ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমা কত টাকা, কী বলছে পরিসংখ্যান?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৮ ২১:০৬:১৪
বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমা কত টাকা, কী বলছে পরিসংখ্যান?

বাংলাদেশে মাসে ৩ হাজার ৮২২ টাকা খরচ করতে পারলেই সরকারি হিসাব অনুযায়ী একজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে থাকেন। কিন্তু এই অর্থে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কতটা সম্ভব—সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে জীবনযাত্রার ব্যয়, পুষ্টিকর খাবারের দাম এবং মানুষের আয়ের পরিসংখ্যান। একদিকে সরকারি দারিদ্র্যসীমার হিসাব, অন্যদিকে পুষ্টিকর খাবার ও সম্মানজনক জীবনযাপনের ব্যয়—দুইয়ের ব্যবধান বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮২২ টাকা ব্যয় করতে না পারলে একজন মানুষকে দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। দৈনিক হিসাবে এই অর্থ প্রায় ১২৭ টাকা। অথচ জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন মানুষের পুষ্টিকর খাবারের জন্যই ২০২৫ সালে দৈনিক ব্যয় প্রয়োজন ৪ দশমিক ৫৯ ডলার। ভিডিওতে এই ব্যয়কে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টাকার বেশি মাসিক খরচের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

এখানেই মূল প্রশ্ন—দারিদ্র্য পরিমাপের নির্ধারিত সীমা কি মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় যথাযথভাবে তুলে ধরে?

দারিদ্র্যের হার নিয়ে ভিন্ন চিত্র

বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমছে, নাকি বাড়ছে—এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশে।

দেশীয় গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির হিসাবে, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে ট্রান্সক্রিপ্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, শ্রম সংস্কার কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাসিক আয় ৭ হাজার ৮৬৯ টাকার নিচে হলে একজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকেন। ভিডিওতে বিশ্বব্যাংকের দৈনিক ২ দশমিক ১৫ ডলারের মানদণ্ডের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যানগুলো দারিদ্র্য নির্ধারণের পদ্ধতি ও ব্যবহৃত মানদণ্ডের পার্থক্য বোঝার গুরুত্ব সামনে আনে। কারণ, দারিদ্র্যের হার নিরূপণে কোন সীমা ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর ফলাফলে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।

আয়ের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮৪ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের হার ১৬ শতাংশ।

ভিডিওতে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরতদের গড় মাসিক আয় ১৫ হাজার ৫৫৪ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মসংস্থানে নিয়মিত সুরক্ষা ও নিরাপত্তার অভাবও তুলে ধরা হয়েছে।

এই বাস্তবতার সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনা করলে আয়ের ওপর চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে পরিবারের মাসিক আয় কতটা যথেষ্ট, সেটি শুধু দারিদ্র্যসীমার অঙ্ক দিয়ে বোঝা কঠিন।

গার্মেন্টস শ্রমিকের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়

পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি নিয়েও ভিডিওতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ঢাকায় একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের সম্মানজনক জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি হওয়া উচিত মাসে ২৭ হাজার ৯০০ টাকা। রাজধানীসংলগ্ন উপশহরগুলোতে এই অঙ্ক ২৩ হাজার ১০০ টাকা।

অন্যদিকে, ভিডিওতে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১১৩ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১৩ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকায় জীবনযাপনের উপযোগী মজুরির হিসাব ৪৬০ ডলার বলেও জানানো হয়েছে।

এই তুলনায় ন্যূনতম মজুরি ও সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় আয়ের মধ্যে বড় ব্যবধানের বিষয়টি সামনে আসে। ভিডিওতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২২টি খাতে মজুরি দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে।

পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছেন না কোটি মানুষ

খাবারের পরিমাণের পাশাপাশি পুষ্টিমান নিশ্চিত করাও জীবনযাত্রার ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেন না। ভিডিওতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ; পাকিস্তানে হারটি ৬৩ শতাংশ।

পুষ্টিকর খাবারের ব্যয়ও বেড়েছে। ভিডিওতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে একজন মানুষের জন্য দৈনিক পুষ্টিকর খাবারের ব্যয় ছিল ২৮৬ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৫৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা ভিডিওতে ৫৫০ টাকার বেশি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেননি। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০ কোটি ১৮ লাখ। অর্থাৎ, সংখ্যাটি কমলেও এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ পুষ্টিকর খাবারের বাইরে রয়েছেন।

