ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

একই জমির দাগ নম্বর দুই কাগজে আলাদা, কোনটি ঠিক?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০৫ ১৩:১৯:৪৫
একই জমির দাগ নম্বর দুই কাগজে আলাদা, কোনটি ঠিক?

জমির দলিলে এক দাগ নম্বর, অথচ খতিয়ান বা পর্চায় আরেকটি—এমন অমিল দেখে অনেকেই জমির মালিকানা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। কিন্তু কাগজে দাগ নম্বর আলাদা থাকলেই যে কোনো একটি ভুল, তা নয়। সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা অন্য জরিপে একই জমির জন্য ভিন্ন দাগ নম্বর থাকতে পারে। তাই কোন নম্বরটি সঠিক, তা নির্ধারণের আগে কাগজ দুটি কোন জরিপের এবং সেগুলো একই জমিকে নির্দেশ করছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের নির্দেশিকায় বিভিন্ন জরিপের দাগের মধ্যে সাবেক ও হাল দাগের সম্পর্ক নির্ধারণ এবং তালিকা তৈরির কথা রয়েছে। অর্থাৎ পুরোনো দাগের সঙ্গে নতুন দাগের যোগসূত্র যাচাই করেই জমির পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। শুধু একটি কাগজের নম্বরকে সঠিক ধরে অন্যটিকে ভুল বলা যায় না।

জরিপ পরিবর্তনে কেন একই জমির দাগ নম্বর বদলে যায়?

জমির দাগ নম্বর নির্ধারিত হয় মৌজাভিত্তিক ভূমি জরিপের মাধ্যমে। বিভিন্ন সময়ে নতুন জরিপ পরিচালিত হলে জমির রেকর্ড ও নকশা পুনরায় প্রস্তুত করা হয়। এ কারণে আগের জরিপের দাগ নম্বর পরবর্তী জরিপে বদলে যেতে পারে।

যেমন, কোনো জমির পুরোনো দলিলে সিএস বা এসএ জরিপের দাগ নম্বর থাকতে পারে। পরবর্তী আরএস বা বিএস জরিপে একই জমির জন্য নতুন দাগ নম্বর নির্ধারিত হলে দুই কাগজে নম্বরের অমিল দেখা যাবে। এটি জরিপভেদে স্বাভাবিক পরিবর্তনও হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে পুরোনো দাগকে বলা হয় সাবেক দাগ এবং পরবর্তী জরিপে নির্ধারিত দাগকে বলা হয় হাল দাগ। এই দুই নম্বরের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করাই হলো মূল কাজ।

কোন কাগজ দেখে সঠিক দাগ নম্বর বুঝবেন?

দাগ নম্বরের অমিল থাকলে একাধিক নথি পাশাপাশি রেখে যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে নিচের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

১. দলিলে উল্লেখ করা জরিপের ধরন

প্রথমে জমির দলিলটি কোন জরিপের দাগ নম্বর অনুসারে তৈরি হয়েছে, তা দেখুন। দলিলে সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস—কোন জরিপের দাগ উল্লেখ রয়েছে, সেটি শনাক্ত করা জরুরি।

২. সংশ্লিষ্ট খতিয়ান বা পর্চা

দলিলে উল্লেখ করা জরিপের সঙ্গে মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান সংগ্রহ করুন। সেখানে মালিকের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও অন্যান্য বিবরণ যাচাই করুন।

৩. মৌজা ম্যাপ বা নকশা

দাগ নম্বরের অমিল যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মৌজা ম্যাপ গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট জরিপের নকশায় জমির অবস্থান, সীমানা ও আশপাশের দাগগুলো মিলিয়ে দেখতে হবে। শুধু নম্বর মিললেই হবে না, জমির অবস্থানও একই কি না তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

৪. হাল-সাবেক দাগের তালিকা

পুরোনো ও নতুন জরিপের দাগের মধ্যে সম্পর্ক জানতে হাল-সাবেক দাগের তালিকা দেখতে পারেন। এতে আগের দাগের বিপরীতে পরবর্তী জরিপের দাগ নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। তবে জমির অংশ ভাগ হওয়া বা একাধিক দাগে বিভক্ত হওয়ার বিষয় থাকলে শুধু একটি নম্বরের সঙ্গে আরেকটি নম্বর মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

দাগ নম্বরের অমিল যাচাই করবেন যেভাবে

দুটি কাগজে দাগ নম্বর আলাদা থাকলে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট জমির মৌজা, জেএল নম্বর এবং জরিপের ধরন মিলিয়ে নিন। এরপর নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন।

প্রথম ধাপ: দুই কাগজের জরিপ শনাক্ত করুন

দলিল ও খতিয়ান কোন জরিপের, তা আলাদা করে লিখে রাখুন। একই জরিপের কাগজ নাকি ভিন্ন সময়ের জরিপের রেকর্ড—এটি বোঝা জরুরি।

দ্বিতীয় ধাপ: পুরোনো ও নতুন দাগের সম্পর্ক খুঁজুন

সংশ্লিষ্ট মৌজার হাল-সাবেক দাগের তালিকা সংগ্রহ করে পুরোনো দাগের সঙ্গে নতুন দাগের মিল যাচাই করুন।

