ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

Royal Enfield Himalayan 750: ৭৫০ সিসির বাইকে বড় চমক

তথ্য ও প্রযুক্তি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০৫ ১৯:০৫:৫৫
Royal Enfield Himalayan 750: ৭৫০ সিসির বাইকে বড় চমক

রয়্যাল এনফিল্ডের অ্যাডভেঞ্চার মোটরসাইকেলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো Himalayan 750-এর মাধ্যমে। ৭৪৩ সিসির নতুন প্যারালাল-টুইন ইঞ্জিন, ৫৫ hp শক্তি, ৬৩ Nm টর্ক এবং আধুনিক রাইডিং প্রযুক্তি নিয়ে বাইকটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেছে ভারতীয় নির্মাতা Royal Enfield। ইতালির মিলানে EICMA 2026 প্রদর্শনীতে আত্মপ্রকাশ করা এই মোটরসাইকেলে রয়েছে পাঁচটি রাইডিং মোড, কর্নারিং ABS, লিন-সেনসিটিভ ট্র্যাকশন কন্ট্রোল ও ক্রুজ কন্ট্রোল। যুক্তরাজ্যে এর প্রাথমিক দাম রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৯৯৯ পাউন্ড। ইউরোপের বিভিন্ন বাজারে ইতোমধ্যে বুকিংও শুরু হয়েছে।

Himalayan সিরিজের পরিচিত অ্যাডভেঞ্চার চরিত্র ধরে রেখেই নতুন মডেলটিতে ইঞ্জিন সক্ষমতা ও প্রযুক্তির বড় পরিবর্তন এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। এত দিন এই সিরিজের মোটরসাইকেলে সিঙ্গেল-সিলিন্ডার ইঞ্জিন ব্যবহার করা হলেও নতুন 750 মডেলে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে টুইন-সিলিন্ডার ইঞ্জিন। ফলে দীর্ঘপথের ভ্রমণ, হাইওয়ে রাইডিং এবং বিভিন্ন ধরনের রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে এটি নতুন অভিজ্ঞতা দিতে পারে।

Royal Enfield ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে EICMA প্রদর্শনীতে Himalayan 750 উন্মোচন করে। প্রতিষ্ঠানটির ১২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঘোষিত নতুন মোটরসাইকেলগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

৭৪৩ সিসির নতুন ইঞ্জিনে কত শক্তি পাচ্ছে Himalayan 750?

Royal Enfield Himalayan 750-এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এর ইঞ্জিনে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ৭৪৩ সিসির এয়ার ও অয়েল-কুলড প্যারালাল-টুইন ইঞ্জিন। এটি ৭,০০০ rpm-এ সর্বোচ্চ ৫৫ hp শক্তি এবং ৫,০০০ rpm-এ ৬৩ Nm টর্ক উৎপন্ন করে।

ইঞ্জিনটির বিশেষত্ব হলো কম গতিতেও পর্যাপ্ত টর্ক পাওয়া। Royal Enfield-এর তথ্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ টর্কের ৯০ শতাংশ পাওয়া যাবে মাত্র ৩,৫০০ rpm থেকেই। ফলে পাহাড়ি রাস্তা, দীর্ঘ হাইওয়ে ভ্রমণ কিংবা অতিরিক্ত মালপত্র নিয়ে চলার সময় প্রয়োজনীয় শক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে।

ইঞ্জিনের সঙ্গে রয়েছে ছয়-গতির গিয়ারবক্স। পাশাপাশি অ্যাসিস্ট অ্যান্ড স্লিপার ক্লাচ ব্যবহারের সুবিধাও রাখা হয়েছে। নতুন এই ইঞ্জিনের মাধ্যমে Himalayan সিরিজকে আরও শক্তিশালী অ্যাডভেঞ্চার মোটরসাইকেলের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি।

সাসপেনশন ও চ্যাসিসে থাকছে উন্নত হার্ডওয়্যার

অ্যাডভেঞ্চার মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ইঞ্জিনের পাশাপাশি সাসপেনশন ও চ্যাসিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। Himalayan 750-তে এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে Royal Enfield।

বাইকটির সামনে রয়েছে ৪৩ মিমি Showa USD ফর্ক। এতে প্রিলোড, কমপ্রেশন ও রিবাউন্ড সমন্বয়ের সুবিধা রয়েছে। সামনের সাসপেনশনের হুইল ট্রাভেল ১৯০ মিমি। পেছনে ব্যবহার করা হয়েছে লিংকেজ-টাইপ Showa মনোশক, যার প্রিলোড ও রিবাউন্ড অ্যাডজাস্ট করা যায়। পেছনের সাসপেনশনের ট্রাভেল ১৭৫ মিমি।

মোটরসাইকেলটি তৈরি হয়েছে বক্স-সেকশন স্পাইন ফ্রেমের ওপর। এতে ইঞ্জিনকেও চ্যাসিসের কাঠামোগত অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই নির্মাণশৈলী বাইকটির সামগ্রিক কাঠামো ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯ ইঞ্চি ও ১৭ ইঞ্চির চাকায় নতুন সেটআপ

