ঢাকা, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারি: সবাই জানতেন, দাবি খাজার

খেলা ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০৭ ১০:৩৯:১৭
স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারি: সবাই জানতেন, দাবি খাজার

২০১৮ সালে ক্রিকেট বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারির আট বছর পর ঘটনাটির পরিধি নিয়ে নতুন দাবি সামনে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ওপেনার উসমান খাজার মতে, বল বিকৃতির পরিকল্পনা সম্পর্কে শুধু শাস্তি পাওয়া তিন ক্রিকেটারই অবগত ছিলেন না, বিষয়টি জানতেন দলের অন্য সদস্যরাও। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে যে ঘটনাকে স্টিভ স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার ও ক্যামেরন ব্যানক্রফটের কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, তার সঙ্গে পুরো দলের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে দাবি করছেন তিনি।

খাজার এই বক্তব্য উঠে এসেছে তার আত্মজীবনী ‘সবর’-এ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ার পর নিজের ক্যারিয়ারের নানা অজানা অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছেন এই অস্ট্রেলীয় ব্যাটার। বইটির কিছু অংশ প্রকাশের পরই স্যান্ডপেপার বিতর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার আগের তদন্তে যে চিত্র উঠে এসেছিল, খাজার বক্তব্য তার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

কেপটাউন টেস্টের আগেই আলোচনায় এসেছিল স্যান্ডপেপার

খাজার বর্ণনায়, বল বিকৃতির ঘটনাটি কেবল ২০১৮ সালের কেপটাউন টেস্টে শুরু হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টেও শিরিষ কাগজ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া দলের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল।

গেবেরখার সেন্ট জর্জ পার্কে অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে কথাবার্তার একপর্যায়ে স্টিভ স্মিথ সেখান থেকে চলে যান। খাজার দাবি, স্মিথ তখন জানিয়েছিলেন, এ ধরনের বিষয়ে তিনি কিছু জানতে চান না।

এরপর ম্যাচটির প্রথম ইনিংসে বল ভালো সুইং করছিল। সেই পরিস্থিতিতে বলের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য স্যান্ডপেপার ব্যবহারের প্রস্তাব দেন ক্যামেরন ব্যানক্রফট বলে নিজের বইয়ে উল্লেখ করেছেন খাজা।

তৃতীয় টেস্টে ঘটনাটি আরও বড় আকার ধারণ করে। কেপটাউনের নিউল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে ব্যানক্রফটের পাশেই ছিলেন খাজা। তার দাবি, ব্যানক্রফটের সঙ্গে ম্যাচ চলাকালে কারা কথা বলেছিলেন, সেটিও তিনি দেখেছেন।

ক্যামেরার সামনে যেভাবে প্রকাশ পায় বল বিকৃতির ঘটনা

মাঠের ওই কর্মকাণ্ড প্রথমে নজরে আসে সম্প্রচার দলের। বিবিসির তথ্যমতে, সুপারস্পোর্টের লাইভ সম্প্রচারের পরিচালক আলভিন নাইকার এবং তার ক্যামেরা ক্রু ব্যানক্রফটের আচরণে অসংগতি দেখতে পান।

ফিল্ডিংয়ের সময় বলটি পকেট কিংবা প্যান্টের ভেতরের অংশে ঘষার মতো আচরণ করছিলেন অস্ট্রেলীয় এই ক্রিকেটার। পরে হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, পকেট থেকে হলুদ রঙের একটি বস্তু বের করে বলের একপাশে ঘষছেন তিনি। বস্তুটি পরে শিরিষ কাগজ হিসেবে শনাক্ত হয়। ফুটেজে বলের আকৃতি পরিবর্তনের চেষ্টাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই দৃশ্য সম্প্রচারের পর বল বিকৃতির অভিযোগ আর গোপন থাকেনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয় এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তদন্ত শুরু করে।

তদন্তে যে দায় নির্ধারণ করেছিল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

তদন্ত শেষে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া জানায়, বল বিকৃতির পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার। অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ পরিকল্পনার বিষয়ে জানলেও তা প্রতিরোধ করেননি। ক্যামেরন ব্যানক্রফট মাঠে শিরিষ কাগজ ব্যবহার করেছিলেন।

এই ঘটনায় স্মিথ ও ওয়ার্নারকে ১২ মাস করে এবং ব্যানক্রফটকে ৯ মাসের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ওয়ার্নারকে আজীবনের জন্য অধিনায়কত্ব থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। স্মিথের জন্য এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল দুই বছর।

বিতর্কের পর অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধান কোচ ড্যারেন লেহম্যানও পদত্যাগ করেন।

তবে খাজার নতুন বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তে উঠে আসা এই তিনজনের বাইরেও দলের অন্যদের কাছে বিষয়টি পরিচিত ছিল। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার আগের অবস্থানের সঙ্গে এখানেই তার দাবির মূল পার্থক্য।

তদন্তকারীদের অপেক্ষায় ছিলেন খাজা, কিন্তু ডাক পাননি

স্যান্ডপেপার বিতর্কের সময় পুরো টেস্টে ব্যানক্রফটের কাছাকাছি থাকলেও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া কখনো তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি বলে জানিয়েছেন খাজা।

তার ধারণা, তিনি ঘটনাটিকে দলগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করবেন এবং জিজ্ঞাসা করা হলে সত্য প্রকাশ করতে প্রস্তুত থাকবেন—এমনটা তদন্তকারীরা বুঝতে পেরেছিলেন। সে কারণেই হয়তো তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি।

খাজা জানান, তদন্তের সময় তিনি ফোনকলের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু তাকে ডাকা হয়নি। পরে তিন ক্রিকেটারের শাস্তির ঘোষণা শুনে তিনি বিস্মিত হন।

আট বছরেও কেন সামনে এল না পুরো ঘটনা?

খাজার প্রত্যাশা ছিল, সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ না কেউ বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কথা বলবেন। বিশেষ করে ডেভিড ওয়ার্নার কিংবা দলের অন্য কেউ সত্য প্রকাশ করবেন বলে তিনি ভেবেছিলেন।

সংবাদমাধ্যম ‘নাইন’-কে দেওয়া বক্তব্যে খাজা বলেন, ঘটনাটিকে এককভাবে সামনে এনে প্রকাশ করার ইচ্ছা তার ছিল না। বরং আট বছর পার হওয়ার পরও পুরো বিষয়টি প্রকাশ্যে না আসায় তিনি অবাক হয়েছেন। তার চাওয়া ছিল, সবাই মিলে ঘটনার দায় ও পরবর্তী পরিস্থিতি সামলাবেন।

নিজের বইয়ে তিনি আরও জানিয়েছেন, ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের সঙ্গে কথা বলে পুরো ঘটনার দায়িত্ব সম্মিলিতভাবে নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু তার প্রত্যাশা অনুযায়ী কেউ সামনে এসে বিষয়টি পরিষ্কার করেননি।

তিন ক্রিকেটারের পরবর্তী জীবনেও ছিল ঘটনার প্রভাব

স্যান্ডপেপার বিতর্কের পর সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ারেও ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে উল্লেখ করেছেন খাজা।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ডেভিড ওয়ার্নারকে দীর্ঘদিন এই ঘটনা নিয়ে মানসিকভাবে আঘাত পেতে দেখেছেন তিনি। ক্যামেরন ব্যানক্রফট ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্স করলেও এরপর আর আগের মতো সুযোগ পাননি। অন্যদিকে স্মিথ কঠিন সময় কাটিয়ে এখনও ক্রিকেটে সক্রিয় রয়েছেন।

ওয়ার্নারও পরবর্তী সময়ে ক্রিকেটে ফিরে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে যথাযথভাবে বিদায় জানানোর সুযোগ পেয়েছেন।

খাজার আত্মজীবনীতে প্রকাশিত বক্তব্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, ২০১৮ সালের সেই ঘটনায় অস্ট্রেলিয়া দলের অভ্যন্তরে আসলে কী ঘটেছিল। তবে পুরো দল জানত—এটি এখন পর্যন্ত খাজার দাবি; ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার আগের তদন্তে প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়।

FAQ

১. স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারি কত সালে ঘটেছিল?

২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপটাউন টেস্টে বল বিকৃতির ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।

২. স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারিতে কারা শাস্তি পেয়েছিলেন?

স্টিভ স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার ও ক্যামেরন ব্যানক্রফট। যথাক্রমে স্মিথ ও ওয়ার্নার ১২ মাস এবং ব্যানক্রফট ৯ মাস নিষিদ্ধ হয়েছিলেন।

৩. উসমান খাজার নতুন দাবি কী?

তার দাবি, বল বিকৃতির বিষয়টি শুধু তিন ক্রিকেটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; অস্ট্রেলিয়া দলের অন্য সদস্যরাও বিষয়টি জানতেন।

৪. কোন ম্যাচে ব্যানক্রফটের বল বিকৃতির ঘটনা ক্যামেরায় ধরা পড়ে?

২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপটাউনের নিউল্যান্ডস টেস্টে ঘটনাটি সম্প্রচারিত ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

৫. স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারির পর ড্যারেন লেহম্যানের কী হয়েছিল?

ঘটনার পর অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধান কোচ ড্যারেন লেহম্যান পদত্যাগ করেন।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