ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এলপিজি আমদানি কমতেই বাজারে সংকট, বাড়ল ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম

অর্থনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৮ ১৩:৫৫:৩৯
এলপিজি আমদানি কমতেই বাজারে সংকট, বাড়ল ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম

রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি নিয়ে চাপে পড়েছেন দেশের ভোক্তারা। সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে এখন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চলতি মাসের শুরুতেই এই সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের তুলনায় বাজারে সিলিন্ডারপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এলপিজি আমদানির উল্লেখযোগ্য পতন। আগস্টে দেশে যেখানে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন এলপিজি এসেছিল, সেপ্টেম্বরে সেই পরিমাণ নেমে হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন। এক মাসেই আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ হাজার টন, যা প্রায় ২৫ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক নৌপথের সংকটে বিপাকে আমদানি

এলপিজি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সরবরাহ সংকটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থার অস্থিরতাও সরাসরি যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জাহাজের সংকট দেখা দিয়েছে এবং পরিবহন ব্যয়ও বহুগুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশের এলপিজির প্রধান আমদানি উৎস মধ্যপ্রাচ্য। ফলে ওই অঞ্চলের নৌপথে জটিলতা তৈরি হওয়ায় দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। প্রচলিত নৌপথ ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বিকল্প রুটে পণ্য আনার প্রয়োজন হচ্ছে। এতে এলপিজি দেশে পৌঁছাতে যেমন বেশি সময় লাগছে, তেমনি বেড়ে যাচ্ছে আমদানির খরচও।

মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা (সিএমও) আবু সাঈদ রেজার বক্তব্যেও সরবরাহ সমস্যাটিই প্রধান হয়ে এসেছে। তিনি জানান, বর্তমানে বড় সমস্যা হচ্ছে কার্গো সংগ্রহ করা। আগে কোনো একটি রুটে সমস্যা দেখা দিলে অন্য রুট ব্যবহার করা যেত।

তবে এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আবু সাঈদ রেজা জানান, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকার পরও অনেক বৈশ্বিক সরবরাহকারী তাদের সরবরাহ ২০ শতাংশ কমিয়েছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দেওয়ার পরও খোলাবাজার থেকে কার্গো সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কার্গোর প্রিমিয়াম বেড়েছে কয়েক গুণ

আমদানিকারকদের আরেকটি উদ্বেগের জায়গা আন্তর্জাতিক বাজারের অতিরিক্ত ব্যয়। তাদের দাবি, বিশ্ববাজারে কার্গো সংগ্রহের জন্য বাড়তি প্রিমিয়াম এবং পরিবহন খরচ যে হারে বেড়েছে, বিইআরসির মাসিক মূল্যসূত্রে তার পুরোটা সমন্বয় হচ্ছে না।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, কার্গো প্রিমিয়াম টনপ্রতি ১৬০ ডলার থেকে বেড়ে এখন ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে।

এই অবস্থায় বিইআরসির নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করে বাড়তি আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি আমদানিকারকদের। তাদের মতে, অতিরিক্ত খরচের কারণে লোকসানের আশঙ্কা থাকায় অনেকে আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।

সেপ্টেম্বরে ৩০ হাজার টন এলপিজি এনেছে ওমেরা

সংকটের মধ্যেও আমদানি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজীম চৌধুরী বলেন, সেপ্টেম্বরে তারা প্রায় ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছেন।

তানজীম চৌধুরীর ভাষ্য, বৈশ্বিক সংকটের কারণে উৎপাদকদের কাছ থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। তারপরও পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

দেশের মোট এলপিজি ব্যবহারের বড় অংশই গৃহস্থালির রান্নার কাজে যায়। বছরে দেশে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়ির রান্নায়। এই চাহিদার প্রায় ৯৯ শতাংশ পূরণ করে বেসরকারি খাত।

বিইআরসি বলছে, অক্টোবরে সংকট থাকার ঝুঁকি আছে

বাজারের বর্তমান ঘাটতি নিয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত জাহাজ সময়মতো দেশে না আসায় সেপ্টেম্বর মাসে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় আমদানিকারকদের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নয়, পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক নৌপথের অবস্থার ওপর।

জালাল আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক নৌপথের জটিলতা যদি অব্যাহত থাকে এবং প্রয়োজনীয় কার্গো নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে অক্টোবর মাসেও এলপিজির এই সংকট থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ফলে একদিকে আন্তর্জাতিক পরিবহন ও কার্গো সংকট, অন্যদিকে আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব—দুইয়ের চাপেই দেশের এলপিজি বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে বিইআরসির নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

FAQ

১. ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের বিইআরসি নির্ধারিত দাম কত?

চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর বিইআরসি ১৩ টাকা কমিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে।

২. বর্তমানে ১২ কেজির এলপিজি কত টাকায় বিক্রি হচ্ছে?

সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে এটি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

৩. সেপ্টেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি কত কমেছে?

আগস্টের প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন থেকে সেপ্টেম্বরে আমদানি নেমে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ৪০ হাজার টন বা প্রায় ২৫ শতাংশ।

৪. এলপিজির কার্গো প্রিমিয়াম কত বেড়েছে?

লোয়াব সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, টনপ্রতি কার্গো প্রিমিয়াম ১৬০ ডলার থেকে বেড়ে ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে।

৫. অক্টোবরেও কি এলপিজি সংকট থাকতে পারে?

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক নৌপথের জটিলতা না কাটলে এবং প্রয়োজনীয় কার্গো নিশ্চিত করা না গেলে অক্টোবরেও সংকট থাকার ঝুঁকি রয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: