শেয়ারবাজারে আসছে বড় পরিবর্তন
দেশের পুঁজিবাজারকে একটি নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ কাঠামোয় রূপান্তর করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। বাজারকে শক্তিশালী ও স্থায়ী স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে গত রবিবার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কার্যালয় পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি। এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল বাজার সংশ্লিষ্টদের মনোবল বৃদ্ধি এবং সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের নীতিগত সহায়তা বজায় রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করা।
উল্লেখ্য, গত ২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর বিএসইসি কার্যালয়ে এটিই ছিল তানভীর গনির প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর। এই সফরকে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে শেয়ারবাজারের প্রতি দেওয়া বিশেষ গুরুত্ব ও কঠোর নজরদারির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহলের বিশেষজ্ঞরা।
বিএসইসি চেয়ারম্যানের সাথে বিশেষ বৈঠক
বিএসইসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকালে সংস্থাটির কার্যালয়ে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীকে স্বাগত জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং অন্যান্য কমিশনারগণ। বৈঠকের শুরুতে তানভীর গনিকে বর্তমান বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন প্রতিকূলতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং প্রদান করা হয়। একইসঙ্গে বাজারের আমূল পরিবর্তনে বিএসইসি যে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সে বিষয়েও তাকে অবহিত করা হয়।
তিন ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও মূল লক্ষ্য
প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী চলা এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। আলোচনার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ছিল—বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার, কারসাজি চক্রের অপতৎপরতা বন্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তানভীর গনি বিএসইসি কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের পুঁজিবাজার গড়ে তোলার যাত্রায় সরকারের নীতিগত সমর্থন সবসময় অব্যাহত থাকবে।
আধুনিক বাজার গঠনে ব্যক্তিগত আগ্রহ
তানভীর গনি একটি যুগোপযোগী ও টেকসই শেয়ারবাজার গঠনের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে তিনি বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার বিষয়েও খোঁজখবর নেন। তিনি জানান, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ফেরাতে কমিশনের প্রতিটি কার্যকর পদক্ষেপকে সরকার সমর্থন করবে এবং ভবিষ্যতে বাজারকে আরও গতিশীল ও আধুনিক করার ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
সংস্কারের পথচিত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই সরাসরি তদারকি বিনিয়োগকারীদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করবে। যদি যথাযথ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাজার দ্রুত একটি লাভজনক অবস্থানে ফিরে আসবে।
বাজার সংস্কারের এই গুরুত্ব কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বেশ আলোচিত। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে শেয়ারবাজার সংস্কারের একটি বিস্তৃত ব্লু-প্রিন্ট তুলে ধরেছে। এতে বিএসইসির পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে একটি স্বতন্ত্র সংস্কার কমিশন গঠন, বন্ড ও ইক্যুইটি মার্কেটের বিকাশ, সুকুক ও করপোরেট বন্ড প্রবর্তন এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মতো আধুনিক পরিকল্পনাগুলোর কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও ব্লকচেইন প্রযুক্তির সংযোজন এবং শেয়ারবাজার ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিএনপির সংস্কার ভাবনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংস্কারমুখী চিন্তা—সব মিলিয়ে দেশের শেয়ারবাজার একটি বড় পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তানভির ইসলাম/