ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

কারখানা বন্ধ, জমেছে মরিচা—তবু ৬ মাসে শেয়ার দ্বিগুণ

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ আগস্ট ০৯ ১৭:৪১:১২
কারখানা বন্ধ, জমেছে মরিচা—তবু ৬ মাসে শেয়ার দ্বিগুণ

কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা যন্ত্রপাতিতে ধরেছে মরিচা, জমেছে ময়লা। নেই দৃশ্যমান কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রমও। আর এমন অবস্থার মধ্যেই দেশের শেয়ারবাজারে আচমকা বাড়ছে বস্ত্র খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেডের শেয়ারদর।

কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও আর্থিক অবস্থায় দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না থাকলেও শেয়ারের দর ও লেনদেনের পরিমাণ বাড়ায় বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারে অতিরিক্ত মুনাফার আশায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ সক্রিয় হয়ে থাকতে পারেন। আবার কারসাজির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উৎপাদন বন্ধ, যন্ত্রপাতিতে মরিচা

এর আগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) একটি বিশেষ পরিদর্শক দল তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইংয়ের কারখানা সরেজমিনে পরিদর্শন করে। পরিদর্শনের সময় কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ পাওয়া যায়।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কারখানার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এসব যন্ত্রপাতিতে মরিচা ও ময়লার স্তর জমেছে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলোর কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গেছে।

কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিনিয়োগকারীদের যথাযথভাবে জানানো হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তা বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ।

আর্থিক অবস্থাও নাজুক

শুধু উৎপাদন বন্ধ নয়, তুং হাই নিটিংয়ের আর্থিক অবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল। টানা লোকসানের কারণে কোম্পানিটি শেয়ারবাজারের ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে।

সর্বশেষ অনিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ঋণাত্মক। একই সঙ্গে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য বা এনএভিপিএসও ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।

কোম্পানিটির এনএভিপিএস মাইনাস ৬ দশমিক ৩৫ টাকা। অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী কোম্পানির মোট সম্পদের তুলনায় দায়ের পরিমাণ বেশি।

এদিকে তুং হাই নিটিংয়ের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৭৬ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের মধ্যে থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও কোনো লভ্যাংশ দিতে পারছে না কোম্পানিটি।

ছয় মাসে শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ

কোম্পানিটির আর্থিক দুরবস্থা ও উৎপাদন বন্ধ থাকার চিত্রের সঙ্গে শেয়ারবাজারে এর সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধির বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

বাজারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে তুং হাই নিটিংয়ের প্রতিটি শেয়ারের দর ছিল প্রায় ১ টাকা ৭০ পয়সা।

এরপর ধীরে ধীরে শেয়ারটির দর বাড়তে থাকে। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ার প্রায় ৩ টাকা ৯০ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে।

অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে শেয়ারদর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ, ধারাবাহিক লোকসান, ঋণাত্মক এনএভিপিএস এবং লভ্যাংশ না দেওয়ার মতো নেতিবাচক আর্থিক সূচকের মধ্যেও এমন দরবৃদ্ধিই মূলত বাজারসংশ্লিষ্টদের বিস্মিত করেছে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই বড় ঝুঁকিতে

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ার পেছনে সাধারণত ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, মুনাফা বৃদ্ধি, সম্পদমূল্য, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ বা ইতিবাচক মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের মতো কারণ থাকে।

কিন্তু কোনো কোম্পানির এসব মৌলিক সূচকে উন্নতি না থাকা সত্ত্বেও শেয়ারদর দ্রুত বাড়তে থাকলে সেখানে ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে বন্ধ বা দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে হঠাৎ দরবৃদ্ধি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এক পর্যায়ে শেয়ারদর আরও বেড়ে গেলে মুনাফার আশায় নতুন বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনতে পারেন। কিন্তু বাজারে দরপতন শুরু হলে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

মালিকানায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আধিপত্য

তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সালে কোম্পানিটি দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।

কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন প্রায় ১০৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। মোট শেয়ারের সংখ্যা ১০ কোটি ৬৬ লাখের বেশি।

শেয়ার ধারণের হিসাবে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে প্রায় ৩০ দশমিক ০৪ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে প্রায় ৬২ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার। অর্থাৎ কোম্পানিটির মোট শেয়ারের বড় অংশই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

এ কারণে শেয়ারটির অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি বা পরবর্তী দরপতনের প্রভাব সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপরই তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে।

কারসাজির আশঙ্কা, তদন্তের দাবি

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন বন্ধ থাকা, দীর্ঘদিনের লোকসান, ঋণাত্মক সম্পদমূল্য এবং লভ্যাংশ না দেওয়ার মতো তথ্যের পরও শেয়ারদর দ্রুত বাড়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে নেওয়া প্রয়োজন।

শেয়ারটির সাম্প্রতিক লেনদেন, দরবৃদ্ধির ধরন, বড় বিনিয়োগকারীদের লেনদেন এবং কোনো গোষ্ঠী সমন্বিতভাবে শেয়ারটির দর প্রভাবিত করেছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করছেন তারা।

তবে শেয়ারটির দরবৃদ্ধির পেছনে কারসাজি হয়েছে—এমন কোনো বিষয় এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত বা পর্যবেক্ষণের পরই প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হতে পারে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কতা

বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শেয়ারদর বাড়ছে দেখে কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, আয়, সম্পদ ও দায়, নগদ প্রবাহ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, লভ্যাংশের ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যাচাই করা জরুরি।

বিশেষ করে বন্ধ বা দুর্বল আর্থিক অবস্থায় থাকা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তুং হাই নিটিংয়ের ক্ষেত্রে কারখানার উৎপাদন বন্ধ, যন্ত্রপাতিতে মরিচা, দীর্ঘদিনের লোকসান ও ঋণাত্মক এনএভিপিএসের বিপরীতে শেয়ারদরের দ্রুত উত্থান তাই বাজারে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে—কোম্পানির ব্যবসা যখন থমকে আছে, তখন শেয়ারের দৌড়ের পেছনে কারণ কী?

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