ঢাকা, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

সৌদি আরবে বেতন বকেয়া, বাংলাদেশি কর্মীরা কোথায় যাবেন?

প্রবাসী ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০৭ ২১:১৮:০৭
সৌদি আরবে বেতন বকেয়া, বাংলাদেশি কর্মীরা কোথায় যাবেন?

সৌদি আরবে চাকরি করার পরও মাসের পর মাস বেতন না পেলে বাংলাদেশি কর্মীদের চুপ করে থাকার প্রয়োজন নেই। দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত অভিযোগ ব্যবস্থায় বকেয়া বেতনের দাবি জানানো যায়। অভিযোগের প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়োগকর্তার সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। সেখানে সমাধান না হলে বিষয়টি শ্রম আদালতে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইনও প্রবাসী কর্মীদের নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি ও আইনি দাবি আদায়ে সহায়তা করে।

সৌদি আরবের শ্রম আইন অনুযায়ী, বৈধ কারণ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে বেতন পরিশোধ না করা হলে কর্মী বা তাঁর প্রতিনিধি শ্রম আদালতে বকেয়া বেতন আদায়ের আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বেতন আটকে রাখার প্রমাণ, চাকরির চুক্তি এবং বেতনসংক্রান্ত নথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রথমে কোথায় অভিযোগ করবেন?

সৌদি আরবে বেতন আটকে রাখার অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্তৃপক্ষ হলো Ministry of Human Resources and Social Development (MHRSD)। এটি দেশটির মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়।

কর্মীরা কয়েকটি উপায়ে অভিযোগ জানাতে পারেন:

মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইন ১৯৯১১ নম্বরে ফোন করে।

মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটের ইলেকট্রনিক সেবা ব্যবহার করে।

Qiwa শ্রমবাজার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শ্রমসংক্রান্ত অভিযোগ জমা দিয়ে।

সংশ্লিষ্ট এলাকার শ্রম অফিসে যোগাযোগ করে।

মন্ত্রণালয়ের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তিতে MHRSD প্রাথমিক পর্যায়ে মধ্যস্থতা করে। সমঝোতা সম্ভব না হলে অভিযোগ শ্রম আদালতে পাঠানো হয়।

১৯৯১১ নম্বরে ফোন করে কীভাবে অভিযোগ জানাবেন?

সৌদি আরবে বেতন না পাওয়ার সমস্যায় MHRSD-এর একীভূত হেল্পলাইন ১৯৯১১ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়। ফোনে অভিযোগ জানানোর সময় কর্মীর নিজের পরিচয়, নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য, বেতন কত মাসের বকেয়া এবং সমস্যার বিবরণ প্রস্তুত রাখা উচিত।

মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ পেজে হেল্পলাইনটি রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চালু থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ জানানোর সময় কর্মীকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে, তিনি নির্ধারিত সময়ের বেতন পাননি এবং বকেয়া অর্থ আদায়ের জন্য শ্রম বিরোধের অভিযোগ জানাতে চান। অভিযোগের নম্বর বা রেফারেন্স দেওয়া হলে সেটি সংরক্ষণ করা জরুরি।

অনলাইনে বকেয়া বেতনের অভিযোগ করবেন যেভাবে

সৌদি আরবে শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য MHRSD-এর ‘Friendly Settlement for Labor Disputes’ সেবা রয়েছে। এটি শ্রম বিরোধের প্রাথমিক সমঝোতা পর্যায়।

সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি এভাবে এগোয়:

১. সৌদি মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সরকারি ই-সেবা পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে।

২. শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তি বা Friendly Settlement সেবাটি নির্বাচন করতে হবে।

৩. অভিযোগকারীর পরিচয়, কর্মস্থল, নিয়োগকর্তার তথ্য এবং বিরোধের বিবরণ পূরণ করতে হবে।

৪. বকেয়া বেতনের দাবি উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করতে হবে।

৫. আবেদন জমা দিয়ে অভিযোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

মন্ত্রণালয়ের সেবা নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই প্রাথমিক সমঝোতা প্রক্রিয়া প্রথম সেশনের তারিখ থেকে ২১ কর্মদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। সমঝোতা না হলে শ্রম আদালতে মামলা পাঠানো হয়।

শ্রম আদালতে কখন যেতে হবে?

