ঢাকা, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

সৌদি আরবে ইকামার টাকা কর্মীর কাছ থেকে নেওয়া কি বৈধ?

প্রবাসী ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৮ ১৮:২৭:১৩
সৌদি আরবে ইকামার টাকা কর্মীর কাছ থেকে নেওয়া কি বৈধ?

সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের ইকামা নবায়নের খরচ সাধারণত নিয়োগকর্তা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বহন করার কথা। সৌদি শ্রম আইনের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি কর্মীর ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু এবং নবায়নের নির্ধারিত ফি নিয়োগকর্তার দায়িত্ব। এসব খরচ কর্মীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তাই আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে গৃহকর্মীসহ নির্দিষ্ট কিছু কর্মশ্রেণির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান ও পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এই নিয়মটি বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়ন না হলে জরিমানা, চাকরিসংক্রান্ত জটিলতা এবং বৈধভাবে দেশটিতে অবস্থানের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ইকামা নবায়নের খরচ ও দায়িত্ব সম্পর্কে সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সরকারি নির্দেশনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত শ্রম আইনের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদে ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের ফি এবং নিয়োগকর্তার কারণে বিলম্ব হলে তার জরিমানা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

সৌদি আরবে ইকামা নবায়নের খরচ কার দেওয়ার কথা?

সৌদি আরবে ইকামা নবায়নের সময় কর্মীর কাছ থেকে টাকা চাওয়া হলে আগে জানতে হবে, খরচটি আসলে কোন খাতের। কারণ, চাকরিরত বিদেশি কর্মীর ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের নির্ধারিত ফি নিয়োগকর্তার দেওয়ার কথা। নিয়োগকর্তার কারণে নবায়নে দেরি হলে সংশ্লিষ্ট জরিমানার দায়ও তাঁর ওপর বর্তায়। সৌদি শ্রম আইনের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে কাজ করতে যাওয়া অনেক প্রবাসী ইকামা নবায়নের খরচ নিয়ে সমস্যায় পড়েন। কখনো নিয়োগকর্তা খরচ দিতে অস্বীকার করেন, আবার কখনো কর্মীর বেতন থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে কোন খরচ কার দায়িত্ব, তা জানা থাকলে নিজের অধিকার বুঝতে এবং প্রয়োজনে অভিযোগ জানাতে সুবিধা হয়।

ইকামা নবায়নের খরচ কি কোম্পানিকে দিতে হবে?

সৌদি আরবের শ্রম আইনের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি কর্মী নিয়োগের খরচ, ইকামা ইস্যু ও নবায়নের ফি এবং ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু ও নবায়নের ফি নিয়োগকর্তাকে বহন করতে হয়। নিয়োগকর্তার কারণে এসব নবায়নে বিলম্ব হলে তার ফলে সৃষ্ট জরিমানাও তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

অর্থাৎ, কোনো বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবের একটি কোম্পানিতে বৈধভাবে চাকরি করলে তাঁর ইকামা নবায়নের সরকারি ফি নিজের পকেট থেকে দেওয়ার কথা নয়। কোম্পানি বা নিয়োগকর্তাই এই খরচ বহন করবেন।

একইভাবে, ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের খরচও কর্মীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কথা নয়। ইকামা এবং ওয়ার্ক পারমিট আলাদা বিষয় হলেও দুটির নবায়ন ফি নিয়োগকর্তার দায়িত্বের আওতায় পড়ে।

তবে ইকামা নবায়নের নামে নেওয়া প্রতিটি অর্থ একই ধরনের ফি নয়। কর্মীর কাছ থেকে টাকা চাওয়া হলে সেটি সরকারি নবায়ন ফি, অন্য কোনো সেবা-সংক্রান্ত খরচ, নাকি পরিবারের সদস্যদের ইকামা-সংক্রান্ত ফি—তা আলাদা করে যাচাই করা জরুরি।

ইকামা নবায়নে দেরি হলে জরিমানা কে দেবেন?

ইকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়নের ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি শ্রম আইনের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদে নিয়োগকর্তার কারণে ইকামা বা ওয়ার্ক পারমিট নবায়নে বিলম্ব থেকে যে জরিমানা হয়, সেটিও নিয়োগকর্তার দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই কোম্পানি সময়মতো নবায়নের ব্যবস্থা না করায় জরিমানা হলে কর্মীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই অর্থের দায় নিতে হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণের জন্য বিলম্বের কারণ, কর্মসংস্থানের ধরন এবং প্রযোজ্য বিধান বিবেচনা করতে হবে।

ইকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কর্মীর উচিত দ্রুত নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে নবায়নের অবস্থা জানা। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি যাচাই করা উচিত।

গৃহকর্মী ও ব্যক্তিগত চালকদের ক্ষেত্রে কী নিয়ম?