তৃতীয় ধাপ: মৌজা ম্যাপে জমির অবস্থান মিলিয়ে দেখুন

পুরোনো ও নতুন জরিপের নকশা পাশাপাশি রেখে জমির অবস্থান, সীমানা এবং আশপাশের দাগ পরীক্ষা করুন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে নকশা মিলিয়ে নিতে পারেন।

চতুর্থ ধাপ: জমির পরিমাণ ও মালিকানার তথ্য যাচাই করুন

দলিল, খতিয়ান ও নকশায় জমির পরিমাণ, মালিকের নাম এবং অন্যান্য বিবরণ মিলিয়ে দেখুন। জমির কোনো অংশ বিক্রি, হস্তান্তর বা ভাগ হয়ে থাকলে সেটিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

পঞ্চম ধাপ: সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নিন

অনলাইনে পাওয়া তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় রেকর্ড ও নকশা যাচাই করুন। প্রয়োজনে প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করুন।

দুই কাগজ একই জরিপের হলে কী করবেন?

দুটি কাগজে একই মৌজা ও একই জরিপের কথা উল্লেখ থাকার পরও দাগ নম্বর আলাদা হলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হবে। এটি লেখার ভুল, তথ্য নকলের ভুল কিংবা জমির পরিচয়সংক্রান্ত কোনো জটিলতার কারণে হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, দলিল, দাগের সূচি এবং মৌজা ম্যাপ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু একটি কাগজকে বেশি সাম্প্রতিক বা দেখতে নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে বলে সেটিকে সঠিক ধরে নেওয়া উচিত নয়।

যদি সরকারি রেকর্ডেই ভুল পাওয়া যায়, তাহলে ভুলের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাইতে হবে। আর চূড়ান্ত প্রকাশিত জরিপ রেকর্ড নিয়ে বিরোধ থাকলে বিষয়টি কোন কর্তৃপক্ষ বা আদালতের এখতিয়ারভুক্ত, তা আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে নির্ধারণ করা উচিত।

জমি কেনার আগে দাগ নম্বরের অমিল পেলে কী করবেন?

জমি কেনার সময় দলিল ও খতিয়ানের দাগ নম্বর না মিললে যাচাই শেষ না করে বায়না বা চূড়ান্ত লেনদেনে এগোনো ঝুঁকিপূর্ণ। বিক্রেতার দেওয়া দলিল, সর্বশেষ খতিয়ান, নামজারি-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং মৌজা ম্যাপ একসঙ্গে পরীক্ষা করুন।

আরও পড়ুন:

একই জমি দুইজন দাবি করলে যেভাবে যাচাই করবেন মালিকানা

বণ্টননামা ছাড়া কি ওয়ারিশদের জমি আলাদা করা যায়? জানুন নিয়ম

নিজের নামে কোথায় কত জমি, অনলাইনে দেখবেন যেভাবে

একই জমির পুরোনো ও নতুন দাগের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেও জমির পুরো মালিকানা বিক্রেতার নামে আছে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে জমির সীমানা সরেজমিনে মাপিয়ে নিন এবং অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবী বা সার্ভেয়ারের সহায়তা নিন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দাগ নম্বরের অমিলের কারণ না জেনে কোনো একটি কাগজকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। জরিপের পরিবর্তনে নম্বর বদলাতে পারে, আবার প্রকৃত রেকর্ডের ভুলও থাকতে পারে। সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য দলিল, খতিয়ান, হাল-সাবেক দাগের তথ্য ও মৌজা নকশা মিলিয়ে জমির পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

১. একই জমির দাগ নম্বর দুই কাগজে আলাদা হতে পারে কেন?

ভিন্ন সময়ে পরিচালিত সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস জরিপে একই জমির জন্য আলাদা দাগ নম্বর নির্ধারিত হতে পারে। তাই জরিপের ধরন না দেখে অমিলের কারণ বোঝা যায় না।

২. দলিলের দাগ নম্বর ঠিক, নাকি খতিয়ানের দাগ নম্বর?

কোনোটিকেই যাচাই ছাড়া সঠিক বলা যাবে না। দলিল ও খতিয়ান কোন জরিপের, হাল-সাবেক দাগের সম্পর্ক এবং মৌজা ম্যাপ মিলিয়ে দেখতে হবে।

৩. হাল দাগ ও সাবেক দাগ কী?

আগের জরিপে ব্যবহৃত দাগ নম্বরকে সাবেক দাগ এবং পরবর্তী জরিপে নির্ধারিত দাগ নম্বরকে হাল দাগ বলা হয়।

৪. জমির পুরোনো ও নতুন দাগ নম্বর কীভাবে মিলিয়ে দেখব?

সংশ্লিষ্ট মৌজার হাল-সাবেক দাগের তালিকা, খতিয়ান এবং পুরোনো ও নতুন মৌজা ম্যাপ মিলিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনে ভূমি অফিস বা অভিজ্ঞ সার্ভেয়ারের সহায়তা নিতে পারেন।

৫. দুই কাগজে একই জরিপের দাগ নম্বর আলাদা হলে কী করবেন?

সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, দাগের সূচি, দলিল ও মৌজা নকশা দিয়ে সরকারি রেকর্ড যাচাই করুন। ভুল পাওয়া গেলে তার ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাইতে হবে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: