সৌদি আরবের ফ্রি ভিসা কী, এতে কী কী ঝুঁকি রয়েছে?
সৌদি আরবে যাওয়ার আগে ‘ফ্রি ভিসা’ শব্দটি শুনে অনেকেই মনে করেন, এই ভিসায় দেশটিতে পৌঁছে নিজের পছন্দমতো যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করা যাবে। কেউ কেউ আবার বেশি বেতনের আশায় দালাল বা মধ্যস্থতাকারীকে বিপুল টাকা দিয়ে এমন ভিসা সংগ্রহ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সৌদি আরবের সরকারি ভিসা ব্যবস্থায় ‘ফ্রি ভিসা’ নামে আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মভিসা নেই। সাধারণত নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার অধীনে কাজের ভিসা নিয়ে গিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে বা নিজের উদ্যোগে কাজ করার অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে বাংলাদেশে ফ্রি ভিসা বলা হয়।
এই ব্যবস্থায় বিদেশে যাওয়ার পর কাজ পাওয়া, বেতন পাওয়া কিংবা বৈধভাবে কর্মসংস্থান চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। সৌদি আরবের শ্রম আইনে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করে অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করা বা নিজের হিসাবে কাজ করার সুযোগ নেই। ফলে ফ্রি ভিসার নামে প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাউকে পাঠানো হলে তিনি আর্থিক ক্ষতি, আইনি জটিলতা ও অনিশ্চিত কর্মজীবনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
সৌদি আরবের ফ্রি ভিসা বলতে কী বোঝায়?
সৌদি আরবে বিদেশি কর্মীদের কাজের জন্য সাধারণত নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক থাকতে হয়। সেই নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করার জন্য ওয়ার্ক পারমিট ও প্রয়োজনীয় আবাসিক অনুমতির ব্যবস্থা করা হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে প্রচলিত ‘ফ্রি ভিসা’ বলতে সাধারণত এমন একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে যান, কিন্তু তাঁকে বলা হয় সেখানে পৌঁছে অন্য জায়গায় কাজ খুঁজে নিতে পারবেন। অনেক ক্ষেত্রে ভিসার স্পনসর বা নিয়োগকর্তাকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেওয়ার বিনিময়ে অন্যত্র কাজ করার সুযোগ পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
এখানেই মূল সমস্যা। ভিসা থাকলেই ইচ্ছামতো যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার আইনগত অনুমতি পাওয়া যায় না। কাজের ধরন, নিয়োগকর্তা এবং ওয়ার্ক পারমিটের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব কর্মসংস্থানের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
সৌদি আরবে ফ্রি ভিসায় কী কী ঝুঁকি রয়েছে?
১. বৈধভাবে কাজ করতে না পারার ঝুঁকি
কোনো কর্মী যে নিয়োগকর্তার অধীনে নিবন্ধিত, নিয়ম মেনে অনুমোদন বা কর্মী স্থানান্তর না করে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে সৌদি শ্রম আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। এতে কর্মী ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তা উভয়েই আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।
২. কাজ না পাওয়ার আশঙ্কা
ফ্রি ভিসার নামে অনেক সময় বলা হয়, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর সহজেই কাজ পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। কর্মীকে দীর্ঘদিন বেকার থাকতে হতে পারে। ফলে নিজের থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
৩. বেতন ও কাজের নিশ্চয়তা না থাকা
নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে লিখিত চুক্তি ও কাজের শর্ত পরিষ্কার না থাকলে বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। কাজ না পেলে বা প্রতিশ্রুতির চেয়ে কম বেতন পেলে অভিযোগ জানানোও কঠিন হয়ে যায়।
৪. ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে জটিলতা
সৌদি আরবে বৈধভাবে বসবাস ও কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি ঠিক রাখা জরুরি। নিয়োগকর্তা এসব অনুমতি নবায়ন না করলে বা কর্মীর অবস্থা নিয়মবহির্ভূত হয়ে পড়লে তিনি নানা সমস্যায় পড়তে পারেন। ইকামা বা কাজের অনুমতির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি অবহেলা করলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
৫. জরিমানা, আটক ও দেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কা
অনুমোদিত নিয়মের বাইরে কাজ করা বা নিজের হিসাবে কাজ করার কারণে কর্তৃপক্ষের কাছে ধরা পড়লে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি ও লঙ্ঘনের ধরন অনুযায়ী জরিমানা, আটক, বহিষ্কার কিংবা অন্যান্য শাস্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
৬. দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর প্রতারণা
ফ্রি ভিসার নামে অনেক সময় বেশি টাকা নেওয়া হলেও কর্মীকে নির্দিষ্ট চাকরি, বেতন কিংবা নিরাপদ কর্মপরিবেশের নিশ্চয়তা দেওয়া হয় না। বিদেশে পৌঁছানোর পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া বা প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করার ঘটনাও ঘটতে পারে। তখন কর্মী আর্থিক ও আইনি সংকটে পড়েন।
সৌদি আরবের শ্রম আইনে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজের নিয়ম কী?