Himalayan 750-তে সামনে ১৯ ইঞ্চি এবং পেছনে ১৭ ইঞ্চির চাকা ব্যবহার করা হয়েছে। দুই চাকাতেই টিউবলেস টায়ারের ব্যবস্থা রয়েছে। ক্রেতারা ভ্যারিয়েন্ট অনুযায়ী কাস্ট অ্যালয় এবং ক্রস-স্পোক হুইলের মধ্যে বেছে নিতে পারবেন।

সামনের চাকায় রয়েছে ১১০/৮০ R19 এবং পেছনে ১৫০/৭০ R17 মাপের টায়ার। কাস্ট অ্যালয় সংস্করণে CEAT Crossrad AT এবং স্পোক সংস্করণে Vredestein Centauro XR টায়ার ব্যবহার করা হয়েছে।

ব্রেকিংয়ের জন্য সামনে রয়েছে দুটি ২৮০ মিমি ডিস্ক এবং পেছনে ২৫৫ মিমি ডিস্ক। দুই চাকাতেই দুই-পিস্টন ক্যালিপার ব্যবহার করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য ডুয়াল-চ্যানেল ABS রয়েছে, যার পেছনের ABS বন্ধ করার সুবিধাও রাখা হয়েছে।

পাঁচটি রাইডিং মোড ও কর্নারিং ABS

Himalayan 750-তে আধুনিক ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির সমন্বয় করেছে Royal Enfield। এতে ছয়-অক্ষের IMU বা Inertial Measurement Unit ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মোটরসাইকেলের ঝুঁকে চলার অবস্থা ও গতিবিধি শনাক্ত করে বিভিন্ন নিরাপত্তা প্রযুক্তি কাজ করতে পারে।

বাইকটিতে পাঁচটি রাইডিং মোড রয়েছে। এগুলো হলো Road, Road Sport, Rain, Trail এবং Custom। চালক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী মোড পরিবর্তন করতে পারবেন। প্রতিটি মোডের সঙ্গে ইঞ্জিন ম্যাপিং, ABS এবং ট্র্যাকশন কন্ট্রোলের সেটিং পরিবর্তিত হয়।

এ ছাড়া রয়েছে কর্নারিং ABS এবং Lean-sensitive Traction Control। ট্র্যাকশন কন্ট্রোলে চারটি স্তর নির্বাচন করা যায়—Low, Medium, High এবং Off। দীর্ঘপথে চালানোর সুবিধার জন্য ক্রুজ কন্ট্রোলও যুক্ত করা হয়েছে।

TFT ডিসপ্লে ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা

মোটরসাইকেলটির প্রযুক্তিগত ফিচারের মধ্যে রয়েছে ৪ ইঞ্চির গোলাকার TFT ইন্সট্রুমেন্ট ডিসপ্লে। এতে Bluetooth ও Wi-Fi সংযোগের সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি ইন্টিগ্রেটেড নেভিগেশন, ফোন ও মিউজিক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

আরও রয়েছে Tyre Pressure Monitoring System বা TPMS। এর মাধ্যমে টায়ারের বাতাসের চাপ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। স্মার্ট ডিভাইস চার্জ দেওয়ার জন্য দুটি USB Type-C পোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে একটি ২৭ ওয়াট ফাস্ট চার্জিং সমর্থন করে।

আলোকসজ্জার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে LED হেডলাইট। সঙ্গে রয়েছে সেলফ-ক্যানসেলিং টার্ন ইন্ডিকেটর এবং ইমার্জেন্সি ব্রেক ল্যাম্প। এসব প্রযুক্তি দীর্ঘপথে রাইডিংয়ের সুবিধা ও নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়তা করবে।

দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা

Himalayan সিরিজের মূল পরিচয় অ্যাডভেঞ্চার ও দীর্ঘপথের ভ্রমণ। নতুন মডেলেও সেই বিষয়টি ধরে রেখেছে Royal Enfield।

এতে পাঁচ ধাপে সমন্বয়যোগ্য উইন্ডস্ক্রিন রয়েছে, যার উচ্চতা সর্বোচ্চ ৬০ মিমি পর্যন্ত পরিবর্তন করা যায়। চালক ও পেছনের যাত্রীর জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি চালকের উচ্চতা ও পছন্দ অনুযায়ী আলাদা অ্যাকসেসরিজ সিট ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।

বাইকটির গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স ২০৫ মিমি এবং সিটের উচ্চতা ৮১৫ মিমি। জ্বালানি ধারণক্ষমতা ১৭.৮ লিটার। ইউরোপীয় সংস্করণের কার্ব ওজন ২২৩ কেজি এবং ভারতীয় সংস্করণের প্রকাশিত ওজন ২২৪ কেজি। Royal Enfield জানিয়েছে, এর সর্বোচ্চ বহনক্ষমতা ১৯৫ কেজি।