MHRSD-এর প্রাথমিক সমঝোতা প্রক্রিয়ায় বেতনসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে শ্রম আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সৌদি শ্রম আইনের ৯৪ নম্বর ধারায় নির্ধারিত সময়ে বৈধ কারণ ছাড়া বেতন পরিশোধ না করার ক্ষেত্রে শ্রম আদালতের মাধ্যমে বকেয়া বেতন আদায়ের কথা বলা হয়েছে।

আইনের ওই ধারায় আরও উল্লেখ রয়েছে, অন্যায়ভাবে বেতন কর্তন বা বেতন প্রদানে অযৌক্তিক বিলম্ব প্রমাণিত হলে আদালত নিয়োগকর্তার ওপর সংশ্লিষ্ট কর্তন বা বকেয়া বেতনের সর্বোচ্চ দ্বিগুণ পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করতে পারে। তবে জরিমানা হবে কি না এবং কত হবে, তা আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইনে অভিযোগ

সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইনও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার জায়গা। দূতাবাসের প্রকাশিত সেবা অনুযায়ী, শ্রমকল্যাণ উইন বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তিতে পরামর্শ ও সহায়তা দেয়। প্রয়োজনে শ্রম আদালতে কর্মীদের আইনগত দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায়ও সহায়তা করে।

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইনের যোগাযোগের তথ্য:

টোল-ফ্রি নম্বর: 8001000125

দূতাবাসের ফোন: 011-4195300

শ্রমকল্যাণ উইনের ফোন: 011-4557158

ইমেইল: [email protected]

দূতাবাসের সরকারি ওয়েবসাইটে শ্রমকল্যাণ উইনের সেবা ও যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

রিয়াদ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইনে অনলাইন অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। সেখানে নাম, মোবাইল নম্বর, শহর, ইকামা বা বর্ডার নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর এবং সমস্যার বিবরণ দিয়ে অভিযোগ জমা দেওয়া যায়। প্রয়োজনে ইকামা ও পাসপোর্টের কপি সংযুক্ত করতে হয়।

জেদ্দায় থাকলে কোথায় যোগাযোগ করবেন?

সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীরা জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের শ্রমকল্যাণ উইনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত যোগাযোগ তালিকায় জেদ্দার শ্রমকল্যাণ কর্মকর্তাদের ফোন ও ইমেইল দেওয়া রয়েছে। এর মধ্যে:

কাউন্সেলর (শ্রম): +966 50 136 5198

ইমেইল: [email protected]

প্রথম সচিব (শ্রম): +966 12 633 5082 (অফিস) / +966 53 445 5716 (মোবাইল)

ইমেইল: [email protected]

যোগাযোগের আগে সরকারি তালিকা থেকে সর্বশেষ তথ্য মিলিয়ে নেওয়া উচিত।

অভিযোগ করার আগে যেসব প্রমাণ সংগ্রহ করবেন

বেতন আটকে রাখার অভিযোগ কার্যকরভাবে উপস্থাপন করতে কর্মীর কাছে থাকা চাকরিসংক্রান্ত নথি ও প্রমাণ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। যেমন:

চাকরির চুক্তিপত্র বা Qiwa-তে থাকা চুক্তির কপি।

ইকামা ও পাসপোর্টের কপি।

বেতন জমা হওয়ার ব্যাংক স্টেটমেন্ট।

বেতন না পাওয়ার মাসগুলোর তালিকা।

নিয়োগকর্তার সঙ্গে বেতন নিয়ে কথোপকথনের মেসেজ বা ইমেইল।

উপস্থিতি, কাজের সময় বা বেতনসংক্রান্ত অন্যান্য নথি।

বকেয়া বেতনের মোট হিসাব।

এসব নথি অভিযোগের বিবরণকে স্পষ্ট করতে সাহায্য করে। তবে কোনো নথি না থাকলেও অভিযোগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে MHRSD বা দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইনের কাছে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

