ঢাকা, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

জমি রেজিস্ট্রির আগে যে ১০টি বিষয় দেখে স্বাক্ষর করবেন

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০২ ১১:৪৮:৪৭
জমি রেজিস্ট্রির আগে যে ১০টি বিষয় দেখে স্বাক্ষর করবেন

জমি কেনার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো দলিলে স্বাক্ষর করার আগে প্রতিটি তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা। কারণ দলিলে জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান, পরিমাণ, সীমানা কিংবা বিক্রেতার মালিকানার তথ্যে ভুল থাকলে ভবিষ্যতে জমির দখল ও মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। শুধু দলিল লেখক বা বিক্রেতার কথায় ভরসা করে স্বাক্ষর না করে নিজের চোখে পুরো দলিল পড়ে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে দলিলের তফশিল, জমির নকশা, মূল্য এবং বিক্রেতার স্বত্বের প্রমাণ না মিলিয়ে স্বাক্ষর করলে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেও জমি বিক্রির দলিলে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য থাকা বাধ্যতামূলক। রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৫২এ ধারায় সর্বশেষ খতিয়ান, জমির শ্রেণি, মূল্য, সীমানাসহ নকশা, গত ২৫ বছরের মালিকানার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং বিক্রেতার স্বত্ব ও পূর্বে হস্তান্তর না করার বিষয়ে হলফনামার কথা বলা হয়েছে। তাই রেজিস্ট্রির আগে এসব তথ্য যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

১. বিক্রেতার পরিচয় ও মালিকানা নিশ্চিত করুন

যিনি জমি বিক্রি করছেন, তিনি প্রকৃত মালিক কি না—এটি প্রথমেই যাচাই করতে হবে। বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম, ছবি ও অন্যান্য পরিচয় দলিলের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। জমিটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হলে ওয়ারিশদের তথ্য এবং বিক্রেতার প্রাপ্য অংশও যাচাই করা জরুরি।

বিক্রেতা নিজে মালিক না হয়ে প্রতিনিধি বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে জমি বিক্রি করলে সেই ক্ষমতাপত্রের বৈধতা ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে। একাধিক মালিক থাকলে সবার সম্মতি ও আইনগত অংশের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

২. আগের দলিল ও মালিকানার ধারাবাহিকতা দেখুন

শুধু বর্তমান বিক্রেতার দলিল দেখেই জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়। তিনি কীভাবে জমির মালিক হয়েছেন, তার আগের মালিক কে ছিলেন এবং ধারাবাহিকভাবে জমিটি কীভাবে হস্তান্তর হয়েছে—সেসব তথ্য পরীক্ষা করতে হবে।

এ জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী মূল দলিল, বায়া দলিল, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড মিলিয়ে দেখুন। বিক্রেতার দলিলের তথ্য সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে না মিললে কারণ না জেনে স্বাক্ষর করবেন না।

৩. খতিয়ান, মৌজা ও দাগ নম্বর মিলিয়ে নিন

দলিলের তফশিল অংশে জমির পরিচয় দেওয়া থাকে। এখানে কয়েকটি তথ্য বিশেষভাবে যাচাই করা জরুরি—

জেলার নাম ও উপজেলার নাম।

সংশ্লিষ্ট মৌজার নাম ও জেএল নম্বর।

সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস খতিয়ান নম্বর—যেটি প্রযোজ্য।

দাগ নম্বর।

জমির শ্রেণি ও পরিমাণ।

জমির চারপাশের সীমানা।

দলিলে লেখা তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান ও মৌজা নকশার তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে। দাগ নম্বর বা জমির পরিমাণে অমিল থাকলে সেটিকে ছোটখাটো ভুল মনে করে এড়িয়ে যাবেন না।

৪. জমির পরিমাণ ও সীমানা সরেজমিনে যাচাই করুন

কাগজে যে জমি বিক্রির কথা লেখা আছে, বাস্তবে সেটিই দেখানো হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। দলিল, খতিয়ান ও মৌজা নকশার তথ্যের ভিত্তিতে একজন অভিজ্ঞ আমিন দিয়ে জমি মাপিয়ে নিতে পারেন।

বিশেষ করে জমির চার সীমানা, রাস্তার অবস্থান, প্রবেশপথ, পাশের জমির মালিক এবং বাস্তব দখল যাচাই করুন। দলিলে ১০ শতাংশ জমি লেখা থাকলেও বাস্তবে সীমানা অনুযায়ী সেই পরিমাণ পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত না হয়ে স্বাক্ষর করা উচিত নয়।

৫. জমির মূল্য ও পরিশোধের শর্ত পড়ুন

দলিলে জমির মোট মূল্য কত লেখা হয়েছে, তা ভালোভাবে যাচাই করুন। বিক্রেতাকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, কত টাকা বাকি রয়েছে এবং বাকি টাকা পরিশোধের কোনো শর্ত আছে কি না—এসব বিষয় দলিলে সঠিকভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

টাকা পরিশোধের পরিমাণ ও বাস্তব লেনদেনের মধ্যে অসংগতি থাকলে তা সংশোধন না করে স্বাক্ষর করবেন না। মূল্য পরিশোধের প্রমাণ হিসেবে ব্যাংক লেনদেনের রসিদ, পে-অর্ডার বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র সংরক্ষণ করাও ভালো।

৬. জমি আগে অন্য কারও কাছে বিক্রি হয়েছে কি না দেখুন

একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হলে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বিক্রেতার হলফনামা ও দলিলের বক্তব্যের পাশাপাশি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান করুন।

আরও পড়ুন:

দলিল আছে, খতিয়ানে নাম নেই? কী করবেন এখন

ওয়ারিশ সনদ দিয়ে জমি নামজারি করবেন যেভাবে, জেনে নিন নিয়ম

আপনার জমির দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে

জমির ওপর কোনো মামলা, নিষেধাজ্ঞা, বন্ধক, অধিগ্রহণের নোটিশ বা অন্য কোনো স্বত্বসংক্রান্ত দাবি আছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি। শুধু বিক্রেতার মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর করবেন না।

৭. দলিলের নকশা ও চার সীমানা পরীক্ষা করুন

রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী বিক্রয় দলিলের সঙ্গে জমির অবস্থান, অক্ষ ও সীমানা দেখানো নকশা থাকতে হয়। দলিলে সংযুক্ত নকশা এবং মৌজা ম্যাপের সঙ্গে জমির অবস্থান মিলিয়ে দেখুন।

নকশায় জমির অবস্থান এক জায়গায়, অথচ সরেজমিনে দেখানো হচ্ছে অন্য জায়গায়—এমন হলে বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত স্বাক্ষর স্থগিত রাখুন।

৮. প্রতিটি পৃষ্ঠা পড়ে তারপর স্বাক্ষর করুন

দলিলের শুধু প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠা দেখলেই হবে না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পৃষ্ঠা পড়ুন। বিশেষ করে তফশিল, জমির পরিমাণ, মূল্য, দখল হস্তান্তর, শর্ত এবং পক্ষগুলোর পরিচয়সংক্রান্ত অংশে ভুল আছে কি না দেখুন।

দলিলের কোনো অংশ ফাঁকা থাকলে, অস্পষ্ট লেখা থাকলে কিংবা পরে তথ্য বসানোর সুযোগ থাকলে তা সংশোধন না করে স্বাক্ষর করবেন না। দলিলের একাধিক পৃষ্ঠা থাকলে কোনো পৃষ্ঠা বদলে দেওয়া হয়েছে কি না বা তথ্যের ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কি না, সেটিও খেয়াল করুন।

৯. ছবি, স্বাক্ষর ও টিপসই ঠিকভাবে দিন

দলিলের নির্ধারিত স্থানে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ছবি, স্বাক্ষর ও টিপসই দিতে হয়। দলিলের নির্ধারিত ঘর বা স্থানে নিজের পরিচয় ও স্বাক্ষর ঠিকভাবে দেওয়া হচ্ছে কি না নিশ্চিত করুন। অন্য কারও জায়গায় বা ভুল পরিচয়ে স্বাক্ষর করবেন না।

সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে দলিল সম্পাদনের বিষয়টি স্বীকার করার সময় দলিলের বক্তব্য বুঝে তবেই সম্মতি দিন। কোনো অংশ বুঝতে অসুবিধা হলে ব্যাখ্যা চাইুন। না বুঝে বা চাপের মুখে স্বাক্ষর করা উচিত নয়।

১০. রেজিস্ট্রির রসিদ ও মূল দলিল সংগ্রহ করুন

দলিল রেজিস্ট্রির জন্য জমা দেওয়ার পর রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী দাখিলের রসিদ দেওয়া হয়। রসিদটি যত্ন করে রাখুন। তবে রেজিস্ট্রির জন্য দলিল জমা দেওয়া এবং রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়।

রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে দলিলের শেষ অংশে নিবন্ধনের সনদ, নম্বর, বই ও পৃষ্ঠার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর-সিল আছে কি না যাচাই করুন। পরে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মূল দলিল সংগ্রহ করে নিরাপদে সংরক্ষণ করুন।

দলিলে ভুল পেলে কি স্বাক্ষর করা যাবে?

না। দলিলের কোনো তথ্য ভুল থাকলে সংশোধন না করে স্বাক্ষর করা উচিত নয়। বিশেষ করে জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান, পরিমাণ, সীমানা, বিক্রেতার পরিচয় কিংবা মূল্যসংক্রান্ত ভুল ভবিষ্যতে বড় বিরোধের কারণ হতে পারে।

সমস্যা গুরুতর হলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজন হলে ভূমি আইনজীবীর সহায়তা নিন। দলিল সম্পাদনের আগে ভুল সংশোধন করাই পরবর্তী আইনি জটিলতা এড়ানোর ভালো উপায়।

জমি রেজিস্ট্রির আগে সবচেয়ে জরুরি সতর্কতা

জমি কেনার সময় তাড়াহুড়া করে স্বাক্ষর করা সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। দলিলের প্রতিটি তথ্য সরকারি রেকর্ড, আগের মালিকানার কাগজপত্র এবং বাস্তব জমির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। বিক্রেতার মালিকানা নিয়ে সন্দেহ, জমির সীমানায় অমিল কিংবা কোনো মামলা বা নিষেধাজ্ঞার তথ্য পাওয়া গেলে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রেজিস্ট্রি না করাই নিরাপদ।

মনে রাখতে হবে, দলিল রেজিস্ট্রি হওয়া মানেই জমির মালিকানা নিয়ে সব ধরনের ঝুঁকি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তাই স্বাক্ষরের আগে যাচাই এবং রেজিস্ট্রির পরে নামজারি ও ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. জমি রেজিস্ট্রির আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়টি যাচাই করতে হবে?

বিক্রেতার বৈধ মালিকানা, আগের দলিলের ধারাবাহিকতা, সর্বশেষ খতিয়ান এবং জমির দাগ-সীমানা যাচাই করা সবচেয়ে জরুরি।

২. দলিলে ভুল থাকলে কি স্বাক্ষর করা যাবে?

না। ভুল তথ্য সংশোধন না করে স্বাক্ষর করা উচিত নয়। প্রয়োজনে দলিল লেখক বা আইনজীবীর সহায়তা নিয়ে সংশোধন করতে হবে।

৩. জমির দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বর কোথায় মিলিয়ে দেখব?

সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ এবং আগের দলিলের সঙ্গে বর্তমান দলিলের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনে ভূমি অফিস বা রেকর্ড রুম থেকে প্রত্যয়িত কপি সংগ্রহ করা যায়।

৪. জমি রেজিস্ট্রির রসিদ পেলেই কি রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন?

না। দলিল জমা দেওয়ার রসিদ এবং নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার সনদ আলাদা বিষয়। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে দলিলে নিবন্ধনের সনদ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করতে হবে।

৫. জমি রেজিস্ট্রি হলেই কি নামজারি হয়ে যায়?

দলিল রেজিস্ট্রি ও নামজারি পৃথক প্রক্রিয়া। হস্তান্তরের পর ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম হালনাগাদের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: