এআই ঘিরে নতুন শঙ্কা, বিশ্ববাজারে প্রযুক্তি ও চিপ শেয়ারে বড় ধাক্কা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এতদিনের উচ্ছ্বাসের জায়গায় এবার বাজারে ঢুকেছে সতর্কতার সুর। এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি মানুষের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের এমন সতর্কবার্তার পর বিনিয়োগকারীদের একাংশ মুনাফা তুলে নেওয়ার দিকে ঝুঁকেছেন। এর তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা গেছে এশিয়ার প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর শেয়ারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাকের ই-মিনি ফিউচারও প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ নেমেছে।
সোমবারের বাজারে সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে এআই অবকাঠামো, চিপ উৎপাদন ও এআই মডেল তৈরির সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে পতন ১০ শতাংশের কাছাকাছি বা তারও বেশি হয়েছে। ফলে এআইকেন্দ্রিক কোম্পানিগুলোর উচ্চ মূল্যায়ন এবং সামনে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
একসঙ্গে চাপের মুখে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও চীন
এআই বিনিয়োগের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারে সোমবার ব্যাপক বিক্রির চাপ দেখা যায়।
জাপানে ওপেনএআইয়ের অন্যতম বিনিয়োগকারী সফটব্যাংকের শেয়ার একপর্যায়ে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। একই দেশের মেমোরি চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়ার দর কমেছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। চিপ সরবরাহকারী টোকিও ইলেকট্রনের শেয়ারও ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় পরিস্থিতি ছিল একই রকম। এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শেয়ার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে।
তাইওয়ানে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ।
চীনের সাংহাই বাজারে মেমোরি চিপ নির্মাতা সিএক্সএমটির শেয়ার সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের শেয়ার ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
হংকংয়ে পতনের চিত্র আরও তীব্র ছিল। ঝংজি ইনোলাইটের শেয়ার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, মিনিম্যাক্স ৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং এআই মডেল নির্মাতা জেডএআইয়ের শেয়ার সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
বাজারে প্রশ্ন উঠছে এআই বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে
এআই সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্য দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করে বেড়েছে। ফলে এআইয়ের বিকাশের গতি নিয়ে সংশয় দেখা দিলে এসব কোম্পানির বর্তমান মূল্যায়নও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা হলো, এআইয়ের উন্নয়ন যদি প্রত্যাশিত গতিতে না এগোয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মুনাফা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সোমবারের বিক্রির চাপকে সেই আশঙ্কার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন তারা।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্যাক্সো ব্যাংকের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানা মনে করেন, অন্তত স্বল্পমেয়াদে এআই ও চিপ নির্মাতা কোম্পানির শেয়ারে এসব সতর্কবার্তার প্রভাব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে শক্তিশালী চাহিদা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অব্যাহত থাকার প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
লন্ডনভিত্তিক টি রো প্রাইসের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক সেবাস্তিয়েন মালেটের পর্যবেক্ষণও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এআই যে বিশ্বকে পরিবর্তন করবে, সেটি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম। কিন্তু এআই অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও প্রতিটি বিনিয়োগ থেকে আকর্ষণীয় আর্থিক রিটার্ন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
আমোদেইয়ের সতর্কবার্তা থেকেই নতুন আলোচনার শুরু
বাজারের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইয়ের বক্তব্য। শনিবার প্রকাশিত এক লেখায় তিনি এআই মডেলের সক্ষমতা বাড়ানোর গতি কমানোর আহ্বান জানান।
আমোদেইয়ের আশঙ্কা, আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে এআই এজেন্ট এমন ক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যার মাধ্যমে পুরো ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এমন পরিস্থিতি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
এআইয়ের অপব্যবহারের বাস্তব ঝুঁকিও আলোচনায় এসেছে। অ্যানথ্রপিকের একটি হুমকি বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির তৈরি ক্লড এআই মডেল অস্ত্র তৈরি, সাইবার হামলা, নজরদারি এবং প্রতারণার মতো কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
ফলে এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সেই প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও এখন বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের অংশ হয়ে উঠেছে।
একই উদ্বেগ ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের
এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে আমোদেই একা নন। এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অল্টম্যান এআইয়ের কারণে মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য তৈরি হওয়া ঝুঁকিকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে চলতি বছর ওপেনএআইকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনাও এগোবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
এই বক্তব্যগুলোর পর বাজারে মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—এআইয়ের উন্নয়ন কি আগের প্রত্যাশিত গতিতেই চলবে এবং এই খাতে করা বিপুল বিনিয়োগ ভবিষ্যতে কতটা আর্থিক ফল দেবে?