সৌদি আরবের শ্রম আইনের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো নিয়োগকর্তা তাঁর কর্মীকে অন্যের অধীনে কাজ করতে দিতে পারেন না। একইভাবে কর্মীও অনুমোদিত প্রক্রিয়া ছাড়া অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে বা নিজের হিসাবে কাজ করতে পারেন না।
তবে সৌদি আরবে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের জন্য বৈধ কর্মী স্থানান্তর ব্যবস্থা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নতুন নিয়োগকর্তাকে নির্ধারিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় কর্মী স্থানান্তরের আবেদন করতে হয়। অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে কর্মী নতুন প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করতে পারেন।
অর্থাৎ, অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ একেবারে নেই—বিষয়টি এমন নয়। তবে সেই সুযোগ নিতে হলে সরকারি নিয়ম মেনে নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করতে হবে। শুধু স্পনসরের মৌখিক অনুমতি বা দালালের আশ্বাস যথেষ্ট নয়।
সৌদি আরবে যাওয়ার আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন
ফ্রি ভিসা বা অন্য কোনো কর্মভিসায় বিদেশে যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
ভিসাটি প্রকৃতপক্ষে কাজের ভিসা কি না যাচাই করুন।
ভিসায় উল্লেখ করা নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নিশ্চিত করুন।
কোন পদে কাজ করবেন, মাসিক বেতন কত এবং কর্মস্থল কোথায়—এসব লিখিতভাবে জেনে নিন।
নিয়োগচুক্তিতে বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার শর্ত দেখুন।
যে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছেন, সেটির বৈধ লাইসেন্স আছে কি না যাচাই করুন।
ভিসা ও চাকরির তথ্যের সঙ্গে বাস্তব নিয়োগের শর্ত মিলিয়ে নিন।
বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার আগে বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র বা ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন।
কোনো ব্যক্তি যদি বলেন, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর ইচ্ছামতো যেকোনো জায়গায় কাজ করা যাবে, তাহলে তাঁর কাছ থেকে সেই ব্যবস্থার বৈধতার প্রমাণ চাইতে হবে। শুধু মুখের কথায় টাকা দেওয়া বা বিদেশযাত্রার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
বৈধভাবে সৌদি আরবে কাজের জন্য কোথায় যোগাযোগ করবেন?
