শেয়ারবাজারের ১০ বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফায় বড় ধাক্কা
জ্বালানি ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচ, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এবং ক্রেতাদের দুর্বল চাহিদার প্রভাব পড়েছে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলে। চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ১৩টি বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে ছয়টির মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। একই সময়ে লোকসানে পড়েছে আরও চারটি প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে ১০টি কোম্পানির আর্থিক ফল নেতিবাচক ধারায় রয়েছে।
এই সময়ে কয়েকটি কোম্পানি মুনাফা ধরে রাখতে পারলেও বড় প্রতিষ্ঠানের আয় কমে যাওয়া এবং একাধিক কোম্পানির লোকসান বাজারের বহুজাতিক খাতের সামগ্রিক চিত্রকে চাপে ফেলেছে।
সিঙ্গারের লোকসান ছাড়িয়েছে ৭৭ কোটি টাকা
লোকসান করা চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বড় অঙ্কের লোকসান গুনেছে সিঙ্গার বাংলাদেশ। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে কোম্পানিটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আগের বছরের একই প্রান্তিকে এই অঙ্ক ছিল ৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে ৬১ শতাংশের বেশি।
কোম্পানিটির আয় ৭ শতাংশ বাড়লেও আর্থিক ফল ভালো হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজারে স্থবিরতা এবং ৭৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার নিট অর্থায়ন ব্যয় ব্যবসায় চাপ তৈরি করেছে।
এদিকে হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশ আগের বছরের একই প্রান্তিকে ৯২ লাখ টাকা মুনাফা করলেও এবার ২০ কোটি ৪১ লাখ টাকা লোকসান করেছে। আরএকে সিরামিকসের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৯ লাখ টাকা, যদিও আগের বছরের তুলনায় তা কমেছে। বাটা শুর ক্ষেত্রেও লোকসান কমেছে। আগের বছরের ১৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা থেকে কমে এবার প্রতিষ্ঠানটির লোকসান হয়েছে ৫ কোটি টাকা।
বিএটিবিসির মুনাফা কমেছে ৬৭ শতাংশ
মুনাফা করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবিসি) লিমিটেডের ফলে। আগের বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফা ছিল ৩০৫ কোটি ৪ লাখ টাকা। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমেছে ৬৭ শতাংশ। বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়াকে এ পতনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
একই সময়ে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের মুনাফা ৪৭ শতাংশ কমে ৬৩ কোটি ৯ লাখ টাকা হয়েছে। ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকায়।
লিন্ডে বাংলাদেশের মুনাফাও আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় ১৯ শতাংশ কমে ৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় নেমেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয়ের পাশাপাশি পণ্য বিতরণের খরচ বেড়ে যাওয়াকে এ অবস্থার কারণ হিসেবে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
অন্যদিকে, মারিকো ও গ্রামীণফোনের মুনাফায় বড় পরিবর্তন না হলেও আগের বছরের তুলনায় সামান্য কমেছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মারিকোর মুনাফা হয়েছে ১৫৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা। একই সময়ে গ্রামীণফোনের মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭৫০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বেড়েছে শিল্পের ব্যয়
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, তৃতীয় প্রান্তিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফল খারাপ হওয়ার পেছনে জ্বালানি সংকট বড় ভূমিকা রেখেছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে মহেশখালীর কাছে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়। এর প্রভাবে দেশে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। এর সঙ্গে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির খরচ বৃদ্ধিও এ চাপকে আরও বাড়িয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মূল্যায়ন, এসব কারণে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক কোম্পানি বিক্রি ও আয় ধরে রাখার পরও মুনাফা ধরে রাখতে পারেনি। ফলে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলে নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
১. চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কতটি বহুজাতিক কোম্পানির আর্থিক ফল নেতিবাচক হয়েছে?
ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ১৩টি বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে ছয়টির মুনাফা কমেছে এবং চারটি লোকসানে পড়েছে। সব মিলিয়ে ১০টি কোম্পানির আর্থিক ফল নেতিবাচক হয়েছে।
২. কোন বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা সবচেয়ে বেশি কমেছে?
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবিসি) লিমিটেডের মুনাফা সবচেয়ে বেশি কমেছে। আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় পতনের হার ৬৭ শতাংশ।
৩. তৃতীয় প্রান্তিকে সিঙ্গার বাংলাদেশের লোকসান কত হয়েছে?
জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সিঙ্গার বাংলাদেশের লোকসান হয়েছে ৭৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে লোকসান ছিল ৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
৪. কোন কোন বহুজাতিক কোম্পানি লোকসান করেছে?
সিঙ্গার বাংলাদেশ, হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশ, আরএকে সিরামিকস ও বাটা শু লোকসান করেছে।
৫. বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমার পেছনে কী কারণ রয়েছে?
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহের সংকট, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, ডিজেল জেনারেটরের ব্যবহার, উৎপাদন ও বিতরণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত জ্বালানি ব্যয় কোম্পানিগুলোর মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তানভির ইসলাম/