ঢাকা, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

মাসিক বেশি দিন চলা কি বিপদের লক্ষণ? জেনে নিন কারণ

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০৬ ২০:৪০:২১
মাসিক বেশি দিন চলা কি বিপদের লক্ষণ? জেনে নিন কারণ

মাসিক সাধারণত দুই থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে রক্তপাত এক সপ্তাহ পেরিয়ে যায়, আবার কারও মাসিকের পরিমাণ এত বেশি হয় যে অল্প সময়ের মধ্যেই প্যাড পরিবর্তন করতে হয়। এমন পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কারণ দীর্ঘদিন বা অতিরিক্ত রক্তপাত হরমোনের সমস্যা, জরায়ুর বিভিন্ন জটিলতা কিংবা রক্তস্বল্পতার লক্ষণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাসিক সাত দিনের বেশি স্থায়ী হলে, রক্তপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে গেলে কিংবা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

মাসিক কত দিন স্থায়ী হওয়া স্বাভাবিক?

সাধারণত মাসিক দুই থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। অনেকের ক্ষেত্রে প্রায় পাঁচ দিন রক্তপাত থাকে। প্রথম কয়েক দিন রক্তপাত তুলনামূলক বেশি হতে পারে, পরে ধীরে ধীরে কমে আসে।

তবে সবার মাসিকের ধরন এক নয়। বয়স, হরমোনের পরিবর্তন এবং শারীরিক অবস্থার কারণে মাসিকের সময় ও রক্তপাতের পরিমাণে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু নিয়মিতভাবে সাত দিনের বেশি রক্তপাত হওয়া বা আগের তুলনায় হঠাৎ মাসিকের ধরন বদলে যাওয়া অবহেলা করা উচিত নয়।

মাসিক বেশি দিন চললে কখন সতর্ক হবেন?

কয়েকটি লক্ষণ দেখা দিলে দীর্ঘস্থায়ী বা অতিরিক্ত মাসিকের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মাসিকের রক্তপাত সাত দিনের বেশি স্থায়ী হওয়া।

প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টা পরপর প্যাড বা ট্যাম্পন পরিবর্তন করতে হওয়া।

কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রতি ঘণ্টায় একটি বা তার বেশি প্যাড সম্পূর্ণ ভিজে যাওয়া।

রাতে ঘুমের মধ্যে উঠে প্যাড পরিবর্তন করতে হওয়া।

রক্তের বড় জমাট অংশ বের হওয়া।

রক্তপাতের কারণে স্বাভাবিক কাজকর্ম, পড়াশোনা বা বাইরে যাওয়া ব্যাহত হওয়া।

মাসিকের সময় অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট অনুভব করা।

এসব লক্ষণ অতিরিক্ত মাসিকের ইঙ্গিত হতে পারে। এমন সমস্যা বারবার হলে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মাসিক দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাব্য কারণ

মাসিক বেশি দিন চলার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। শুধু লক্ষণ দেখে নির্দিষ্ট রোগ শনাক্ত করা যায় না। সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ডিম্বস্ফোটন অনিয়মিত হতে পারে। এতে জরায়ুর ভেতরের আবরণ স্বাভাবিক নিয়মে ঝরে না পড়ে দীর্ঘ সময় রক্তপাত হতে পারে।

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS): এ সমস্যায় ডিম্বস্ফোটন অনিয়মিত হতে পারে। ফলে মাসিক দেরিতে হওয়া, অনিয়মিত রক্তপাত কিংবা দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাত দেখা দিতে পারে।

জরায়ুর ফাইব্রয়েড ও পলিপ: জরায়ুতে ফাইব্রয়েড বা পলিপ থাকলে মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত কিংবা দীর্ঘদিন রক্তপাত হতে পারে।

থাইরয়েডের সমস্যা: থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোনের অস্বাভাবিকতা মাসিকের স্বাভাবিক চক্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা: শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় সমস্যা থাকলে মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে।

ওষুধ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি: কিছু ওষুধ, রক্ত পাতলা করার চিকিৎসা এবং কপার আইইউডি ব্যবহারের কারণে মাসিকের রক্তপাত বেড়ে যেতে পারে।

এ ছাড়া এন্ডোমেট্রিওসিস, অ্যাডেনোমায়োসিস, পেলভিক সংক্রমণ এবং গর্ভাবস্থাসংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণেও অস্বাভাবিক রক্তপাত হতে পারে।

দীর্ঘদিন রক্তপাত হলে শরীরে কী সমস্যা হতে পারে?

