অ্যানথ্রাক্স থেকে বাঁচতে কী করবেন, জানুন সংক্রমণ ও প্রতিরোধ
গরু বা অন্য গবাদিপশুর মধ্যে অ্যানথ্রাক্স দেখা দিলে মানুষের মধ্যেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আক্রান্ত পশু জবাই করা, তার মাংস বা অন্য প্রাণিজ পণ্যের সংস্পর্শে আসা এবং আক্রান্ত পশুর মাংস খাওয়ার মাধ্যমে মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু মাটিতেও দীর্ঘ সময় থাকতে পারে। তাই রোগটি শুধু পশুর জন্য নয়, মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্যঝুঁকি।
অ্যানথ্রাক্সের বৈজ্ঞানিক নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে Bacillus anthracis নামের স্পোর তৈরি করতে সক্ষম একটি ব্যাকটেরিয়া। সাধারণত গবাদিপশু ও বন্য তৃণভোজী প্রাণীর মধ্যে এ রোগ দেখা যায়। মানুষ আক্রান্ত হয় মূলত সংক্রমিত প্রাণী বা দূষিত প্রাণিজ পণ্যের সংস্পর্শে এলে।
অ্যানথ্রাক্স কী?
অ্যানথ্রাক্স একটি গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। এর জীবাণু মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে থাকতে পারে এবং গবাদিপশু এটির সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হতে পারে। মানুষের শরীরে জীবাণু কীভাবে প্রবেশ করেছে, তার ওপর রোগের ধরন ও লক্ষণ নির্ভর করে।
মানুষের ক্ষেত্রে অ্যানথ্রাক্স প্রধানত ত্বক, পরিপাকতন্ত্র বা শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে। এর মধ্যে ত্বকের অ্যানথ্রাক্স সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
গরুর মাংস খেলে অ্যানথ্রাক্স হতে পারে?
আক্রান্ত পশুর মাংস খেলে অ্যানথ্রাক্সের পরিপাকতন্ত্র-সংক্রান্ত ধরন হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সংক্রমিত পশুর মাংস খাওয়ার মাধ্যমে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল অ্যানথ্রাক্স হতে পারে।
এ ধরনের সংক্রমণে জ্বর, বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রক্তবমি, তীব্র পেটের সমস্যা এবং অন্যান্য জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু গরুর মাংস খেলেই অ্যানথ্রাক্স হবে—এমন নয়। ঝুঁকির বিষয়টি মূলত সংক্রমিত প্রাণী বা দূষিত প্রাণিজ পণ্যের সংস্পর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ত্বকে অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ কেমন?
ত্বকের মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে প্রথমে চুলকানিযুক্ত ছোট ফুসকুড়ি বা ফোসকার মতো ক্ষত দেখা দিতে পারে। পরে সেটি সাধারণত ব্যথাহীন ক্ষতে পরিণত হয় এবং ক্ষতের মাঝখানে কালো অংশ তৈরি হতে পারে। ক্ষতের আশপাশে উল্লেখযোগ্য ফোলাভাবও দেখা দিতে পারে।
এই ধরনের সংক্রমণ সাধারণত শরীরের উন্মুক্ত অংশে বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, মাথাব্যথা বা শরীর খারাপ লাগার মতো উপসর্গও থাকতে পারে।
শ্বাসের মাধ্যমে সংক্রমণ হলে কী হয়?
অ্যানথ্রাক্সের জীবাণুর স্পোর শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করলে ইনহেলেশন অ্যানথ্রাক্স হতে পারে। এটি অ্যানথ্রাক্সের গুরুতর ধরনগুলোর একটি। শুরুতে জ্বর, কাঁপুনি, কাশি, মাথাব্যথা বা শরীরের ব্যথার মতো তুলনামূলক সাধারণ উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পরে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা ও গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
অ্যানথ্রাক্স কি একজনের কাছ থেকে আরেকজনে ছড়ায়?
অ্যানথ্রাক্স সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো সহজে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। সংক্রমণের প্রধান পথ হলো আক্রান্ত প্রাণী, প্রাণিজ পণ্য বা পরিবেশে থাকা অ্যানথ্রাক্সের স্পোরের সংস্পর্শ।
তবে ত্বকের অ্যানথ্রাক্সের ক্ষত থেকে সরাসরি সংক্রমণের সামান্য ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষত ও ক্ষত থেকে বের হওয়া তরলের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
অ্যানথ্রাক্সের চিকিৎসা কী?
অ্যানথ্রাক্সের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে। দ্রুত রোগ শনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিকিৎসা দেরি হলে গুরুতর অসুস্থতা তৈরি হতে পারে।
অ্যানথ্রাক্সের সন্দেহ হলে নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। WHO-ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
সংক্রমণ ঠেকাতে কী করবেন?
মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো পশুর মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা। সন্দেহজনক বা অসুস্থ পশুর ক্ষেত্রে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং মৃত পশুর নিরাপদ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
আক্রান্ত বা সন্দেহজনক পশু জবাই করা এবং তার মাংস খাওয়া বা বিক্রি করা থেকে বিরত থাকা উচিত। সংক্রমিত পশুর মাংস, রক্ত, চামড়া, হাড় বা অন্যান্য প্রাণিজ পণ্যের সংস্পর্শেও সতর্ক থাকতে হয়।
কেউ যদি সম্ভাব্যভাবে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণুর সংস্পর্শে এসে থাকেন, তাহলে উপসর্গের অপেক্ষা না করে দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি। সংক্রমণের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
পশুর টিকাদান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণে গবাদিপশুর টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। WHO বলছে, পশুর মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব। আক্রান্ত এলাকায় অসুস্থ বা মৃত পশু শনাক্ত করা, নিরাপদভাবে মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুস্থ পশুকে টিকা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
আক্রান্ত পশু বা সন্দেহজনক প্রাণিজ পণ্যের সংস্পর্শের পর শরীরে অস্বাভাবিক ফোসকা বা ক্ষত, বিশেষ করে কালো কেন্দ্রযুক্ত ব্যথাহীন ক্ষত দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। একইভাবে জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, তীব্র পেটব্যথা, বমি বা ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য রোগের সঙ্গে মিলতে পারে। তাই শুধু উপসর্গ দেখে নিজে রোগ নিশ্চিত না করে চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করানো জরুরি।
আল-মামুন/