সৌদি আরবে গৃহকর্মী, ব্যক্তিগত গাড়িচালক এবং এ ধরনের কিছু কর্মশ্রেণির জন্য আলাদা নিয়ম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে। তাই সাধারণ কোম্পানির কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য প্রতিটি বিধান যাচাই না করে সব শ্রেণির কর্মীর ওপর একইভাবে প্রয়োগ করা ঠিক নয়।

তবে সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট প্রকাশিত এক ঘোষণায় জানিয়েছে, গৃহকর্মী ও অনুরূপ শ্রেণির কর্মীদের ইকামা তিন মাস বা তার গুণিতক মেয়াদে ইস্যু ও নবায়নের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এতে নিয়োগকর্তারা নির্বাচিত মেয়াদের ভিত্তিতে ফি পরিশোধ করতে পারবেন।

এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো নিয়োগকর্তাদের জন্য ইকামা নবায়নের সময়সীমা ও অর্থ পরিশোধে আরও নমনীয়তা তৈরি করা। সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ক্ষেত্রে নবায়নের মেয়াদ, অর্থ পরিশোধ এবং অন্যান্য শর্ত সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী যাচাই করা উচিত।

পরিবারের সদস্যদের ইকামা নবায়নের খরচ কি কোম্পানি দেবে?

প্রবাসীদের আরেকটি সাধারণ প্রশ্ন হলো, নিজের ইকামার পাশাপাশি স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের অন্য নির্ভরশীল সদস্যদের ইকামা নবায়নের খরচও কি নিয়োগকর্তাকে দিতে হবে?

এ ক্ষেত্রে নিজের কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিটের ফি এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য ফি বা নির্ভরশীল সদস্যদের লেভিকে এক করে দেখা যাবে না। সৌদি শ্রম আইনের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদে বিদেশি কর্মীর ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের দায়িত্ব নিয়োগকর্তার ওপর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের সব ধরনের ফি নিয়োগকর্তাকেই দিতে হবে—এমন সিদ্ধান্ত ওই অনুচ্ছেদ থেকে সরাসরি টানা যায় না।

তাই পরিবারের সদস্যদের নবায়ন-সংক্রান্ত অর্থ পরিশোধের আগে প্রযোজ্য সরকারি নিয়ম, চাকরির চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ফি কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে, তা যাচাই করা উচিত।

নিয়োগকর্তা ইকামার টাকা দিতে না চাইলে কী করবেন?

কোনো কোম্পানি ইকামা নবায়নের নির্ধারিত ফি কর্মীর ওপর চাপিয়ে দিলে বা এ কারণে বেতন থেকে টাকা কেটে নিলে কর্মী কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন।

প্রথমত, নিয়োগকর্তার সঙ্গে লিখিতভাবে যোগাযোগ করে নবায়নের খরচ ও অর্থ কর্তনের কারণ জানতে চান। দ্বিতীয়ত, বেতন থেকে টাকা কাটা হলে বেতন স্লিপ, ব্যাংক লেনদেনের বিবরণ, চুক্তি এবং ইকামা নবায়ন-সংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষণ করুন।

তৃতীয়ত, সমস্যা সমাধান না হলে সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের কাছে অভিযোগ বা পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন। মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট হলো [hrsd.gov.sa](https://www.hrsd.gov.sa/)। অভিযোগের ক্ষেত্রে নিজের কর্মসংস্থানের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট খরচের বিবরণ স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি।

শুধু মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে লিখিত প্রমাণ রাখলে পরবর্তী সময়ে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করা সহজ হতে পারে।

সৌদি আরবে চাকরিরত বিদেশি কর্মীর নিজের ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের নির্ধারিত ফি নিয়োগকর্তার বহন করার কথা। নিয়োগকর্তার কারণে নবায়নে বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্ট জরিমানার দায়ও তাঁর ওপর বর্তায়। তবে পরিবারের সদস্যদের ফি এবং নির্দিষ্ট কর্মশ্রেণির ক্ষেত্রে আলাদা বিধান থাকতে পারে। তাই কোনো অর্থ পরিশোধের আগে সেটি কোন খাতের ফি, তা যাচাই করা এবং প্রয়োজনে সরকারি কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: সৌদি আরবে ইকামা নবায়নের খরচ কার দেওয়ার কথা?

উত্তর: সাধারণ চাকরির ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মীর ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের নির্ধারিত ফি নিয়োগকর্তার বহন করার কথা। সৌদি শ্রম আইনের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদে এ বিধান রয়েছে।

প্রশ্ন ২: কোম্পানি ইকামা নবায়নের টাকা কর্মীর বেতন থেকে কাটতে পারবে?

উত্তর: নিয়োগকর্তার বহন করার কথা এমন নির্ধারিত ফি কর্মীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। টাকা কাটা হলে কারণ ও প্রমাণ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিন।

প্রশ্ন ৩: ইকামা নবায়নে দেরি হলে জরিমানা কে দেবেন?

উত্তর: নিয়োগকর্তার কারণে নবায়নে বিলম্ব হলে তার ফলে সৃষ্ট জরিমানা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দায় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করতে হবে।

প্রশ্ন ৪: পরিবারের সদস্যদের ইকামা নবায়নের খরচও কি কোম্পানি দেবে?

উত্তর: সব ক্ষেত্রে এমন নয়। কর্মীর নিজের ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিটের ফি এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য ফি আলাদা বিষয়। সংশ্লিষ্ট সরকারি নিয়ম ও চুক্তি যাচাই করা উচিত।

প্রশ্ন ৫: ইকামার খরচ নিয়ে সমস্যা হলে কোথায় অভিযোগ করবেন?

উত্তর: সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট [hrsd.gov.sa](https://www.hrsd.gov.sa/) থেকে অভিযোগ ও যোগাযোগের উপযুক্ত মাধ্যম সম্পর্কে জানতে পারবেন।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