২০২২ সালের পর বদলে গেছে বাজারের হিসাব
২০২২ সালে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ে বিনিয়োগের প্রবাহ দ্রুত বাড়ে। এআই সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারও বৈশ্বিক পুঁজিবাজারের উত্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
তবে এখন সেই প্রবৃদ্ধির গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়েকটি নতুন উদ্বেগ। এআই এজেন্ট ব্যবহার করে সাইবার হামলার সম্ভাবনা, ডেটা সেন্টার নির্মাণকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ এবং এআই অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর তার বিপরীতে প্রত্যাশিত রিটার্ন পাওয়া যাবে কি না—এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
সনি ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ তাকায়ুকি মিয়াজিমার মতে, এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বানের পর টোকিওর এআই ও সেমিকন্ডাক্টর সংশ্লিষ্ট শেয়ারে বিক্রির চাপ তৈরি হতে পারে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ঘিরে অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-চীন
প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ শুধু শেয়ারবাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি মাসে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অংশ হিসেবে বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে এআইয়ের অগ্রগতি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহীর সতর্কবার্তার সমালোচনা করেছে। তাদের দৃষ্টিতে, এ ধরনের বক্তব্য চীনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার কৌশল।
যুক্তরাষ্ট্রে আবার ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার তিনি এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারীদের সমালোচনা করেন। সমালোচকদের অত্যন্ত নেতিবাচক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রকে এআই শিল্পে নেতৃত্ব ধরে রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সামনে মূল্যায়ন ও আস্থার পরীক্ষা
এআই নিয়ে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের সতর্কতা এবং বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে আর্থিক রিটার্ন নিয়ে প্রশ্ন—দুই দিক থেকেই এখন চাপ তৈরি হয়েছে প্রযুক্তি শেয়ারে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং একই সঙ্গে এআই অবকাঠামোতে করা বিনিয়োগের প্রত্যাশিত রিটার্ন নিয়ে সংশয় বাড়ে, তাহলে কোম্পানিগুলোর মূল্যায়নে তার প্রভাব পড়তে পারে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রযুক্তি শেয়ারের গতিপথও বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সোমবার এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে প্রযুক্তি ও চিপ শেয়ারের বড় দরপতন তাই শুধু এক দিনের বিক্রির ঘটনা নয়; এআই খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের আর্থিক ফল—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে বাজারে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তারও প্রতিফলন।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- আপনার নামে কত জমি আছে, কোথায় কোথায় আছে—অনলাইনে জানবেন যেভাবে
- জমির নামজারি করতে কী কী লাগে, খরচ কত ও সময় কত দিন?
- Honor Magic9 Pro Max: ৮৮০০mAh ব্যাটারি ও ডুয়াল ২০০MP ক্যামেরা
- ৬ কোম্পানির ডিভিডেন্ড ঘোষণা
- ওয়ারিশ সনদ দিয়ে জমি নামজারি করবেন যেভাবে, জানুন নিয়ম
- আজকের সোনার দাম: ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেটের নতুন দর
- আজকের সোনার দাম: প্রতি ভরি ১৮, ২১, ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম কত
- জিকিউ বলপেনের ১২.৫০% নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা
- iQOO Neo 12: ১৮৫Hz ডিসপ্লে ও ৯০০০mAh ব্যাটারির চমক
- আজকের সোনার দাম কত? ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেটের নতুন দর
- Infinix Smart 20E: ১২০Hz ডিসপ্লে ও বড় ব্যাটারি?
- অনলাইনে জমির নামজারি করবেন যেভাবে, খরচ ১১৭০ টাকা