গৃহকর্মী ও ব্যক্তিগত চালকদের অভিযোগের পদ্ধতি আলাদা

সৌদি আরবে বাসাবাড়িতে কাজ করা গৃহকর্মী, ব্যক্তিগত গাড়িচালক, পরিচর্যাকারী বা এ ধরনের পেশায় নিয়োজিত কর্মীদের জন্য আলাদা অভিযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। তাঁদের ক্ষেত্রে Musaned প্ল্যাটফর্মের Friendly Settlement সেবা ব্যবহার করতে হয়।

Musaned-এর তথ্য অনুযায়ী, গৃহকর্মী ও নিয়োগকর্তার বিরোধের প্রাথমিক পর্যায়ে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। সমাধান না হলে প্রথম সেশনের ২১ কর্মদিবসের মধ্যে বিরোধ শ্রম আদালতে পাঠানো হতে পারে।

সুতরাং সৌদি আরবে বেতন আটকে রাখার অভিযোগ করার আগে কর্মী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক, নাকি গৃহকর্মী—তা বিবেচনা করে সঠিক অভিযোগের মাধ্যম নির্বাচন করা জরুরি।

বেতন আটকে রাখলে কর্মীদের করণীয়

সৌদি আরবে নির্ধারিত সময়ে বেতন না পেলে প্রথমে বকেয়া অর্থের হিসাব ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। এরপর নিয়োগকর্তার কাছে লিখিতভাবে বেতন দাবি জানানো যেতে পারে। সমাধান না হলে MHRSD-এর ১৯৯১১ নম্বর, সরকারি ই-সেবা বা সংশ্লিষ্ট শ্রম অফিসে অভিযোগ করা উচিত।

প্রাথমিক সমঝোতায় বেতন আদায় না হলে শ্রম আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দা কনস্যুলেটের শ্রমকল্যাণ উইনের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

প্রবাসী কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বেতন আটকে রাখার ঘটনা ও প্রমাণ নথিবদ্ধ রাখা এবং অভিযোগের সরকারি রেফারেন্স সংরক্ষণ করা। অভিযোগের মাধ্যমে বকেয়া বেতন আদায়ের আইনি সুযোগ রয়েছে; তবে প্রতিটি মামলার ফল নির্ভর করবে প্রমাণ, চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।

FAQ

১. সৌদি আরবে বেতন আটকে রাখলে কোথায় অভিযোগ করবেন?

সৌদি মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের (MHRSD) ১৯৯১১ নম্বরে ফোন করে, সরকারি ই-সেবা পোর্টালে অথবা সংশ্লিষ্ট শ্রম অফিসে অভিযোগ জানানো যায়।

২. সৌদি আরবে বেতন না পেলে বাংলাদেশ দূতাবাসে অভিযোগ করা যাবে?

হ্যাঁ। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইন নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি ও শ্রম আদালতে কর্মীদের দাবি আদায়ে সহায়তা করে। রিয়াদের শ্রমকল্যাণ উইনের টোল-ফ্রি নম্বর 8001000125।

৩. বেতন আটকে রাখার অভিযোগ করতে কী কী কাগজ লাগবে?

চাকরির চুক্তিপত্র, ইকামা, পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বেতনসংক্রান্ত মেসেজ এবং বকেয়া বেতনের হিসাব সংগ্রহ করা ভালো।

৪. সৌদি আরবে বেতন না পেলে কি শ্রম আদালতে যাওয়া যাবে?

হ্যাঁ। সাধারণ শ্রম বিরোধে প্রথমে MHRSD-এর সমঝোতা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সমাধান না হলে অভিযোগ শ্রম আদালতে পাঠানো হয়।

৫. সৌদি আরবে গৃহকর্মীর বেতন আটকে রাখলে কোথায় অভিযোগ করবেন?

গৃহকর্মী ও ব্যক্তিগত চালকদের মতো কর্মীদের ক্ষেত্রে Musaned প্ল্যাটফর্মের Friendly Settlement সেবা ব্যবহার করতে হয়। তাঁদের অভিযোগের পদ্ধতি সাধারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের থেকে আলাদা।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: