ঢাকা, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

খতিয়ানে নাম আছে, দলিল নেই? জমির মালিকানা প্রমাণ করবেন যেভাবে

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০২ ১২:১১:৫৪
খতিয়ানে নাম আছে, দলিল নেই? জমির মালিকানা প্রমাণ করবেন যেভাবে

জমির খতিয়ানে নিজের বা পূর্বপুরুষের নাম রয়েছে, কিন্তু মূল দলিল পাওয়া যাচ্ছে না—এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বুঝতে পারেন না কীভাবে মালিকানার কাগজপত্র ঠিক করবেন। কেউ মনে করেন খতিয়ানে নাম থাকাই যথেষ্ট, আবার কেউ দলিল না থাকায় জমির অধিকার হারানোর আশঙ্কা করেন। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। খতিয়ান জমির স্বত্ব ও দখলসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলেও এটি সব ক্ষেত্রে মালিকানার চূড়ান্ত দলিল নয়। তাই প্রথমে জমিটি কীভাবে পাওয়া হয়েছিল, কোন জরিপে নাম উঠেছে এবং রেজিস্ট্রি অফিসে সংশ্লিষ্ট দলিলের তথ্য আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।

খতিয়ানে নাম থাকলে কি জমির মালিকানা প্রমাণ হয়?

খতিয়ানে কারও নাম থাকলে সেটি তাঁর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৪এ ধারায় বলা হয়েছে, ওই আইনের ১৪৪ ধারার অধীনে প্রস্তুত বা সংশোধিত স্বত্বলিপির প্রতিটি এন্ট্রি প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে এবং ভুল প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা সঠিক বলে ধরে নেওয়া হবে।

তবে এই অনুমান খণ্ডনযোগ্য। অর্থাৎ বিপরীত পক্ষ নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দিয়ে খতিয়ানের তথ্য ভুল প্রমাণ করতে পারে। তাই খতিয়ানে নাম থাকলেই সব পরিস্থিতিতে জমির মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। জমির মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তার পক্ষে দলিল বা অন্য আইনগত ভিত্তি কী এবং জমির দখল কার কাছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমে বুঝুন, কোন খতিয়ানে নাম রয়েছে

বাংলাদেশে জমির বিভিন্ন জরিপে তৈরি খতিয়ান রয়েছে। যেমন—সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস বা সিটি জরিপ। কোন খতিয়ানে নাম রয়েছে, সেটি জানা জরুরি।

পুরোনো সিএস বা এসএ খতিয়ানে নাম থাকলেও পরবর্তী জরিপে মালিকানা বা দাগের তথ্য পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। আবার সর্বশেষ জরিপের খতিয়ানে নাম থাকলে সেটিও জমির মালিকানার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। তবে খতিয়ানের ধরন ও সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান বিবেচনা করেই এর প্রমাণমূল্য নির্ধারণ করতে হবে।

তাই সংশ্লিষ্ট জমির সব প্রাসঙ্গিক খতিয়ান সংগ্রহ করে নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, মৌজা এবং মালিকানার ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দেখুন।

মূল দলিল হারিয়ে গেলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নিন

জমির মূল দলিল হারিয়ে গেলে বা পরিবারের কাছে না থাকলে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনুসন্ধান করা উচিত। কারণ জমিটি বিক্রয়, দান, হেবা বা বণ্টনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিসের রেজিস্টার ও সূচিবহিতে তার তথ্য থাকার কথা।

রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৫৭ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত নিয়ম ও ফি পরিশোধ করে স্থাবর সম্পত্তিসংক্রান্ত রেজিস্টার এবং সূচিবহি পরিদর্শন করা যায়। ওই রেকর্ডে দলিল পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী তার সার্টিফায়েড কপি বা নকল সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।

দলিলের নম্বর ও সাল জানা থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়। তা জানা না থাকলে দলিলের পক্ষগুলোর নাম, সম্ভাব্য রেজিস্ট্রির বছর, মৌজা এবং জমির অন্যান্য পরিচিত তথ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসে তল্লাশির আবেদন করতে পারেন।

দলিলের নকল সংগ্রহ করতে কী করবেন?

সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলের নকল বা সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করতে হবে। আবেদন করার আগে যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলো প্রস্তুত রাখুন—

দলিলের সম্ভাব্য রেজিস্ট্রির সাল।

বিক্রেতা ও ক্রেতার নাম।

দলিল নম্বর জানা থাকলে সেটি।

জমির মৌজা ও দাগ নম্বর।

খতিয়ান নম্বর ও জমির পরিমাণ।

দলিলের ধরন—যেমন বিক্রয়, দান বা বণ্টননামা।

রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ফি ও পদ্ধতি অনুসরণ করে নকল সংগ্রহ করতে হবে। দলিলের নম্বর জানা না থাকলেও সূচিবহি তল্লাশির মাধ্যমে তথ্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা যায়।

সরকারি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সেবা-সংক্রান্ত নির্দেশনায়ও দলিলের নকল এবং সূচিবহি তল্লাশির এ ব্যবস্থা উল্লেখ রয়েছে।

রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল না পাওয়া গেলে কী করবেন?

অনুসন্ধানের পরও যদি কোনো দলিল পাওয়া না যায়, তাহলে ধরে নেওয়া যাবে না যে জমির মালিকানা নেই। কারণ জমির মালিকানা অর্জনের সব পথ রেজিস্ট্রি করা বিক্রয় দলিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

জমিটি উত্তরাধিকার, সরকারি বন্দোবস্ত, নিলাম, আদালতের ডিক্রি বা অন্য কোনো আইনগত প্রক্রিয়ায় পাওয়া হয়ে থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে মালিকানা প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ভিত্তির কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হবে।

উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়া হলে মৃত ব্যক্তির মালিকানার দলিল, খতিয়ান, মৃত্যু সনদ এবং ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করুন। সরকারি বন্দোবস্তের জমি হলে বরাদ্দপত্র বা সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ খুঁজে বের করতে হবে। আদালতের রায়ের মাধ্যমে অধিকার পাওয়া হলে রায়, ডিক্রি এবং প্রয়োজনীয় আদেশের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করতে হবে।

আরও পড়ুন:

দলিল আছে, খতিয়ানে নাম নেই? কী করবেন এখন

ওয়ারিশ সনদ দিয়ে জমি নামজারি করবেন যেভাবে, জেনে নিন নিয়ম

আপনার জমির দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে

অর্থাৎ দলিল পাওয়া যাচ্ছে না—এ অবস্থায় জমিটি কোন সূত্রে মালিকানায় এসেছে, সেটি শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

খতিয়ান, দাগ ও জমির দখল মিলিয়ে দেখুন

খতিয়ানে নাম থাকার পাশাপাশি বাস্তবে জমিটি কোথায় এবং কার দখলে রয়েছে, তা যাচাই করতে হবে। দলিল বা অন্যান্য মালিকানার কাগজের সঙ্গে খতিয়ানের মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও সীমানা মিলিয়ে দেখুন।

প্রয়োজনে মৌজা নকশা সংগ্রহ করে একজন অভিজ্ঞ আমিনের মাধ্যমে জমির অবস্থান ও পরিমাণ যাচাই করতে পারেন। জমিতে অন্য কেউ দখলে থাকলে বা সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকলে সেটিও আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।

ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা, নামজারি খতিয়ান এবং দখলসংক্রান্ত অন্যান্য কাগজপত্র সহায়ক প্রমাণ হিসেবে কাজে আসতে পারে। তবে এগুলোর কোনো একটিকে এককভাবে চূড়ান্ত মালিকানার দলিল ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

খতিয়ানে নাম আছে, কিন্তু আগের মালিকানার প্রমাণ নেই—কী হবে?

এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু বর্তমান খতিয়ান দেখিয়ে মালিকানা নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। খতিয়ানে নাম কীভাবে উঠেছে, কোন ভিত্তিতে জরিপ হয়েছে এবং আগের মালিকের কাছ থেকে বর্তমান ব্যক্তির কাছে স্বত্ব কীভাবে এসেছে—তা খুঁজে বের করতে হবে।

যদি পুরোনো দলিল হারিয়ে যায়, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নকল খুঁজুন। যদি উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা আসে, তাহলে পূর্বসূরির স্বত্বের কাগজপত্র সংগ্রহ করুন। আর যদি রেকর্ডে ভুল বা অন্য কারও দাবির কারণে বিরোধ তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি বুঝে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষ বা দেওয়ানি আদালতের আইনগত প্রতিকার নিতে হতে পারে।

জমি বিক্রি করতে চাইলে আগে সতর্ক হোন

খতিয়ানে নাম থাকলেও মালিকানার উৎস ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরিষ্কার না করে জমি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া উচিত নয়। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৬ ধারায় জমি হস্তান্তর ও রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সর্বশেষ খতিয়ান এবং হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের প্রমাণসংক্রান্ত শর্ত রয়েছে।

তাই জমি বিক্রি, দান বা অন্যভাবে হস্তান্তরের আগে সর্বশেষ রেকর্ড, মালিকানার ভিত্তি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে নিন। কোনো দলিল হারিয়ে গেলে তার সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের চেষ্টা করুন। মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে আইনজীবীর পরামর্শ ছাড়া লেনদেনে যাবেন না।

খতিয়ানে নাম আছে কিন্তু দলিল নেই—এমন অবস্থায় সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হলো প্রথমে আতঙ্কিত না হয়ে মালিকানার উৎস খুঁজে বের করা। সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের নকল অনুসন্ধান, পুরোনো খতিয়ান ও দাগের তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তরাধিকার বা আদালতের কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ সরকারি রেকর্ড হলেও সব ক্ষেত্রে মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। জমির প্রকৃত স্বত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য খতিয়ান, দলিল বা মালিকানা অর্জনের অন্য আইনগত ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রমাণ একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. খতিয়ানে নাম থাকলে কি জমির মালিকানা নিশ্চিত হয়?

খতিয়ানে নাম থাকা মালিকানার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। তবে এটি একা সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মালিকানা প্রমাণ করে না। মালিকানা অর্জনের ভিত্তি ও অন্যান্য কাগজপত্রও যাচাই করতে হয়।

২. জমির মূল দলিল হারিয়ে গেলে কীভাবে নকল তুলব?

সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৫৭ ধারা অনুযায়ী আবেদন করে দলিলের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা যায়। দলিল নম্বর না জানা থাকলে সূচিবহি তল্লাশির মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।

৩. দলিল নম্বর ও সাল জানা না থাকলে কি দলিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব?

সম্ভব হতে পারে। বিক্রেতা ও ক্রেতার নাম, মৌজা, দাগ নম্বর এবং সম্ভাব্য রেজিস্ট্রির সময়কাল দিয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসে অনুসন্ধান করা যায়। তবে পুরোনো রেকর্ডের তথ্য ও সংরক্ষণের অবস্থার ওপর অনুসন্ধানের ফল নির্ভর করবে।

৪. উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেলে নিজের নামে দলিল না থাকলেও কি মালিক হওয়া যায়?

হ্যাঁ। উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা পেতে নতুন করে নিজের নামে বিক্রয় দলিল থাকা আবশ্যক নয়। তবে মৃত ব্যক্তির মালিকানা এবং নিজের আইনগত উত্তরাধিকার প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকতে হবে।

৫. শুধু খতিয়ান ও ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ দিয়ে কি জমি বিক্রি করা যাবে?

এগুলো গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড হলেও একা মালিকানার পূর্ণ ভিত্তি নয়। জমির মালিকানা অর্জনের আইনগত উৎস এবং হস্তান্তরের জন্য প্রযোজ্য সর্বশেষ খতিয়ান ও অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: