ঢাকা, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩

ব্যাংকঋণের পর এবার পুঁজিবাজারে সিটি গ্রুপ, ঝুঁকি কতটা?

অর্থনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ আগস্ট ২৩ ১০:২০:৫৩
ব্যাংকঋণের পর এবার পুঁজিবাজারে সিটি গ্রুপ, ঝুঁকি কতটা?

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ বড় ধরনের আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছে। বিপুল ব্যাংকঋণ, উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি অর্থায়নে সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত সময়ে আয় না আসায় গ্রুপটির তারল্য পরিস্থিতি চাপে পড়েছে।

তবে সিটি গ্রুপ দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। বরং ঋণ পুনর্গঠন, সম্পদ বিক্রি এবং পুঁজিবাজার থেকে নতুন অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের মোট ঋণ ছিল প্রায় ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে কিছু প্রতিবেদনে এপ্রিল শেষে ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা এবং জুনে ব্যাংকারদের আলোচনায় ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণের কথা উঠে এসেছে।

প্রধান ঋণদাতাদের মধ্যে রয়েছে এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, সিটি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), ইস্টার্ন ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ১ জুলাই জানিয়েছিলেন, সিটি গ্রুপের প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ রয়েছে ২৯টি ব্যাংকে। সংকট সমাধানে শীর্ষ ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সিটি গ্রুপের সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভরতা, সুদহার বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন এবং আমদানি অর্থায়নে সীমাবদ্ধতা ব্যবসার ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে টাকার দরপতনের কারণে তাদের আমদানি অর্থায়নের সক্ষমতা কমেছে। একই সময়ে দেশে ঋণের সুদহারও বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় ঋণের খরচ বেড়ে গেছে এবং ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর ঋণসীমাও সংকুচিত হয়েছে।

এর পাশাপাশি গ্রুপটির বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। এসব বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত সময়ে নগদ প্রবাহ না এলে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ আরও বেড়ে যায়।

সিটি গ্রুপের ঋণ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় একাধিক ব্যাংকের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঋণ পুনর্গঠনের আগে গ্রুপটির আর্থিক অবস্থা যাচাই করতে স্বাধীন নিরীক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকও গ্রুপটির সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোকে সমাধানের পথ খুঁজতে সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছে। গভর্নরের বক্তব্য অনুযায়ী, কার্যকর সমাধান বাস্তবায়ন করা গেলে কয়েক মাসের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

সংকট মোকাবিলায় সিটি গ্রুপ এখন পুঁজিবাজার থেকেও সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। এ লক্ষ্যে লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসকে ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ওয়ান ব্যাংককে রাখা হয়েছে ব্যাংকিং পার্টনার ও ব্যাংকার টু দ্য ইস্যু হিসেবে।

এই অর্থ সংগ্রহে আইপিও, প্রাইভেট ইকুইটি, প্রেফারেন্স শেয়ার, করপোরেট বন্ড, সুকুকসহ অনুমোদিত বিভিন্ন পদ্ধতি বিবেচনা করা হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগতে পারে এবং তা নির্ভর করবে নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।

সিটি গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারে প্রবেশের মাধ্যমে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি বিকল্প উৎস তৈরি করতে চায় তারা।

সিটি গ্রুপের পুঁজিবাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—বর্তমান আর্থিক চাপের মধ্যে গ্রুপটির কোন প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসবে এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে।

বিশেষ করে ঋণের একটি অংশ পরিশোধ এবং কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে নতুন অর্থ ব্যবহার করা হলে, বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ঋণের কাঠামো, নগদ প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ মুনাফা সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখনই সিটি গ্রুপকে দেউলিয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। বরং প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ঋণ ও তারল্যসংকট মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঋণ পুনর্গঠন, সম্পদ বিক্রি, ব্যবসা থেকে নগদ প্রবাহ বাড়ানো এবং নতুন মূলধন সংগ্রহের পরিকল্পনা কতটা সফল হয়—তার ওপরই গ্রুপটির ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থার বড় অংশ নির্ভর করবে।

পাঠকের মতামত: