ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩

Md Razib Ali

Senior Reporter

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না খেলার নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল, তদন্তে যা উঠে এলো

খেলা ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৫ ১৯:২২:৪৬
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না খেলার নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল, তদন্তে যা উঠে এলো

যোগ্যতা অর্জনের পরও ২০২৬ সালের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলা হয়নি। কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, তার অনুসন্ধানে সামনে এসেছে ক্রিকেটের বাইরের একাধিক কারণ। তদন্ত প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, আইসিসি ও বিসিবির মতবিরোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতাকে ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জায়গায় বিশ্বকাপে নেওয়া হয় স্কটল্যান্ডকে।

‘তদন্ত প্রতিবেদন: ২০২৬ আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অংশ না নেওয়ার কারণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, মাঠের পারফরম্যান্সের কারণে বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়নি। ভারতের মাটিতে খেলতে যাওয়া নিয়ে নিরাপত্তা প্রশ্ন এবং ভেন্যু বদলের দাবি ঘিরে আইসিসির সঙ্গে দীর্ঘ বিরোধই পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যার পর বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে সরে যায় অথবা কার্যত বাদ পড়ে।

সিদ্ধান্তের আগে তৈরি হয়েছিল একাধিক সংকট

ঘটনার সূত্রপাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ছিল ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলের কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা। এতে বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও আরও বেড়ে যায়।

এই পরিস্থিতির পর ভারত সফরে গিয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলার বিষয়ে আপত্তি জানায় বাংলাদেশ। তবে তখনও বিশ্বকাপ থেকে সরে যাওয়ার কথা জানানো হয়নি।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিকল্প পথ হিসেবে দুটি দাবি সামনে আসে—ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে নেওয়া অথবা বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা। কিন্তু আইসিসি তাতে সম্মতি দেয়নি।

আইসিসির অবস্থান ছিল, ভারতে বাংলাদেশের ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য বা যাচাইযোগ্য’ নিরাপত্তা হুমকির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সেই কারণে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশকে খেলতে হবে বলে জানানো হয়।

খেলতে চেয়েও মাঠে নামতে পারেননি ক্রিকেটাররা

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা খেলোয়াড় ও দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বিশ্বকাপে খেলার প্রস্তুতি ছিল।

টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত জানিয়েছেন, দল ভালো প্রস্তুতি এবং মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য তৈরি ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানিয়ে সরকার বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় খেলোয়াড়দের সেই প্রস্তুতি ও বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।

শান্তের বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে আর কারা ওই সিদ্ধান্তের পক্ষে ছিলেন, তা তিনি নিশ্চিত ছিলেন না।

টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাসও জানিয়েছেন, খেলোয়াড়েরা বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। ভেন্যু নিয়ে দলের কিছু অনীহা থাকলেও ভারতীয় ভেন্যুর তুলনায় শ্রীলঙ্কাকে তারা পছন্দ করতেন। শেষ পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার অবস্থানেই ছিলেন ক্রিকেটাররা।

সিনিয়র সহকারী কোচ সালাহউদ্দিনের বক্তব্যও প্রতিবেদনে একই দিক নির্দেশ করে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপে খেলার আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে খেলোয়াড়দের সেই সুযোগ হয়নি।

কোথায় ছিল সমন্বয়ের ঘাটতি?

বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নেও তদন্ত প্রতিবেদনে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুবুল আলম জানিয়েছেন, তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তাকে একটি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হতে বলেছিলেন এবং সেখানেই মূল সিদ্ধান্তটি উপদেষ্টা নিয়েছিলেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্তের আগে বিসিবির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি। অথচ ক্রিকেট দলের নিরাপত্তা মূল্যায়ন সাধারণত বিসিবির মাধ্যমেই করা হয়। এ কারণে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—সরকার আদৌ আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন করেছিল কি না এবং সিদ্ধান্তের আগে বিসিবির মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না। তার বক্তব্য স্পষ্ট, বিসিবির মতামত নেওয়া হয়নি।

সরকারের হস্তক্ষেপের পাশাপাশি বিসিবির ভূমিকা নিয়েও প্রতিবেদনে সমালোচনা রয়েছে। কয়েকজন সাবেক ক্রিকেটার, ক্রীড়া সাংবাদিক ও বিশ্লেষকের বক্তব্যে বলা হয়েছে, সংকটের সময় বোর্ড যথেষ্ট কৌশলী ভূমিকা রাখতে পারেনি।

সমাধানের পথ কি খোলা ছিল?