ভিডিওতে ডিম, ডাল, ছোট মাছ ও শাকসবজিকে তুলনামূলক কম খরচে পুষ্টি পাওয়ার উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব খাবার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

শিশুদের অপুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ

পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যের ঘাটতি শিশুদের ওপরও প্রভাব ফেলছে বলে ভিডিওতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী ১৭ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে এবং ৪২ লাখ শিশু বয়সের তুলনায় খাটো হয়ে যাচ্ছে।

এই পরিসংখ্যান শিশুদের পুষ্টি ও বেড়ে ওঠা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আনে। অপুষ্টির প্রভাব শুধু বর্তমান স্বাস্থ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিশুর শারীরিক বিকাশের সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত।

ভিডিওতে আরও দাবি করা হয়েছে, অপুষ্টির কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের উৎপাদনশীলতা হারায়। এর বাইরে চিকিৎসার ব্যয়ও রয়েছে।

মূল্যস্ফীতিতে চাপে পরিবারের বাজেট

আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ার পেছনে মূল্যস্ফীতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভিডিওতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

এ ছাড়া, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ বলে ভিডিওতে উল্লেখ করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্যের প্রসঙ্গে মালদ্বীপ ও পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং নেপালে ৪ দশমিক ১ শতাংশের কথা বলা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি বাড়লে একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা যায় না। ফলে আয় একই থাকলেও পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ভিডিওতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা টানা ৫৩ মাস ধরে কমেছে। একই সঙ্গে ১২ শতাংশ মানুষের আয় বাড়লেও ৭৯ শতাংশ মানুষের ব্যয় বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য বেড়েছে

বাংলাদেশে গত পাঁচ দশকে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও আয়ের বণ্টনে বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে ভিডিওতে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩-৭৪ সালে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল মোট আয়ের প্রায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল মোট আয়ের আনুমানিক শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ।

২০২২ সালের হিসাবে, দেশের মোট আয়ের ৪১ শতাংশ ছিল সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। বিপরীতে, সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের অংশ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৩১ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান আয়বণ্টনে দুই প্রান্তের ব্যবধানের বিষয়টি সামনে আনে। জাতীয় আয় বাড়া বা দারিদ্র্যের হার কমার পাশাপাশি সেই আয়ের কতটা অংশ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সম্মানজনক জীবনযাপনের হিসাব কত?

ভিডিওতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের একটি যৌথ জরিপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই জরিপে ঢাকার চার সদস্যের একটি পরিবারের সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য মাসে ৪৮ হাজার ২২ টাকা প্রয়োজন বলে তুলে ধরা হয়েছে। তবে ভিডিওর ট্রান্সক্রিপ্টে এই অঙ্কের উপস্থাপনায় সংখ্যাগত অস্পষ্টতা রয়েছে।

অন্যদিকে, সরকারি দারিদ্র্যসীমার হিসাব অনুযায়ী মাসে ৩ হাজার ৮২২ টাকা ব্যয় করতে পারলেই একজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে থাকেন। ফলে দারিদ্র্য পরিমাপের সীমা এবং একটি পরিবারের বাস্তব প্রয়োজনীয় ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধানের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

একটি পরিবারের প্রকৃত প্রয়োজন নির্ধারণে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক ব্যয় বিবেচনা করা জরুরি। দারিদ্র্যের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের সময় তাই ব্যবহৃত পদ্ধতি, ব্যয়ের ধরন ও সময়কাল স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, দেওয়া তথ্যগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কয়েকটি দিক উঠে এসেছে—দারিদ্র্য পরিমাপের ভিন্ন মানদণ্ড, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের আধিক্য, পুষ্টিকর খাবারের ব্যয়, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং আয়ের বৈষম্য। এসব সূচক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক সামর্থ্যের ব্যবধান আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব।

