অনুসন্ধানের সুযোগ থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতার নাম, মৌজার নাম, জমির দাগ নম্বর এবং সম্ভাব্য রেজিস্ট্রির সাল জানালে রেকর্ড খুঁজতে সুবিধা হয়।
৩. সূচিবহিতে দলিলের তথ্য খুঁজুন
দলিল নিবন্ধনের পর সংশ্লিষ্ট তথ্য সূচিবহিতে সংরক্ষণ করা হয়। সাধারণত পক্ষগুলোর নাম এবং জমির মৌজার মতো তথ্য ধরে সূচি তৈরি করা হয়। ফলে মূল দলিল হাতে না থাকলেও সূচিবহি তল্লাশ করে দলিলের অস্তিত্ব সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব।
তল্লাশের সময় কয়েকটি বিষয় মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন—
দলিলের নম্বর ও নিবন্ধনের সাল
বিক্রেতা বা দাতার নাম
ক্রেতা বা গ্রহীতার নাম
জমির মৌজা ও দাগ নম্বর
জমির পরিমাণ ও অন্যান্য পরিচয়
একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারেন। তাই শুধু নাম মিলে গেলেই কোনো দলিলকে নিজের দলিল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। জমির পরিচয় ও অন্যান্য তথ্যও মিলিয়ে দেখতে হবে।
৪. বালাম বইয়ের সঙ্গে মূল দলিল মিলিয়ে নিন
দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো বালাম বইয়ের রেকর্ড পরীক্ষা করা। মূল দলিলের শেষ পৃষ্ঠায় উল্লেখ থাকা বালাম বইয়ের নম্বর ও পৃষ্ঠার তথ্য ধরে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড খুঁজে দেখা যায়।
বালাম বইয়ে সংরক্ষিত দলিলের অনুলিপির সঙ্গে মূল দলিলের তথ্য মিলিয়ে দেখুন। বিশেষ করে ক্রেতা-বিক্রেতার পরিচয়, জমির মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, দলিলের ধরন এবং সম্পত্তির বিবরণে কোনো অমিল আছে কি না পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
শুধু দলিলের নম্বর মিলে গেলেই নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে সম্পত্তির বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের পরিচয়ও যাচাই করতে হবে।
৫. প্রয়োজনে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করুন
যাচাইয়ের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নথিগুলোর একটি হলো সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পাওয়া দলিলের সার্টিফায়েড কপি বা সরকারি নকল। রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৫৭ ধারার বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত নিয়ম ও ফি অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার ও সূচিবহি পরিদর্শন এবং নকল সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।
সার্টিফায়েড কপি পেতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে আবেদন করতে হবে। দলিলের নম্বর, সাল, পক্ষের নাম এবং জমির পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দিলে আবেদন প্রস্তুত করতে সুবিধা হয়। মূল দলিলের শেষ পৃষ্ঠায় বালাম বই ও পৃষ্ঠার তথ্য থাকলে সেটিও আবেদনের সময় উল্লেখ করতে পারেন।
সার্টিফায়েড কপি হাতে পাওয়ার পর মূল দলিলের সঙ্গে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলিয়ে নিন। কোনো অমিল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করুন।
মূল দলিল না থাকলে কী করবেন?
দলিল হারিয়ে গেলে বা কোনো কারণে মূল কপি হাতে না থাকলেও নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে সূচিবহি তল্লাশির আবেদন করতে পারেন।
দলিলের নম্বর ও সাল জানা থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়। এগুলো জানা না থাকলে ক্রেতা-বিক্রেতার নাম, জমির মৌজা, দাগ নম্বর এবং সম্ভাব্য নিবন্ধনের সময়কাল জানাতে হবে। রেকর্ড শনাক্ত করা গেলে নির্ধারিত নিয়মে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের আবেদন করা যায়।
তবে পুরোনো দলিল, অস্পষ্ট তথ্য বা রেকর্ড সংরক্ষণে জটিলতা থাকলে অনুসন্ধানে সময় লাগতে পারে।
অনলাইনে কি দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না দেখা যায়?
