ঢাকা, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

১০ থ্রাস্টারে শূন্যে উড়ল টেসলা রোডস্টার, দাম কত?

তথ্য ও প্রযুক্তি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৮ ২১:২৩:২৫
১০ থ্রাস্টারে শূন্যে উড়ল টেসলা রোডস্টার, দাম কত?

পাঁচটি টেসলা গাড়ির ওপর দিয়ে লাফ দিয়ে, শূন্যে ঘুরে মাটিতে নামল একটি স্পোর্টস কার। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এমন এক প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে টেসলার নতুন রোডস্টার উন্মোচন করলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। অনুষ্ঠানে ‘ফ্লাইং কার বাস্তব’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। গাড়িটির উৎপাদন শুরু হবে ২০২৮ সালে।

সেই রাতে কী দেখা গেল

অনুষ্ঠানটি হয় স্পেসএক্সের রকেট উন্নয়ন ও পরীক্ষাকেন্দ্রে। জায়গাটি টেক্সাসের ম্যাকগ্রেগরে, ওয়াকো শহরের কাছে। টেসলার এক্স অ্যাকাউন্টে তা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

প্রদর্শনীতে গাড়িটি একটি বিশেষ র‍্যাম্পে ওঠে। র‍্যাম্পটি এমনভাবে বাঁকানো ছিল যে গাড়ি উল্টো অবস্থায় তার গায়ে লেগে থাকার মতো করে এগোয়। এরপর র‍্যাম্পের শেষ প্রান্ত থেকে ছিটকে বেরিয়ে শূন্যে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে চাকার ওপর নেমে আসে। আরেকটি প্রদর্শনীতে গাড়িটি চলন্ত অবস্থায় সাইবারক্যাব, সাইবারট্রাক, টেসলা সেমি, মডেল ওয়াই ও মডেল থ্রির ওপর দিয়ে লাফ দেয়।

মাস্ক বলেন, “ফ্লাইং কার বাস্তব।” তবে একই সঙ্গে স্বীকার করেন, গাড়িটির “সাফল্য নিশ্চিত নয়”, যদিও “এটি সম্ভবত কাজ করবে।”

কীভাবে ওড়ে গাড়িটি

টেসলার প্রকৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট লার্স মোরাভির তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটিতে আছে ১০টি থ্রাস্টার। এগুলো যুক্ত ৬০০ লিটার সংকুচিত বাতাসের ট্যাংকের সঙ্গে। এই বাতাসের শক্তিতেই গাড়িটি শূন্যে ওঠে ও ঘোরে। ট্যাংক আবার ভরা যায় বলেও জানান তিনি। মাস্কের ভাষ্য, এটি ‘অতি উচ্চ চাপের এয়ার ট্যাংক’।

টেসলা জানিয়েছে, গাড়ির প্রতিটি ব্যবহারযোগ্য ফাঁকা জায়গায় বসানো হয়েছে কার্বন ফাইবারে মোড়া চাপ-সহনশীল ট্যাংক। সামনের দিকে নয়, পেছনে আছে মূল থ্রাস্টার। গাড়ির অবস্থান নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা থ্রাস্টারও আছে। মাস্কের কথায়, গাড়িটি তাই “রকেটের মতো উড়তে” এবং রোল করতে পারে।

এটি কিন্তু আকাশে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকার গাড়ি নয়। প্রদর্শনীতে যা দেখা গেছে, তা সংকুচিত বাতাসের ধাক্কায় স্বল্প সময়ের উড়ান।

তিন সংস্করণ, ৩০০ মাইল রেঞ্জ

টেসলার ওয়েবসাইট অনুযায়ী, রোডস্টার আসবে তিনটি সংস্করণে:

পারফরম্যান্স: দুই আসনের, ‘রোড রেডি’। এতে আছে সক্রিয় অ্যারোডাইনামিক্স এবং ট্র্যাকে ও ট্র্যাকের বাইরে ভালো পারফরম্যান্সের জন্য বিশেষ সাকশন ব্যবস্থা।থ্রাস্ট: দুই আসনের, ‘রেস রেডি’। পেছনে বসানো কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টারের সাহায্যে এক সেকেন্ডের কম সময়ে শূন্য থেকে ৬০ মাইল (প্রায় ৯৭ কিলোমিটার) বেগ তোলার কথা বলা হয়েছে।রকেট: এক আসনের, ‘এয়ার রেডি’। গাড়ির চারপাশে বসানো আছে ১০টি কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার।

তিনটি সংস্করণেই রেঞ্জ ৩০০ মাইল (প্রায় ৪৮৩ কিলোমিটার) এবং সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৩০ মাইলের (প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার) বেশি। এসব সক্ষমতা টেসলার নিজের দেওয়া তথ্য। স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।

দাম ও বুকিং

অনুষ্ঠানে গাড়িটির দাম ঘোষণা করা হয়নি। তবে টেসলার ওয়েবসাইটে বুকিং নেওয়া হচ্ছে। পারফরম্যান্স সংস্করণের জন্য রিজার্ভেশন ফি ৫০ হাজার ডলার, থ্রাস্ট সংস্করণের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। রকেট সংস্করণ ‘শুধু আমন্ত্রণে’।

প্রায় এক দশক আগে টেসলা এই গাড়ির যে বেস মূল্য জানিয়েছিল, তা ছিল ২ লাখ ডলার।

নিরাপত্তা ও সড়কে চলার প্রশ্ন

মাস্ক নিজেই বলেছেন, এটি “নিরাপত্তাকেন্দ্রিক গাড়ি নয়।” এর আগে একটি পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন, নিরাপত্তা যাঁর কাছে সবচেয়ে বড় বিবেচনা, তাঁর রোডস্টার কেনা উচিত নয়। তবে এই গাড়িতে কারও মৃত্যু না হোক, সেটাই টেসলার লক্ষ্য বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

টেসলার ওয়েবসাইট বলছে, ওড়ার সক্ষমতাসহ পরিকল্পিত মডেলটি সাধারণ সড়কে চলার জন্য অনুমোদিত নয়। এই সংস্করণ কীভাবে সড়কে চলার অনুমতি পাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

নয় বছরের অপেক্ষা ও বারবার পেছানো

দ্বিতীয় প্রজন্মের রোডস্টার প্রথম দেখানো হয় ২০১৭ সালে, টেসলা সেমি উন্মোচনের অনুষ্ঠানের শেষে। তখন ৫০ হাজার ডলার জমা দিয়ে বুকিং নেওয়া হয়েছিল। কেউ কেউ ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার দিয়ে এক হাজারটি ‘ফাউন্ডার্স সিরিজে’র একটি বুক করেছিলেন।

কয়েক বছরে একাধিকবার পিছিয়েছে গাড়িটির পরিকল্পনা। মাস্ক ২০২০, ২০২১, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সময়সূচি পেছান। পরে ২০২৬ সালের ১ এপ্রিলে উন্মোচনের কথা জানালেও তা হয়নি। এবার ১ অক্টোবরের অনুষ্ঠান খারাপ আবহাওয়ায় পিছিয়ে যায়। দীর্ঘ এই অপেক্ষায় বিরক্তি জানিয়েছেন ইউটিউবার মার্কেস ব্রাউনলি ও ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যানের মতো পরিচিত গ্রাহকেরা।

থ্রাস্টারের ধারণাও নতুন নয়। ২০১৮ সালে মাস্ক টুইটারে লিখেছিলেন, রোডস্টারে প্রায় ১০টি ছোট রকেট থ্রাস্টার যুক্ত করা যেতে পারে।

টেসলা ও স্পেসএক্সের মেলবন্ধন

মাস্ক গাড়িটিকে বর্ণনা করেছেন দুই প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের যৌথ কাজের ফল হিসেবে। তাঁর ভাষায়, এটি কোনো সিনেমায় দেখা যায়নি এমন কিছু, যেকোনো জেমস বন্ড গাড়ির চেয়ে ভালো। অনুষ্ঠানে তিনি ঘোষণা দেন, ভবিষ্যতে টেসলা স্নেক রিভার ক্যানিয়ন পেরোনোর চেষ্টাও করতে পারে।

গাড়ির নকশা আগের চেয়ে বেশি কৌণিক। টেসলার বক্তব্য অনুযায়ী, এসআর-৭১ গোয়েন্দা বিমান ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে।

ইভস নামের এক বিশ্লেষক বলেন, রকেট প্রতিষ্ঠানে তৈরি প্রযুক্তি টেসলার পণ্যে বসানোয় দুই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক বাস্তব রূপ পেয়েছে। তাঁর মতে, এতে ভবিষ্যতে দুটি প্রতিষ্ঠানের একই প্রকৌশল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করার যুক্তি জোরালো হলো।

আকাশে ওড়া গাড়ির সংকট

প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রণমূলক জটিলতার কারণে ফ্লাইং কার খাত এখনো মাটি ছাড়তে পারেনি। ১৯১৭ সালে মার্কিন বিমানপ্রযুক্তির অগ্রদূত গ্লেন কার্টিস প্রথম ফ্লাইং কারের প্রোটোটাইপ দেখিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক বছরে বৈদ্যুতিক মোটর ও উচ্চক্ষমতার ব্যাটারির উন্নতির পর সফল নকশা নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা শুরু হয়েছে।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. টেসলার নতুন রোডস্টার কি সত্যিই উড়তে পারে?

সংকুচিত বাতাসের থ্রাস্টারের সাহায্যে গাড়িটি স্বল্প সময়ের জন্য শূন্যে উঠতে ও ঘুরতে পারে। দীর্ঘ সময় আকাশে ভেসে থাকার গাড়ি এটি নয়।

২. গাড়িটির উৎপাদন কবে শুরু হবে?

মাস্কের ঘোষণা অনুযায়ী ২০২৮ সালে।

৩. রোডস্টারের দাম কত?

দাম এখনো ঘোষণা করা হয়নি। রিজার্ভেশন ফি পারফরম্যান্স সংস্করণে ৫০ হাজার ডলার ও থ্রাস্ট সংস্করণে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। রকেট সংস্করণ শুধু আমন্ত্রণে।

৪. রোডস্টারের রেঞ্জ ও গতি কত?

টেসলার তথ্য অনুযায়ী, তিন সংস্করণেই রেঞ্জ ৩০০ মাইল এবং সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৩০ মাইলের বেশি।

৫. ওড়ার সক্ষমতাসহ গাড়িটি কি সড়কে চলতে পারবে?

টেসলার ওয়েবসাইট অনুযায়ী, পরিকল্পিত উড়ন্ত মডেলটি সাধারণ সড়কে চলার জন্য অনুমোদিত নয়।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: