ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

Md Razib Ali

Senior Reporter

সানলাইফ কিনে গ্রিন ডেল্টার বড় লোকসান? সামনে এলো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ আগস্ট ১৩ ০৮:৪৯:১৫
সানলাইফ কিনে গ্রিন ডেল্টার বড় লোকসান? সামনে এলো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানিটির শেয়ার অধিগ্রহণের সময় ৪৬১ কোটি টাকার বেশি সম্পদ দেখানো হলেও অনুসন্ধানে এর বড় একটি অংশ বাস্তবে নগদায়নযোগ্য নয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বিপরীতে কোম্পানিটির মোট দায় প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা, যার মধ্যে গ্রাহকদের পাওনা ৩০৯ কোটি টাকার বেশি।

এমন আর্থিক অবস্থার মধ্যেই ২০২৩ সালে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪৩ দশমিক ১২ শতাংশ মালিকানা নেয় গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে কারসাজি এবং হিসাবের গোঁজামিলের মাধ্যমে কোম্পানিটির তহবিল থেকে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।

সানলাইফের ৪৬১ কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

সানলাইফের শেয়ার কেনার সময় কোম্পানিটির সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ৪৬১ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৬৩ টাকা। এর মধ্যে ৩৩৮ কোটি ৪ লাখ ১১ হাজার ৯৯২ টাকা বকেয়া ও ল্যাপস পলিসির প্রিমিয়াম হিসেবে দেখানো হয়।

এ ছাড়া বিটিএ টাওয়ারে কেনা একটি ফ্লোরের পুনর্মূল্যায়ন বাবদ ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫২০ টাকা, আয়কর বাবদ অগ্রিম ৬ কোটি ৬০ লাখ ১ হাজার ৬৯৭ টাকা এবং পিপলস লিজিংয়ে থাকা ১ কোটি টাকা সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়।

তবে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব সম্পদের বড় অংশই বাস্তবে নগদায়নযোগ্য নয় বলে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে বকেয়া প্রিমিয়ামের বড় অংশ আদায়ের সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্তে উঠে এসেছে, কারণ এসব প্রিমিয়ামের সঙ্গে যুক্ত পলিসিগুলো ইতোমধ্যে ল্যাপস হয়েছে।

বিটিএ টাওয়ারের ফ্লোরটি ৯ কোটি ১৬ লাখ ১১ হাজার ৯৩৬ টাকায় কেনা হয়েছিল। অবচয় দেখাতে দেখাতে ২০২৩ সালে এর হিসাবি মূল্য শূন্য হয়ে যায়। এরপর পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে এর মূল্য ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫২০ টাকা দেখানো হয়।

অন্যদিকে আয়কর বাবদ দেখানো ৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার বেশি ইতোমধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। পিপলস লিজিংয়ে থাকা ১ কোটি টাকাও আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব হিসাব বাদ দিলে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০১ কোটি ৮২ লাখ টাকা বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

দায় প্রায় ৩৭০ কোটি, গ্রাহকের পাওনা ৩০৯ কোটি

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের মোট দায় ৩৬৯ কোটি ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮৮৮ টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের পাওনা ৩০৯ কোটি ৩৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৭৯ টাকা।

এ ছাড়া সরকারি ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ ৩১ কোটি ৬৪ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩৮ টাকা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা ৫ কোটি ৩২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৭৯ টাকা, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পাওনা ১ কোটি ৭৪ লাখ ২৫ হাজার ৩৩২ টাকা এবং অফিস ভাড়া বাবদ ২ কোটি ৬০ লাখ ১৭ হাজার ৫৪১ টাকা দায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকৃত সম্পদ ও মোট দায়ের ব্যবধান হিসেবে কোম্পানিটির ঘাটতি দাঁড়ায় ২৫৮ কোটি ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৪ টাকা।

গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ নিয়ে অভিযোগ

সানলাইফের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে মালিকানা হস্তান্তরের আগে ইস্যু করা বিমা পলিসিগুলোর দায়ভার বর্তমান কোম্পানির ওপর থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। বকেয়া বিমা দাবি নিষ্পত্তিতে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ আইনগতভাবে বাধ্য—এমন শর্তও চুক্তিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সানলাইফের গ্রাহকদের বকেয়া বিমা দাবি নিষ্পত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স তথা সানলাইফের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে।

এ নিয়ে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের সিইও ফারজানা চৌধুরীসহ সানলাইফের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের লিগ্যাল নোটিশ দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে।

গ্রিন ডেল্টার ৮৫০ কোটি টাকা নিয়ে অভিযোগ

সানলাইফ অধিগ্রহণের পাশাপাশি গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।

নথি পর্যালোচনার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারসাজির মাধ্যমে ইক্যুইটি বৃদ্ধির হিসাব দেখিয়ে ৩৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা তহবিল থেকে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ হিসাব দেখাতে পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে সম্পদের মূল্য বাড়ানো হয় ১৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

এ ছাড়া পুনর্মূল্যায়ন রিজার্ভ থেকে সম্পদ বিক্রির আগেই ৫৪ কোটি টাকা লভ্যাংশ হিসেবে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যান্য খাতে বেআইনিভাবে ২২৫ কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধ দেখানো, ১৭১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় এবং মুনাফা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক থেকে ২৬৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিসাবের গোঁজামিলের মাধ্যমে ইক্যুইটি ৫৪ কোটি টাকা এবং ক্যাশ-ফ্লো ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা কম দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া গ্রাহকের জমা দেওয়া প্রিমিয়াম, ভ্যাট ও ট্যাক্সের অর্থ গোপন, অবৈধ ব্যয়, অতিরিক্ত কমিশন প্রদান, বাকি ব্যবসা, প্রিমিয়াম হার লঙ্ঘন এবং পুনর্বিমা না করে ব্যবসা পরিচালনার মতো অভিযোগও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের সিইও ফারজানা চৌধুরী, কোম্পানি সচিব মো. ওলিউল্লাহ খান এবং সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও পিপলু বিশ্বাসের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