বাংলাদেশে মাসে ৩ হাজার ৮২২ টাকা খরচ করতে পারলেই সরকারি হিসাব অনুযায়ী একজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে থাকেন। কিন্তু এই অর্থে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কতটা সম্ভব—সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে জীবনযাত্রার ব্যয়, পুষ্টিকর খাবারের দাম এবং মানুষের আয়ের পরিসংখ্যান। একদিকে সরকারি দারিদ্র্যসীমার হিসাব, অন্যদিকে পুষ্টিকর খাবার ও সম্মানজনক জীবনযাপনের ব্যয়—দুইয়ের ব্যবধান বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮২২ টাকা ব্যয় করতে না পারলে একজন মানুষকে দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। দৈনিক হিসাবে এই অর্থ প্রায় ১২৭ টাকা। অথচ জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন মানুষের পুষ্টিকর খাবারের জন্যই ২০২৫ সালে দৈনিক ব্যয় প্রয়োজন ৪ দশমিক ৫৯ ডলার। ভিডিওতে এই ব্যয়কে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টাকার বেশি মাসিক খরচের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

এখানেই মূল প্রশ্ন—দারিদ্র্য পরিমাপের নির্ধারিত সীমা কি মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় যথাযথভাবে তুলে ধরে?

দারিদ্র্যের হার নিয়ে ভিন্ন চিত্র

বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমছে, নাকি বাড়ছে—এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশে।

দেশীয় গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির হিসাবে, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে ট্রান্সক্রিপ্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, শ্রম সংস্কার কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাসিক আয় ৭ হাজার ৮৬৯ টাকার নিচে হলে একজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকেন। ভিডিওতে বিশ্বব্যাংকের দৈনিক ২ দশমিক ১৫ ডলারের মানদণ্ডের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যানগুলো দারিদ্র্য নির্ধারণের পদ্ধতি ও ব্যবহৃত মানদণ্ডের পার্থক্য বোঝার গুরুত্ব সামনে আনে। কারণ, দারিদ্র্যের হার নিরূপণে কোন সীমা ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর ফলাফলে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।

আয়ের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮৪ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের হার ১৬ শতাংশ।

ভিডিওতে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরতদের গড় মাসিক আয় ১৫ হাজার ৫৫৪ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মসংস্থানে নিয়মিত সুরক্ষা ও নিরাপত্তার অভাবও তুলে ধরা হয়েছে।

এই বাস্তবতার সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনা করলে আয়ের ওপর চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে পরিবারের মাসিক আয় কতটা যথেষ্ট, সেটি শুধু দারিদ্র্যসীমার অঙ্ক দিয়ে বোঝা কঠিন।

গার্মেন্টস শ্রমিকের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়

পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি নিয়েও ভিডিওতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ঢাকায় একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের সম্মানজনক জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি হওয়া উচিত মাসে ২৭ হাজার ৯০০ টাকা। রাজধানীসংলগ্ন উপশহরগুলোতে এই অঙ্ক ২৩ হাজার ১০০ টাকা।

অন্যদিকে, ভিডিওতে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১১৩ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১৩ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকায় জীবনযাপনের উপযোগী মজুরির হিসাব ৪৬০ ডলার বলেও জানানো হয়েছে।

এই তুলনায় ন্যূনতম মজুরি ও সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় আয়ের মধ্যে বড় ব্যবধানের বিষয়টি সামনে আসে। ভিডিওতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২২টি খাতে মজুরি দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে।

পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছেন না কোটি মানুষ

খাবারের পরিমাণের পাশাপাশি পুষ্টিমান নিশ্চিত করাও জীবনযাত্রার ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেন না। ভিডিওতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ; পাকিস্তানে হারটি ৬৩ শতাংশ।

পুষ্টিকর খাবারের ব্যয়ও বেড়েছে। ভিডিওতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে একজন মানুষের জন্য দৈনিক পুষ্টিকর খাবারের ব্যয় ছিল ২৮৬ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৫৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা ভিডিওতে ৫৫০ টাকার বেশি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেননি। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০ কোটি ১৮ লাখ। অর্থাৎ, সংখ্যাটি কমলেও এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ পুষ্টিকর খাবারের বাইরে রয়েছেন।

ভিডিওতে ডিম, ডাল, ছোট মাছ ও শাকসবজিকে তুলনামূলক কম খরচে পুষ্টি পাওয়ার উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব খাবার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

শিশুদের অপুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ

পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যের ঘাটতি শিশুদের ওপরও প্রভাব ফেলছে বলে ভিডিওতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী ১৭ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে এবং ৪২ লাখ শিশু বয়সের তুলনায় খাটো হয়ে যাচ্ছে।

এই পরিসংখ্যান শিশুদের পুষ্টি ও বেড়ে ওঠা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আনে। অপুষ্টির প্রভাব শুধু বর্তমান স্বাস্থ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিশুর শারীরিক বিকাশের সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত।

ভিডিওতে আরও দাবি করা হয়েছে, অপুষ্টির কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের উৎপাদনশীলতা হারায়। এর বাইরে চিকিৎসার ব্যয়ও রয়েছে।

মূল্যস্ফীতিতে চাপে পরিবারের বাজেট

আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ার পেছনে মূল্যস্ফীতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভিডিওতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

এ ছাড়া, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ বলে ভিডিওতে উল্লেখ করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্যের প্রসঙ্গে মালদ্বীপ ও পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং নেপালে ৪ দশমিক ১ শতাংশের কথা বলা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি বাড়লে একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা যায় না। ফলে আয় একই থাকলেও পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ভিডিওতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা টানা ৫৩ মাস ধরে কমেছে। একই সঙ্গে ১২ শতাংশ মানুষের আয় বাড়লেও ৭৯ শতাংশ মানুষের ব্যয় বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য বেড়েছে

বাংলাদেশে গত পাঁচ দশকে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও আয়ের বণ্টনে বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে ভিডিওতে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩-৭৪ সালে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল মোট আয়ের প্রায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল মোট আয়ের আনুমানিক শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ।

২০২২ সালের হিসাবে, দেশের মোট আয়ের ৪১ শতাংশ ছিল সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। বিপরীতে, সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের অংশ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৩১ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান আয়বণ্টনে দুই প্রান্তের ব্যবধানের বিষয়টি সামনে আনে। জাতীয় আয় বাড়া বা দারিদ্র্যের হার কমার পাশাপাশি সেই আয়ের কতটা অংশ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সম্মানজনক জীবনযাপনের হিসাব কত?

ভিডিওতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের একটি যৌথ জরিপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই জরিপে ঢাকার চার সদস্যের একটি পরিবারের সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য মাসে ৪৮ হাজার ২২ টাকা প্রয়োজন বলে তুলে ধরা হয়েছে। তবে ভিডিওর ট্রান্সক্রিপ্টে এই অঙ্কের উপস্থাপনায় সংখ্যাগত অস্পষ্টতা রয়েছে।

অন্যদিকে, সরকারি দারিদ্র্যসীমার হিসাব অনুযায়ী মাসে ৩ হাজার ৮২২ টাকা ব্যয় করতে পারলেই একজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে থাকেন। ফলে দারিদ্র্য পরিমাপের সীমা এবং একটি পরিবারের বাস্তব প্রয়োজনীয় ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধানের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

একটি পরিবারের প্রকৃত প্রয়োজন নির্ধারণে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক ব্যয় বিবেচনা করা জরুরি। দারিদ্র্যের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের সময় তাই ব্যবহৃত পদ্ধতি, ব্যয়ের ধরন ও সময়কাল স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, দেওয়া তথ্যগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কয়েকটি দিক উঠে এসেছে—দারিদ্র্য পরিমাপের ভিন্ন মানদণ্ড, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের আধিক্য, পুষ্টিকর খাবারের ব্যয়, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং আয়ের বৈষম্য। এসব সূচক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক সামর্থ্যের ব্যবধান আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব।

FAQ

১. বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে দারিদ্র্যসীমা কত?

প্রদত্ত ট্রান্সক্রিপ্ট অনুযায়ী, বিবিএসের হিসাবে মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮২২ টাকা ব্যয় করতে না পারলে একজন মানুষকে দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়।

২. বাংলাদেশে কত মানুষ পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারেন না?

ট্রান্সক্রিপ্টে জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথ হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেননি।

৩. বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে কত মানুষ কাজ করেন?

বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর উদ্ধৃতি অনুযায়ী, দেশের ৮৪ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন।

৪. ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি কত ছিল?

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।

৫. আয়বৈষম্য সম্পর্কে ট্রান্সক্রিপ্টে কী বলা হয়েছে?

বিবিএসের উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের মোট আয়ের ৪১ শতাংশ ছিল সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে, আর সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের অংশ ছিল ১ দশমিক ৩১ শতাংশ।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: