ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

আইপিও ছাড়াই শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ, বিএসইসির নতুন খসড়া

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৩ ১১:৫৪:০৬
আইপিও ছাড়াই শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ, বিএসইসির নতুন খসড়া

দেশের শেয়ারবাজারে মানসম্পন্ন সিকিউরিটিজের সরবরাহ বাড়ানো এবং বড় ও যোগ্য কোম্পানিগুলোকে দ্রুত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ দিতে ডাইরেক্ট লিস্টিং রুলস, ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

নতুন প্রস্তাবে আইপিও ছাড়াই বিদ্যমান শেয়ার অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। খসড়াটির ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারী, বাজার মধ্যস্থতাকারী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছ থেকে লিখিত মতামত চেয়েছে কমিশন।

বিএসইসির অনুমোদিত খসড়ার ওপর আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ডাকযোগে অথবা নির্ধারিত ই-মেইলে মতামত দেওয়া যাবে।

বিধিমালাটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশিত হলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের বিদ্যমান লিস্টিং রেগুলেশনের ডাইরেক্ট লিস্টিং-সংক্রান্ত ৮ থেকে ১৩ নম্বর প্রবিধান রহিত হবে।

আইপিও ছাড়াই তালিকাভুক্তির সুযোগ

প্রস্তাবিত বিধিমালার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের জন্য কোম্পানিকে নতুন মূলধন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আইপিওতে যেতে হবে না।

বিদ্যমান উদ্যোক্তা ও প্রধান শেয়ারহোল্ডাররা তাঁদের হাতে থাকা শেয়ারের নির্দিষ্ট অংশ অফলোড বা বাজারে বিক্রি করে কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্ত করতে পারবেন।

সাধারণ ও বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২০ শতাংশ শেয়ার অফলোড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর সরকারি বা বৈদেশিক মালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোড করতে হবে।

তবে এসব শেয়ার বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ কোম্পানির তহবিলে যাবে না। অর্থ সরাসরি শেয়ার বিক্রয়কারী স্পন্সর বা মালিকদের কাছে যাবে।

কোন কোম্পানি ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে আসতে পারবে

খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির বড় ও আর্থিকভাবে সক্ষম কোম্পানিই ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ পাবে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • সরকারের সম্পূর্ণ বা অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান;
  • অন্তত ১০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সরকারি শেয়ার থাকা কোম্পানি;
  • বাংলাদেশে পরিচালিত অন্তত ৫১ শতাংশ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ বৈদেশিক মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানি;
  • বিটিআরসি অনুমোদিত টেলিকম ও আইসিটি অবকাঠামো বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, যাদের পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা;
  • অন্তত তিন বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রমে থাকা ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান;
  • ৫০০ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক টার্নওভার বা মোট সম্পদ রয়েছে—এমন বড় শিল্পগোষ্ঠী।

থাকতে হবে তিন বছরের ব্যবসায়িক রেকর্ড

ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে আসতে হলে প্রতিষ্ঠানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হতে হবে এবং টানা অন্তত তিন বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার রেকর্ড থাকতে হবে।

এ ছাড়া সর্বশেষ দুই অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন, পরিচালন কার্যক্রম থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ এবং কোনো সঞ্চিত ক্ষতি না থাকার শর্ত রাখা হয়েছে।

সিআইবি অনুযায়ী ঋণখেলাপি অথবা ইনভেস্টমেন্ট গ্রেডের নিচে ক্রেডিট রেটিং পাওয়া কোম্পানি ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের জন্য আবেদন করতে পারবে না।

আবেদনের সঙ্গে সর্বশেষ তিন বছরের আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

শেয়ারের দাম নির্ধারণে নতুন পদ্ধতি

ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের আগে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে অন্তত দুটি স্বতন্ত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে রেফারেন্স প্রাইস নির্ধারণ করতে হবে।

এর মধ্যে একটি হতে হবে অ্যাবসোলিউট ভ্যালুয়েশন, যেমন—ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো (DCF) বা রেসিডিউয়াল ইনকাম। অন্যটি হতে হবে রিলেটিভ ভ্যালুয়েশন, যেমন—পিই রেশিও বা ইভি/ইবিটডা।

রেফারেন্স প্রাইসের অন্তত ২০ শতাংশ কমে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে।

প্রথম ৩০ মিনিট থাকবে প্রাইস ডিসকভারি

তালিকাভুক্তির প্রথম ৩০ মিনিট প্রাইস ডিসকভারি পিরিয়ড হিসেবে থাকবে। এ সময়ে শুধু বিড গ্রহণ করা হবে।

প্রথম দুই দিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্পট মার্কেটে লেনদেন হবে। এ সময়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কেনা শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না।

তৃতীয় দিন লেনদেন বন্ধ রেখে সেটেলমেন্ট সম্পন্ন করা হবে। এরপর চতুর্থ কার্যদিবস থেকে শেয়ারটির স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হবে।

স্পন্সর-পরিচালকদের ৩০% শেয়ার রাখতে হবে

তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির স্পন্সর ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে।

এ ছাড়া তালিকাভুক্তির প্রথম পাঁচ ট্রেডিং দিনে একজন বিনিয়োগকারী একক অর্ডারে সর্বোচ্চ ১ হাজার শেয়ার কিনতে বা অর্ডার দিতে পারবেন।

নির্ধারিত সময় পর্যন্ত স্পন্সর ও পরিচালকরা নতুন শেয়ার কেনা এবং ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সময় অফলোড করা শেয়ারের বাইরে অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না।

মার্চেন্ট ব্যাংকারসহ সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ

পুরো প্রক্রিয়ায় মার্চেন্ট ব্যাংকার, নিরীক্ষক, সম্পদ মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।

তথ্য গোপন করা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতার বিধানও রাখা হয়েছে।

একজন মার্চেন্ট ব্যাংকারকে ডিউ ডিলিজেন্স সার্টিফিকেট এবং ইনফরমেশন ডকুমেন্ট প্রকাশের দায়িত্ব নিতে হবে।

৩০ দিনের মধ্যে আবেদনের সিদ্ধান্ত

স্টক এক্সচেঞ্জে আবেদন করার সময় নির্ধারিত প্রক্রিয়াকরণ ফি দিতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জকে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।

আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বিএসইসির কাছে আপিল করার সুযোগ থাকবে।

খসড়াটি চূড়ান্ত হয়ে গেজেট প্রকাশিত হলে নির্দিষ্ট শ্রেণির বড় ও যোগ্য কোম্পানির জন্য আইপিও ছাড়াই সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার নতুন পথ তৈরি হবে। এতে বাজারে মানসম্পন্ন সিকিউরিটিজের সরবরাহ বাড়বে এবং বড় কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