Md Razib Ali
Senior Reporter
৬২ ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকা প্রকাশ, সতর্ক ডিএসই
দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—উৎপাদন বন্ধ ও দুর্বল আর্থিক অবস্থার কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্য না জেনে, গুজব ও কারসাজির ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বারবার বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সম্প্রতি বাজারে তালিকাভুক্ত ৬২টি উৎপাদন বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করেছে। এসব কোম্পানির অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, উৎপাদন বন্ধ বা চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে। তবুও আশ্চর্যজনকভাবে এসব শেয়ারে বিনিয়োগ ও লেনদেন অব্যাহত আছে, এবং কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দাম বাড়ার ঘটনাও ঘটছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েক মাসে এসব দুর্বল কোম্পানির কিছু শেয়ারের দাম ৮০ শতাংশ থেকে শুরু করে ২৪৬ শতাংশ পর্যন্ত হঠাৎ বেড়েছে। এরপর আবার দ্রুত পতন ঘটেছে। এই অস্বাভাবিক ওঠানামার কারণে যারা উচ্চ দামে শেয়ার কিনেছেন, তারা অল্প সময়ের মধ্যেই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কোনো স্বাভাবিক বাজার আচরণ নয়। বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্র গুজব ছড়িয়ে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ায়। পরে উচ্চ দামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে তারা বাজার থেকে বেরিয়ে যায়, আর ক্ষতির দায় পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্বাভাবিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা, কিছু ক্ষেত্রে লেনদেন সাময়িক স্থগিত এবং দুর্বল কোম্পানির জন্য সার্কিট ব্রেকার নীতিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ।
ডিএসইর তালিকা অনুযায়ী অনেক কোম্পানি বছরের পর বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখে কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। কিছু কোম্পানির আর্থিক অবস্থা এতটাই দুর্বল যে তাদের শেয়ারকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবুও এসব শেয়ারকে ঘিরে বাজারে জল্পনা-কল্পনা চলছেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা কম এবং অনেক বিনিয়োগকারীর পর্যাপ্ত বিনিয়োগ শিক্ষা না থাকায় তারা দ্রুত লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এতে তারা বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, বাজারে ভালো শেয়ারের ঘাটতি এবং বিনিয়োগ জ্ঞানের অভাব—এই দুই কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দুর্বল কোম্পানির ফাঁদে পড়ছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম)-এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী স্বল্প সময়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ লাভের প্রত্যাশা করেন, যা বাস্তবসম্মত নয়। এই সুযোগে একটি চক্র বাজারে প্রভাব বিস্তার করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশ ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) নেতারা মনে করেন, দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেন স্থায়ীভাবে স্থগিত বা তালিকাচ্যুত করা উচিত। এতে বাজারে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সার্কিট ব্রেকার পরিবর্তন বা সাময়িক নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। বরং কোম্পানির মৌলভিত্তি যাচাই, দুর্বল ব্যবস্থাপনার পুনর্গঠন এবং কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা হলো—তথ্য না জেনে বিনিয়োগই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। দ্রুত লাভের আশায় বন্ধ বা দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করলে ক্ষতির সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
তানভির ইসলাম/