পাঁচটি রঙে পাওয়া যাবে Himalayan 750

নতুন এই অ্যাডভেঞ্চার বাইকটি মোট পাঁচটি রঙে বাজারে আসছে। রঙগুলো হলো Antarctic Silver, Siberia White, Viking Bronze, Aztec Green এবং Tectonic Black।

এর মধ্যে Antarctic Silver সংস্করণটি বিশেষ ট্যুরিং প্যাকেজসহ পাওয়া যাবে। এই প্যাকেজে রয়েছে GIVI টপ বক্স, হার্ড প্যানিয়ার, মাউন্টিং হার্ডওয়্যার, ইননার ব্যাগ, হিটেড গ্রিপস, হ্যান্ড গার্ড এবং অ্যালুমিনিয়াম স্কিড প্লেট।

অন্য রঙের সংস্করণগুলোতে ভ্যারিয়েন্ট অনুযায়ী কাস্ট অ্যালয় অথবা স্পোক হুইল বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

Royal Enfield Himalayan 750-এর দাম কত?

ইউরোপের বাজারে Himalayan 750-এর বুকিং শুরু হয়েছে। যুক্তরাজ্যে কাস্ট হুইল সংস্করণের প্রাথমিক দাম ৬ হাজার ৯৯৯ পাউন্ড। স্পোক হুইল সংস্করণের দাম ৭ হাজার ২৯৯ পাউন্ড। অন্যদিকে GIVI ট্যুরিং অ্যাকসেসরিজসহ শীর্ষ Antarctic Silver সংস্করণের দাম ৮ হাজার ৬৯৯ পাউন্ড।

ইতালির বাজারে কাস্ট হুইল সংস্করণের দাম ৭ হাজার ৩৯০ ইউরো, স্পোক হুইল সংস্করণের দাম ৭ হাজার ৭৯০ ইউরো এবং বিশেষ ট্যুরিং সংস্করণের দাম ৯ হাজার ২৯০ ইউরো নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে এসব প্রাথমিক মূল্য যুক্তরাজ্য ও ইতালির বাজারের জন্য। অন্য দেশে কর, শুল্ক ও পরিবহন খরচের কারণে দাম ভিন্ন হতে পারে।

ভারতে ও বাংলাদেশে কবে আসবে Himalayan 750?

আন্তর্জাতিক বাজারে আত্মপ্রকাশের পর এখন ভারতের বাজারেও Himalayan 750 নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নভেম্বরের শেষ দিকে গোয়ায় অনুষ্ঠিতব্য Motoverse 2026 আয়োজনে মোটরসাইকেলটির ভারতীয় সংস্করণ সম্পর্কে ঘোষণা আসতে পারে। তবে ভারতীয় বাজারের চূড়ান্ত দাম ও বিক্রির সময়সূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

বাংলাদেশের বাজারে Himalayan 750 কবে আসবে, সে বিষয়েও Royal Enfield কোনো ঘোষণা দেয়নি। ফলে বাংলাদেশে বাইকটির সম্ভাব্য দাম কিংবা বিক্রির তারিখ এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে, ৭৪৩ সিসির টুইন-সিলিন্ডার ইঞ্জিন, উন্নত Showa সাসপেনশন, পাঁচটি রাইডিং মোড এবং আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির কারণে Himalayan 750 রয়্যাল এনফিল্ডের অ্যাডভেঞ্চার মোটরসাইকেল লাইনআপে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বিশেষ করে যারা দীর্ঘপথে ভ্রমণের পাশাপাশি শক্তিশালী ইঞ্জিনের সুবিধা চান, তাদের কাছে নতুন মডেলটি আকর্ষণীয় হতে পারে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

১. Royal Enfield Himalayan 750-এর ইঞ্জিন কত সিসির?

এতে ৭৪৩ সিসির এয়ার ও অয়েল-কুলড প্যারালাল-টুইন ইঞ্জিন রয়েছে।

২. Himalayan 750-এর সর্বোচ্চ শক্তি ও টর্ক কত?

ইঞ্জিনটি ৭,০০০ rpm-এ ৫৫ hp শক্তি এবং ৫,০০০ rpm-এ ৬৩ Nm টর্ক উৎপন্ন করে।

৩. Royal Enfield Himalayan 750-এর দাম কত?

যুক্তরাজ্যে এর দাম শুরু হয়েছে ৬ হাজার ৯৯৯ পাউন্ড থেকে। স্পোক হুইল সংস্করণের দাম ৭ হাজার ২৯৯ পাউন্ড এবং বিশেষ ট্যুরিং সংস্করণের দাম ৮ হাজার ৬৯৯ পাউন্ড।

৪. Himalayan 750-তে কী কী রাইডিং মোড রয়েছে?

এতে Road, Road Sport, Rain, Trail ও Custom—এই পাঁচটি রাইডিং মোড রয়েছে।

৫. Royal Enfield Himalayan 750 কি বাংলাদেশে আসবে?

বাংলাদেশে বাইকটি বাজারজাত করার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তাই এর বাংলাদেশি দাম ও বিক্রির সময় অজানা।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: