ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

ডিএসইতে বন্ধ কোম্পানির সংখ্যা ৩৫, সবচেয়ে পুরোনোটি ২৪ বছর ধরে নিষ্ক্রিয়

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ আগস্ট ০৮ ১০:৫৩:৩৫
ডিএসইতে বন্ধ কোম্পানির সংখ্যা ৩৫, সবচেয়ে পুরোনোটি ২৪ বছর ধরে নিষ্ক্রিয়

দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা ও নিষ্ক্রিয় তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সর্বশেষ এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বন্ধ বা অকার্যকর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫টিতে।

এতে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বাইরে থাকা তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব কোম্পানির বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

১ আগস্ট থেকে উৎপাদন বন্ধ

ডিএসইর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট থেকে এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কোম্পানিটি আরও জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। পাশাপাশি ঋণদাতা ব্যাংকগুলো এলসি খোলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করায় উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও রাসায়নিক আমদানি ব্যাহত হয়।

জনবল সংকটেও বন্ধ উৎপাদন

কাঁচামাল ও রাসায়নিকের সরবরাহে সংকটের পাশাপাশি দক্ষ শ্রমিকদের একটি বড় অংশ চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ায় কোম্পানিটিতে তীব্র জনবল সংকট তৈরি হয়।

একদিকে উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি করা সম্ভব হচ্ছিল না, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর সংকট—দুই সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার উৎপাদনে ফেরার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে না পারলে কোম্পানির আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

কারখানা বন্ধের পর শেয়ারদরেও চাপ

উৎপাদন বন্ধের খবর প্রকাশের পর কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ১ আগস্ট কারখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকে ডিএসইতে এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের শেয়ারদর ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ কমেছে।

বৃহস্পতিবারও কোম্পানিটির শেয়ারের দর ২ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে ১২ টাকা ৭০ পয়সায় নেমে আসে।

এর আগে চলতি বছর বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ হওয়ায় কোম্পানিটিকে ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের মার্চে শেষ হওয়া প্রান্তিকের পর থেকে কোম্পানিটি কোনো আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করেনি। ফলে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ডিএসইতে বন্ধ কোম্পানি ৩৫

এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস নতুন করে যুক্ত হওয়ায় ডিএসইতে বন্ধ বা অকার্যকর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন ৩৫।

ডিএসই সূত্র জানিয়েছে, এসব কোম্পানির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এক নয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রমে সমস্যার কথা স্টক এক্সচেঞ্জকে জানিয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কারখানা বন্ধ থাকার বিষয়টি প্রকাশ করেনি।

কিছু ক্ষেত্রে ডিএসইর পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কারখানার কার্যক্রম ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে রয়েছে।

বেশির ভাগই সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধ

বন্ধ কোম্পানিগুলোর বড় অংশ ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করেছে। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এর চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয় রয়েছে।

ডিএসইতে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা তালিকাভুক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে মেঘনা পিইটি ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম ২০০২ সাল থেকেই বন্ধ।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস ২০১৬ সাল থেকে উৎপাদন কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে।

বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় কোম্পানির তালিকায় ইস্পাত, বস্ত্র, বিদ্যুৎ, সিমেন্ট, প্রকৌশল, সিরামিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রাসায়নিকসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সর্বশেষ তালিকায় অ্যাক্টিভ ফাইন কেমিক্যালস, এএফসি এগ্রো বায়োটেক এবং এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের নাম যুক্ত হয়েছে।

ডিএসইতে মোট ৩৬০ কোম্পানি

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এক্সচেঞ্জটিতে মোট ৩৬০টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে ১৬০টি, ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ৭৪টি এবং ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে ১২৬টি কোম্পানি রয়েছে।

বন্ধ ও দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা অনেক কোম্পানিই ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে।

কঠোর পদক্ষেপের দাবি

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির সংখ্যা বাড়তে থাকলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

তাদের মতে, যেসব কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয়, সেগুলোর বিষয়ে নিয়ন্ত্রকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। পরিস্থিতি অনুযায়ী কোম্পানি পুনর্গঠন, উদ্যোক্তা বা স্পনসর পরিবর্তন, একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ কিংবা প্রয়োজন হলে তালিকাচ্যুতির মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

এ ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাজারে শৃঙ্খলা বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় কোম্পানিগুলো নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তাও কমতে পারে।

এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের উৎপাদন বন্ধের ঘটনা তাই শুধু একটি কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার বিষয় নয়; বরং দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো নিয়ে বিদ্যমান সমস্যাটিকেও নতুন করে সামনে এনেছে।

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