সাবেক বাংলাদেশ অধিনায়ক ও বর্তমানে বিসিবির সভাপতি হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তামিম ইকবাল মনে করেন, পরিস্থিতি অন্যভাবে সামাল দেওয়ার সুযোগ ছিল।

তার বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার ও বিসিবির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং আইসিসির সঙ্গে আলোচনায় আরও কূটনৈতিক পন্থা নেওয়া যেত। একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের স্বার্থ সামনে রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার সুযোগ ছিল।

বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজা-উজ্জামান রাজীবের বক্তব্যেও প্রস্তুতিপর্বের ঘাটতির বিষয়টি এসেছে। তার মতে, বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর মতো সিদ্ধান্তের আগে যথাযথ প্রক্রিয়া ও কৌশলগত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন ছিল।

তার দৃষ্টিতে, একজন খেলোয়াড়কে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে পুরো জাতীয় দলের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনার আগে আরও বিস্তৃত মূল্যায়ন প্রয়োজন ছিল।

সাবেক বিসিবি পরিচালক সৈয়দ আশরাফুল হকও নিরাপত্তার প্রশ্নে এত কঠোর সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন। তার মতে, জাতীয় দলের জন্য আলাদা ও উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে মুস্তাফিজের আইপিএল-সংক্রান্ত বিষয়টি একটি ঘরোয়া লিগের ঘটনা হওয়ায় সেটিকে আইসিসির আন্তর্জাতিক বিশ্বকাপের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা উচিত হয়নি।

আইসিসির অবস্থানও ছিল সংকটের অংশ

তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে শুধু বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত বা বিসিবির ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। আইসিসি ও বিসিবির মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টিও বিশ্লেষণে এসেছে।

বিশ্লেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের বিশাল বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং টুর্নামেন্ট আয়োজন নির্বিঘ্ন রাখার প্রয়োজনীয়তার কারণে আইসিসি ভেন্যু পরিবর্তনের দাবিতে কঠোর অবস্থান নেয়। বিপরীতে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত।

এ নিয়ে আইসিসির সমালোচনাও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টুর্নামেন্টের স্থিতিশীলতাকে সমঝোতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংস্থাটির বিরুদ্ধে। একই সময়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও আইসিসির সঙ্গে আলোচনার জন্য পর্যাপ্ত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষতির পরিধি শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নয়

বিশ্বকাপ না খেলায় বাংলাদেশের সম্ভাব্য আইসিসি আয়, বৈশ্বিক প্রচার, র‌্যাংকিংয়ে অগ্রগতির সুযোগ এবং স্পনসরশিপের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এর প্রভাব আরও গভীর জায়গায় পড়েছে খেলোয়াড়দের ওপর। জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা একটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর বিশ্বকাপ দেখার প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি।

সমর্থকদের প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভ, হতাশা ও দুঃখ প্রকাশ পেয়েছে। পাশাপাশি ‘রাজনীতি ক্রিকেটকে ধ্বংস করেছে’—এমন ধারণার কথাও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ভবিষ্যতের জন্য কী করতে বলেছে তদন্ত

ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তদন্ত প্রতিবেদনে কয়েকটি দিক সামনে আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে রাজনৈতিক বিরোধ থেকে যতটা সম্ভব পৃথক রাখা এবং বিসিবির সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও কাঠামো আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সংকটের সময় যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে প্রকৃত উদ্বেগ দেখা দিলে স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেই মূল্যায়নের ফল খেলোয়াড়, আইসিসি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অবস্থান সুরক্ষিত রাখা এবং ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া-সংক্রান্ত বিরোধ মোকাবিলায় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিসিবিকে একসঙ্গে নিয়ে একটি জাতীয় ক্রীড়া কূটনীতি কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ হলো, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ঘটনাটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য একটি বড় শিক্ষা। ভূরাজনীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, গণমাধ্যমের চাপ এবং ক্রিকেট পরিচালনার দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করলে ক্রিকেটীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও একটি দল বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যেতে পারে—এই বাস্তবতাই ঘটনাটির মাধ্যমে সামনে এসেছে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