জমির নামজারি বা খতিয়ানের তথ্য অনলাইনে যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকলেও দলিলের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে কি না নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের পুরোনো ও নতুন দলিলের একটি উন্মুক্ত জাতীয় অনলাইন অনুসন্ধানব্যবস্থা রয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তাই শুধু অনলাইনে কোনো তথ্য না পেয়ে দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়নি বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। আবার কোনো অনলাইন কপি বা ছবি দেখেও নিবন্ধন নিশ্চিত করা যায় না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সরকারি রেকর্ড যাচাই করাই প্রয়োজন।
দলিল যাচাইয়ের সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
দলিল নিবন্ধিত হলেও জমির মালিকানা নিয়ে অন্য জটিলতা থাকতে পারে। যেমন, বিক্রেতার প্রকৃত মালিকানা, আগের দলিলের ধারাবাহিকতা, জমির দাগ ও খতিয়ানের তথ্য, একই জমি অন্য কারও কাছে বিক্রি হয়েছে কি না কিংবা সম্পত্তির ওপর কোনো দায় বা বিরোধ আছে কি না—এসব আলাদাভাবে পরীক্ষা করা দরকার।
আরও পড়ুন:
জমির খাজনা অনলাইনে দেওয়ার নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
ওয়ারিশি জমি নিজের নামে নিতে কী করবেন? জানুন নিয়ম
তাই জমি কেনার আগে বা কেনার পর যাচাইয়ের সময় নিচের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিন—
দলিলের নম্বর, সাল ও বালাম বইয়ের তথ্য মিলিয়ে দেখুন।
ক্রেতা ও বিক্রেতার নাম এবং পরিচয় যাচাই করুন।
মৌজা, খতিয়ান, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ মিলিয়ে নিন।
আগের মালিকানার দলিল ও মালিকানার ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করুন।
প্রয়োজনে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করুন।
বড় অঙ্কের লেনদেন বা মালিকানা নিয়ে সন্দেহ থাকলে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
নামজারি হয়েছে কি না, সেটিও আলাদাভাবে যাচাই করুন
দলিল রেজিস্ট্রি এবং নামজারি একই প্রক্রিয়া নয়। দলিল নিবন্ধনের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের বিষয়টি রেজিস্ট্রি অফিসে নথিভুক্ত হয়। অন্যদিকে নামজারির মাধ্যমে ভূমি প্রশাসনের রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
তাই দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে মানেই নামজারি সম্পন্ন হয়েছে—এমন নয়। আবার নামজারি থাকলেও দলিলের সত্যতা বা মালিকানার সব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। জমি কেনার ক্ষেত্রে দুই ধরনের রেকর্ডই যাচাই করা উচিত।
সব মিলিয়ে, জমির দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না নিশ্চিত হওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সূচিবহি ও বালাম বইয়ের তথ্য যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে সরকারি সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা। এতে শুধু দলিলের অস্তিত্ব নয়, দলিলে উল্লেখ থাকা জমি ও পক্ষগুলোর তথ্যও মিলিয়ে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।
FAQ
১. দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না কোথায় যাচাই করব?
যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধন করা হয়েছে, সেখানে সূচিবহি ও বালাম বইয়ের রেকর্ড পরীক্ষা করে যাচাই করতে পারবেন।
২. দলিল নম্বর না জানলে কি যাচাই করা যাবে?
চেষ্টা করা যায়। ক্রেতা-বিক্রেতার নাম, জমির মৌজা, দাগ নম্বর ও সম্ভাব্য নিবন্ধনের সাল দিয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসে অনুসন্ধানের আবেদন করতে পারেন।
৩. দলিলের শেষ পৃষ্ঠায় কোন তথ্য থাকলে রেজিস্ট্রির প্রমাণ পাওয়া যায়?
সাধারণত বালাম বইয়ের নম্বর, সাল, পৃষ্ঠা নম্বর এবং সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরসংবলিত তথ্য থাকে। তবে সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
৪. দলিলের সার্টিফায়েড কপি কোথা থেকে পাওয়া যায়?
সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নির্ধারিত নিয়ম ও ফি অনুসরণ করে আবেদন করলে রেজিস্টার বা বালাম বই থেকে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা যায়।
৫. দলিল রেজিস্ট্রি হলেই কি নামজারি হয়ে যায়?
না। দলিল নিবন্ধন ও নামজারি আলাদা প্রক্রিয়া। নিবন্ধনের পর ভূমি অফিসের রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, সেটিও আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
আল-মামুন/