মাসিকের সময় দীর্ঘদিন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে আয়রন-ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।

রক্তস্বল্পতা হলে শরীর দুর্বল লাগা, সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়া, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা এবং শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। রক্তক্ষরণ বেশি হলে এসব উপসর্গ আরও গুরুতর হতে পারে।

তাই দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত রক্তপাতকে শুধু মাসিকের স্বাভাবিক পরিবর্তন মনে করে অবহেলা করা ঠিক নয়।

কোন অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে?

প্রতি ঘণ্টায় একটি বা তার বেশি প্যাড সম্পূর্ণ ভিজে যাওয়ার মতো রক্তপাত টানা দুই ঘণ্টা বা তার বেশি চললে এবং এর সঙ্গে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি, বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে যেকোনো অস্বাভাবিক রক্তপাতের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হওয়ার পর আবার রক্তপাত হলেও তা পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

মাসিক বেশি দিন চললে কী পরীক্ষা করা হতে পারে?

চিকিৎসক প্রথমে রোগীর বয়স, মাসিকের ইতিহাস, রক্তপাতের পরিমাণ, ব্যবহৃত ওষুধ এবং অন্যান্য শারীরিক উপসর্গ সম্পর্কে জানতে চাইতে পারেন।

কারণ শনাক্ত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পরীক্ষা করা হতে পারে। যেমন—

রক্তস্বল্পতা বা আয়রনের ঘাটতি যাচাইয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা।

গর্ভাবস্থার সম্ভাবনা থাকলে প্রেগন্যান্সি টেস্ট।

থাইরয়েডের সমস্যা সন্দেহ হলে হরমোন পরীক্ষা।

জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের অবস্থা দেখতে আলট্রাসনোগ্রাম।

প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য শারীরিক পরীক্ষা।

সব রোগীর জন্য একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। বয়স, উপসর্গ ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা নির্ধারণ করা হয়।

মাসিকের সমস্যা হলে কী করবেন?

মাসিকের তারিখ, কত দিন রক্তপাত হচ্ছে এবং রক্তপাতের পরিমাণ কেমন—এসব তথ্য লিখে রাখা উপকারী। এতে সমস্যার ধরন বুঝতে চিকিৎসকের সুবিধা হয়।

নিজে থেকে হরমোনের ওষুধ বা রক্তপাত বন্ধের ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। কারণ চিকিৎসা নির্ভর করে রক্তপাতের প্রকৃত কারণের ওপর। কারও ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে জরায়ুর নির্দিষ্ট সমস্যার চিকিৎসা দরকার হতে পারে।

মাসিক সাত দিনের বেশি স্থায়ী হলে, রক্তপাত আগের তুলনায় বেড়ে গেলে বা বারবার একই সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন: মাসিক সাধারণত কত দিন স্থায়ী হয়?

উত্তর: সাধারণত মাসিক দুই থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। তবে ব্যক্তিভেদে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে।

প্রশ্ন: মাসিক সাত দিনের বেশি চললে কি চিন্তার বিষয়?

উত্তর: সাত দিনের বেশি রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে রক্তপাত বেশি হলে বা দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ থাকলে অবহেলা করা যাবে না।

প্রশ্ন: মাসিক বেশি দিন চলার কারণ কী?

উত্তর: হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, PCOS, জরায়ুর ফাইব্রয়েড বা পলিপ, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্ত জমাট বাঁধার জটিলতা এবং কিছু ওষুধের কারণে দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাত হতে পারে।

প্রশ্ন: দীর্ঘদিন মাসিক হলে কি রক্তস্বল্পতা হতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত রক্তপাত হলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি তৈরি হয়ে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন: মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হলে কখন জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে?

উত্তর: টানা দুই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় প্রতি ঘণ্টায় একটি বা তার বেশি প্যাড সম্পূর্ণ ভিজে গেলে এবং সঙ্গে মাথা ঘোরা, বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