বাংলাদেশ থেকে কর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যাওয়ার আগে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য ও ছাড়পত্রের বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত। ভিসা, নিয়োগকর্তা ও রিক্রুটিং এজেন্সির তথ্য যাচাই করে তারপর বিদেশযাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া নিরাপদ।
বিদেশগামী কর্মীরা বিএমইটির সরকারি ওয়েবসাইটে ভিসা যাচাই, বহির্গমন ছাড়পত্র এবং প্রাক্-বহির্গমন প্রস্তুতি সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন। প্রয়োজনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও যোগাযোগ করা যায়।
সৌদি আরবে কাজের সুযোগ পেতে গিয়ে শুধু ভিসার নাম বা কম খরচের প্রস্তাব দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বৈধ নিয়োগকর্তা, লিখিত চাকরির চুক্তি, নির্ধারিত বেতন এবং কাজের অনুমতি নিশ্চিত করেই বিদেশে যাওয়া উচিত। কারণ বিদেশে পৌঁছানোর পর অনিশ্চিত কাজ ও আইনি জটিলতায় পড়ার চেয়ে দেশ থেকেই সঠিক তথ্য যাচাই করা অনেক বেশি নিরাপদ।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: সৌদি আরবের ফ্রি ভিসা কি সরকারি কোনো ভিসা ক্যাটাগরি?
উত্তর: না। ‘ফ্রি ভিসা’ নামে সৌদি আরবের সরকারি কোনো স্বতন্ত্র কর্মভিসা ক্যাটাগরি নেই। এটি বাংলাদেশে প্রচলিত একটি অনানুষ্ঠানিক শব্দ।
প্রশ্ন: ফ্রি ভিসায় সৌদি আরবে গিয়ে কি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করা যায়?
উত্তর: না। নির্ধারিত নিয়মে নিয়োগকর্তা পরিবর্তন বা কর্মী স্থানান্তর সম্পন্ন না করে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করা আইনগত জটিলতা তৈরি করতে পারে।
প্রশ্ন: সৌদি আরবে ফ্রি ভিসায় গেলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?
উত্তর: কাজ না পাওয়া, বেতন না পাওয়া, ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে জটিলতা, প্রতারণা এবং আইন লঙ্ঘনের কারণে জরিমানা বা দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি থাকতে পারে।
প্রশ্ন: সৌদি আরবে বৈধভাবে নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করা যায় কি?
উত্তর: হ্যাঁ। সৌদি আরবে নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ায় কর্মী স্থানান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করা যায়।
প্রশ্ন: সৌদি আরবে যাওয়ার আগে ভিসা ও চাকরির তথ্য কোথায় যাচাই করবেন?
উত্তর: বাংলাদেশে বিএমইটি এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা যায়। ভিসা, নিয়োগকর্তা, চাকরির চুক্তি ও বহির্গমন ছাড়পত্র নিশ্চিত করা জরুরি।
আল-মামুন/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- ওয়ারিশ সনদ দিয়ে জমি নামজারি করার নিয়ম, জানুন বিস্তারিত
- বাংলাদেশ বনাম ভুটান ম্যাচ আজ, কখন, কোথায় ও কীভাবে দেখবেন লাইভ?
- বাংলাদেশ বনাম ভুটান ম্যাচ: ৯০ মিনিটের খেলা শেষ, জানুন ফলাফল
- জমির মালিকের নাম দিয়ে খতিয়ান খুঁজবেন যেভাবে
- বাংলাদেশ বনাম ভুটান ম্যাচ আজ: লাইভ দেখার সহজ উপায়
- চলছে বাংলাদেশ বনাম ভুটান ম্যাচ: ৩০ মিনিট শেষ, সরাসরি দেখুন Live
- অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ: বাংলাদেশ বনাম আফগানিস্তান সর্বশেষ স্কোর
- বাংলাদেশ বনাম ভুটান ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, জানুন ফলাফল
- অনলাইনে নামজারি আবেদন করবেন যেভাবে, লাগবে যেসব কাগজ
- রাত ৮টায় বাংলাদেশ-ভুটান ম্যাচ, টিভি ও মোবাইলে দেখার নিয়ম
- বাংলাদেশ বনাম ভুটান ম্যাচ আজ: সময়, লাইভ দেখার উপায় ও পরিসংখ্যান
- Hero Xtreme 250R: দাম, মাইলেজ ও সম্পূর্ণ স্পেসিফিকেশন
- বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভিযানে নিহত সৈনিক, উদ্ধার ৫৭ জিম্মি
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ১৭টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- বাংলাদেশ বনাম ভুটান ম্যাচ কবে, কখন ও কোথায় লাইভ দেখবেন?